Home » ধর্মীয় স্থানের সামনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অতন্দ্র প্রহরায় দুই সম্প্রদায়ের মানুষ, সম্প্রীতির সুবাতাস বইছে ধূপগুড়িতে

ধর্মীয় স্থানের সামনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অতন্দ্র প্রহরায় দুই সম্প্রদায়ের মানুষ, সম্প্রীতির সুবাতাস বইছে ধূপগুড়িতে

সানী রায়,সময় কলকাতা ,২৬ মে : “মানুষ তাহার পবিত্র পায়ে-দলা মাটি দিয়া তৈরি করিল ইট, রচনা করিল মন্দির-মসজিদ। সেই মন্দির-মসজিদের দুটো ইট খসিয়া পড়িল বলিয়া তাহার জন্য দুই শত মানুষের মাথা খসিয়া পড়িবে? ” সেই কবে নজরুল ইসলাম বলে গিয়েছিলেন তাঁর লেখা মন্দির মসজিদ প্রবন্ধে। সেই ট্র্যাডিশন থেকে  মানুষ বুঝছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবহ বজায় রাখা বড্ড জরুরি তাই মন্দির মসজিদের সামনে তাঁরা সহাবস্থান করছেন, ভালোবাসা দিয়ে একে অন্যকে ধরে আগামী দিনে পথ চলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। উত্তরবঙ্গের ধুপগুড়ি সহ বেশ কিছু এলাকায় সাম্প্রতিক অশান্ত সময়ে  শনিবারের পর থেকে চিত্র যেন বদলে গেছে। মানুষ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ধূপগুড়ির আলতাগ্রাম রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় রাত জেগে একে অপরের ধর্মীয় স্থানের সামনে সাধারণ মানুষ। ধর্মীয় স্থান রক্ষায়, ধর্মীয় স্থানের সামনে অতন্দ্র প্রহরায় দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। যেন সম্প্রীতির সুবাতাস বইছে । অশান্ত সময়কে পেছনে রেখে  ধূপগুড়িতে পারস্পরিক সৌভ্রাতৃত্বের এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর কি হতে পারে!

ধূপগুড়ি অশান্ত থেকেছে কিছুদিন ধরেই। ১৪৪ ধারা অব্যাহত।  ধূপগুড়ির আলতাগ্রাম রেল স্টেশন সংলগ্ন পাড়কুমলাই গ্রামটিকে একচিলতে দীপের আলো মনে হওয়াই স্বাভাবিক। আর হবেই বা না কেন! এই এলাকার মানুষেরা কোনোভাবেই তাদের ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট করতে চান না। তাইতো অশান্তির শুরুর দিন থেকেই দেবাশিস, কল্যাণ, অজয়, বীরেন্দ্রনাথের মতো মানুষরা রাত হলেই মসজিদ পাহারায় মসজিদ প্রাঙ্গণে রাত জাগছেন। তেমনি প্রতিদিনের মতো এলাকার দুর্গা মন্দির প্রাঙ্গন ঝাড় দিয়ে পরিস্কার করতে ভুলে যান নি রবিউল আলম। তাঁদের একটাই বক্তব্য, বন্ধ হোক এই ভুল বোঝাবুঝি। ফের সম্প্রীতির সুরে ভরে উঠুক।

রেল স্টেশনের কাছাকাছিই দুর্গা মন্দির, সেখান থেকে মেরেকেটে কয়েক গজ এগোলেই চোখে পড়ে যায় এলাকার মসজিদটি। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেল, এই দুর্গাপুজোর উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম আবিজুল হক। পুজোর কয়েকটা দিন ইসমাইল হোসেনের মতো মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পুজো মন্ডপে পড়ে থেকে চাঁদা তোলা থেকে আয়োজনের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে অষ্টমীর অঞ্জলী দেখেন নেন অষ্টমীর প্রসাদ। ঈদের দিন কাশীনাথ রায়, জগেন রায়ের মতো দেহাতি মানুষেরা মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে এক অপরের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করা থেকে শুরু করে তাদের ঈদের অনুষ্ঠানের সাহায্য করাও বাদ যায় না। তাদের কথায়, তাদের কাছে অষ্টমীর খিচুড়ি আর ঈদের সেমুইয়ের স্বাদ একেই। কিন্তু হঠাৎ ভুল বোঝাবুঝি। এর পিছনে অবশ্য রাজনীতিকেই দায়ী করেছেন আবিজুল হক। তিনি বলেন, রাজনীতি আমাদের ভাইয়ে ভাইয়ে লড়িয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু কোনোকালেই তো এমনটা ছিল না। তাই আমরা ভ্রাতৃত্ববোধ নষ্ট করতে চাই না। আবিজুলের কথায় সায় দিয়ে এলাকার যুবক দেবাশিস রায় বলে উঠলেন, আমাদের গ্রামের কেউ বিপদে পড়লে তখন সবাই ছুটে আসে। কেউ কেউ যা চাইছে সেই স্বার্থ তাদের পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। কেউ আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে, আমাদের মধ্যে বিভেদের বেড়াজল তৈরি করতে পারবে না।

গ্রামের সকলেই মন্দির মসজিদকে আপাত ভুলবোঝাবুঝি কে সরিয়ে,  আতঙ্ককে পেছনে ফেলছে ধূপগুড়ি। প্রবীণ বীরেন্দ্রনাথ রায়  বলেন, কোনো কু – শক্তি আমাদের মধ্যে বিভেদের চেষ্টা তৈরি করতে পারে । তাই সকলে মিলে রাত হলেই মসজিদ পাহারা । ধর্মীয় উন্মাদনা নয়, প্রকৃত অর্থেই  মনুষ্যত্ব ও মানবিকতার,সম্প্রীতির সুবাতাস বইছে ধূপগুড়িতে ।

“তোমরা বাহিরে এসো, এই দুর্দিনে তাড়াও ওই গো-ভাগাড়ে-পড়া শকুনি দলকে!আমি শুনিতেছি মসজিদের আজান আর মন্দিরের শঙ্খধ্বনি। তাহা এক সাথে উত্থিত হইতেছে ঊর্ধ্বে – স্রষ্টার সিংহাসনের পানে। আমি দেখিতেছি, সারা আকাশ যেন খুশি হইয়া উঠিতেছে।”কাজী নজরুলের কথা যেন ১০০ বছর পরে আরেকবার সত্যি প্রমাণ হচ্ছে।  ধুপগুড়ির মানুষ বলছেন, ঈশ্বর বা আল্লাহ কেউ হানাহানি চান নি। মানুষের মঙ্গলের জন্যই উপাসনালয় তৈরি। এতে আঁচ আসতে দিতে নারাজ উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একজোট হয়ে ভালোবেসে বাঁচার অঙ্গীকার করছেন। ধর্মান্ধদের নাচিয়ে যে কাপুরুষরা মহাপুরুষ হয়  তাদের অপপ্রচেষ্টার ধ্বংস করছে ধূপগুড়ির শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ । সম্প্রীতির সুবাতাস বয়ে চলেছে।

আরও পড়ুন সম্প্রীতির হোলি, প্রজাদের সঙ্গে চুটিয়ে রঙ খেলতেন আকবর, শাহজাহান বলতেন ‘ঈদ-ই-গুলাবি’

About Post Author