Home » সম্প্রীতির হোলি, প্রজাদের সঙ্গে চুটিয়ে রঙ খেলতেন আকবর, শাহজাহান বলতেন ‘ঈদ-ই-গুলাবি’

সম্প্রীতির হোলি, প্রজাদের সঙ্গে চুটিয়ে রঙ খেলতেন আকবর, শাহজাহান বলতেন ‘ঈদ-ই-গুলাবি’

সময় কলকাতা ডেস্ক, ৭ মার্চ: বসন্ত মানেই রঙের উৎসব। গাছে গাছে কচি সবুজ পাতা, লাল পলাশে যেন আগুন ধরে। প্রকৃতিও যেন হোলি খেলায় মাতে এই সময়। কবির ভাষায়, ‘আজ সবার রঙে রং মেশাতে হবে’। ভারতে রঙ খেলার ইতিহাস বহু প্রাচীন। বিশাল এই দেশ ভারতবর্ষে বিভিন্ন সময় শাসন করেছেন বিভিন্ন ধর্মের শাসক। কিন্তু ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে হোলির রং। বলা ভালো ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতির আঙিনায় নানা রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে দোল। ইতিহাস বলছে, দোল বা হোলিকে কেন্দ্র করে বারেবারে রচিত হয়েছে মিলনগাথা। যেখানে রঙের উৎসবে যোগ দিয়েছেন কখনও আকবর বাদশাহ আবার কখনও শাহজাহান। দোল বা হোলি ছিল তাঁদের কাছে সম্প্রীতির উৎসব।

ধর্মের কারবারীরা বলেন, ইসলাম ধর্মে নাকি রঙ খেলা ‘হারাম’। কিন্তু সেই মুঘল আমলেই সেই ভাবনায় বদল এনেছিলেন স্বয়ং আকবর বাদশাহ। তাঁর ধারনা ছিল, যে রঙ সকলকে একত্রে এক জায়গায় এনে আনন্দ প্রদান করে সেই রঙ খারাপ কী? এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮ শতকে বুল্লেহ শাহ-র লেখায়।

“হোরি খেলুঙ্গি, কাহ বিসমিল্লাহ।
নাম নবি কি রতন চারি,
বুন্দ পড়হি আল্লাহ আল্লাহ”

উর্দু সাহিত্যে হোলি কিন্তু ‘হোরি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। জানা যায়, সে সময় রঙ খেলার জন্য নিয়মে কিছু বদল করা হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, নমাজের সময় কোনওভাবে রঙ খেলা যাবে না। বাকি সময় রঙের হোলি খেলা যাবে অবাধে।

পুরাণ মতে ভগবান কৃষ্ণের সময় থেকেই দোল বা হোলির সূচনা। তখন থেকে পরবর্তী মুসলিম পর্যায় পর্যন্ত হোলি ছিল মূলত হিন্দুদের উৎসব। এরপর যখন মুসলিম শাসকদের আগমন ঘটল ভারতে, কালক্রমে তাঁরাও ভারতের সনাতন রীতিকে কিছুটা আপন করে নেয়। ধীরে ধীরে দোল বা হোলি এক গণ উৎসবের চেহারা নেয়। মূলত সুফি সাধকরা রঙের উৎসবকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সব ধর্মের মিলনমেলায়। আমীর খসরু থেকে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার বিভিন্ন গানে, লেখায় হোলি এক অন্য দর্শন নিয়ে হাজির হল। তবে মুসলিম আমলে হোলি বা হোরি খেলা কিন্তু শৈল্পিক পর্যায়ে পৌঁছয় মুঘল আমলে। আকবর, জাহাঙ্গির ও শাহজাহান এই তিন মুঘল বাদশাহের আমলে হোলি এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। সে সময় ফুলের পাপড়ি থেকে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ রঙের সুগন্ধি আবির তৈরি হতো। নগরবাসী হোলির দিন সেজে উঠতেন ফুলের সাজে।

ঐতিহাসিকদের লেখায় জানা যায়, বাবর ভারতে এসে এই দোল বা হোলি উৎসব দেখে অবাক হয়েছিলেন প্রথম। উজ্জ্বল রঙের এই উৎসব দেখে তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। কারণ এমন সুন্দর উৎসব তিনি আগে দেখেননি। সেই থেকেই হোলির প্রেমে পড়লেন মুঘল বাদশাহরা। ঐতিহাসিক জাকাউল্লাহের বইতে এর উল্লেখ আছে। তবে আকবর হোলি উৎসবকে প্রথম নিয়ে আসেন রাজপরিবারের অন্দরমহলে। আকবরের নির্দেশে হোলির দিন রাস্তার মোড়ে মোড়ে তৈরি হতো বড় চৌবাচ্চা। তাতে বিভিন্ন রঙ গুলিয়ে রাখা থাকতো। পিচকারিও থাকতো। দিল্লির রাজপথে চলতো উদ্দাম হোলি খেলা। সেই আমলের মুসলিম চিত্রকরের আঁকা ছবিতে এর সুন্দর বর্ণনা ফুটে উঠেছে। স্বয়ং আকবর বাদশাহ রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসতেন। প্রজাদের সঙ্গে রঙ খেলতেন। ওই দিন মুছে যেত সমস্ত বেড়াজাল।

অপরদিকে ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি’ বই থেকে জানা যায় মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গির ও তাঁর স্ত্রী নূরজাহান  প্রাসাদের ভিতর হোলি খেলায় মাততেন। সেখানে জমকালো বসত সঙ্গীতের আসর। আবার প্রেম ও সৌন্দর্যের পূজারী হিসেবে পরিচিত শাহজাহান হোলি খেলাকে দিয়েছিলেন এক অন্য মাত্রা। তাঁর সময় হোলির নামকরণ হয়েছিল ‘ঈদ-ই-গুলাবি’ আর ‘জশন-ই-আব-পাশি’। অর্থাৎ শাহজাহান হোলিকে ঈদের সঙ্গেই তুলনা করেছিলেন। তবে মুঘল বাদশাহ ওরঙ্গজেবের আমলে হোলি-সহ সমস্ত মিলনউৎসব বন্ধ করা যায় কঠোরভাবে। যদিও পরবর্তী সময় বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরের আমল থেকে। লাল কেল্লার সরকারি উৎসবের তকমা পায় হোলি। উর্দু শায়েরিতে হোলি রূপান্তরিত হয় হোরিতে। উর্দু সাহিত্যে এক অন্য জঁরের জন্ম হয়।

About Post Author