সময় কলকাতা ডেস্ক : প্রেতাত্মার অস্তিত্ব কি সত্যি আছে? সত্য জানতে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে থাকা মানুষের আগ্রহ দুর্নিবার।মৃত্যুর পরে, পরপারে একটি জগতে বিশ্বাসী ছিলেন লেখককুলের অনেকেই। পরলোকে বিশ্বাসী হয়ে প্রেতচৰ্চা করতেন তাঁরা ।স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় নিয়মিত প্ল্যানচেট করতেন বিদেহী আত্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করার বাসনায়। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বা কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণও বিশ্বাসী ছিলেন পরলোক সাধনায় । অন্যদিকে কালীপ্রসন্ন সিংহের মত কেউ কেউ আবার পরলোকের অস্তিত্বকে বুজরুকি বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবুও যুগে যুগে বাংলার লেখককুল বিশ্বাস করে এসেছে প্রেতলোকের অস্তিত্বে।
ভারতে পরলোকচৰ্চা চলেছে দীর্ঘদিন ধরেই। কলকাতায় পরলোকচর্চার শেকড় অনেক গভীরে এবং ইতিহাসও প্রাচীন। ১৮৭৫ সালে আমেরিকায় ‘থিওসফিকাল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা করেন হেলেনা পেত্রোভনা ব্লাভাৎস্কি, কর্নেল হেনরি স্টিল অলকট-। পরবর্তীতে নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এই সমিতি। ১৮৮২ সালে কলকাতায় গড়ে ওঠা সমিতির পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথের দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী ।সমিতির সদস্যরা বিশ্বাস করতেন আত্মা অমর এবং অবিনশ্বর। তাঁদের বিশ্বাস , পার্থিব জন্মে আত্মা বাসা বাঁধে স্থূলদেহের ভিতর। মৃত্যুর পর কখনও ক্ষণস্থায়ী, কখনও দীর্ঘ মৃত্যু-মূর্ছার শেষে আত্মা চলে যায় দিব্যজীবন প্রাপ্ত করার বাসনায়। প্রেতলোকে বিশ্বাসী লেখকদের এক বিরাট অংশ বারবার চৰ্চা করেছেন, আত্মাকে ডেকে আলাপচারিতার প্রয়াস করেছেন। রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়াও অনেকেই বারবার বলেছেন তাঁরা আত্মার সঙ্গে তাঁরা কথা বলেছেন, প্রত্যক্ষ করেছেন প্রেতাত্মা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরলোকের প্রতি আস্থা ও পরলোক চর্চার কাহিনী নিয়ে আলোচনা হয়েছে একাধিক গ্রন্থে। এরমধ্যে অমিতাভ চৌধুরীর ‘রবীন্দ্রনাথের পরলোকচৰ্চা’ গ্রন্থ স্মরণীয়। জানা যায়, কবিবন্ধু মোহিতচন্দ্র সেনের কন্যা উমা একসময়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্ল্যানচেটের মিডিয়াম।উল্লেখ্য,মিডিয়ামের মাধ্যমেই আত্মাকে ডেকে আনা হত। উমাকে বুলা নামে ডাকতেন কবিগুরু।১৯২৯ সালে রানী মহালনবীশকে গুরুদেব জানান, বুলা তাঁকে জানিয়েছে তার ওপরে প্রেতাত্মা ভর করে। সে বছর শান্তিনিকেতনের উদয়ন আর জোড়াসাঁকোয় টানা দুমাস রবিঠাকুর বন্ধু ও আত্মীয় পরিজনকে ডেকে আনেন বলে কথিত। এসময় তাঁর সাথে অবন ঠাকুর, প্রশান্ত মহালনবীশ বা অজিত কুমার চক্রবর্তী থাকতেন। অজিত কুমার চক্রবর্তীর কথা বিশেষ উল্লেখযোগ্য এজন্যই যে মৃত্যুর পূর্বে আত্মা তাঁর আগাম মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেছিল অবন ঠাকুরের জামাই মনিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের আসরে।প্রমথনাথ বিশিকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, প্রেতচক্রের আসরে তাঁর সাথে মাইকেল মধুসূদনের আলাপ হয়েছিল।প্রেতচক্রের আসরে নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীর ছাড়াও এসেছিলেন সুকুমার রায়। সুকুমার রায়ের প্রেআত্মার অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ‘তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায় ‘ গান গেয়েছিলেন বলে জানা যায়।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রথমা স্ত্রী মোহিনীকে দেখতে পেয়েছিলেন একাধিকবার বলে নিজেই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়মহলে জানিয়েছিলেন। দেবযানের লেখক বিভূতিভূষণ তাঁর চিঠিতে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে জানিয়েছিলেন, প্রেতলোকের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ করার অবকাশ নেই। প্রয়াত স্ত্রী গৌরীদেবীর সঙ্গে প্ল্যানচেটে কথা বলতেন বিভূতিভূষণ। মৃত্যুর সামান্য কিছুদিন আগে ধারাগিরিতে এক মৃতদেহের চাদর সরিয়ে নিজের মুখ দেখতে পেয়েছিলেন বিভূতিভূষণ। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রবলভাবে বিশ্বাসী ছিলেন প্রেতচর্চায়। প্রেতাত্মাকে দেখেছেন বা অনুভব করেছেন এরকম খ্যাতনামা লেখকদের তালিকা বেশ দীর্ঘ। তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা কখনও হাড়হিমকরা, কখনও খুব কৌতূহলকর।
পরলোকের অস্তিত্ব নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন লেখক বিমল মিত্র । তিনি সপরিবারে থাকতেন ক্যাওড়াতলা শ্মশানের কাছে। তাঁর কন্যা একবার শ্মশানসংলগ্ন বাড়ি থেকে তাঁকে দূরে অন্যত্র সপরিবারে চলে যেতে অনুরোধ করলে তিনি বলেছিলেন, “ওই একটি জায়গায় জীবন শেষ হয়,শ্মশান অবজ্ঞা করার নয়। ” পরলোকেও অবজ্ঞা করতেন না অধিকাংশ বিখ্যাত লেখক যা তাঁদের বিভিন্ন আলাপচারিতা এবং জীবন নিয়ে আলোচনা গ্রন্থে প্রকাশ পেয়েছে। তাঁরা বলতেন, প্রেতাত্মার আর প্রেতলোকের উপস্থিতি নিয়ে নেই সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ।।


More Stories
অন্নপূর্ণার লক্ষ্মীরা আসছে
রবীন্দ্র জন্মদিন : মোদি ও মমতার কবিগুরু স্মরণ
রবীন্দ্রনাথের পরলোক চেতনা ও প্রেতচৰ্চা