পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা ডেস্ক :
শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সীকে কে না চেনে? আজ,৩০ মার্চ,ব্যোমকেশের স্রষ্টা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন।উল্লেখ্য,ব্যোমকেশের স্রষ্টা অবশ্য ইতিহাসের গল্প রচনায় বেশি তৃপ্তি পেতেন। তথাপি ইতিহাসের গল্প বা ডিটেকটিভ হোক, সামাজিক বা অতিপ্রাকৃত – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জুড়ি বাংলা সাহিত্যে মেলা ভার। ব্যোমকেশের সুখপাঠ্য তদন্তকাহিনীর পাশাপাশি ইতিহাসের গল্প নির্মাণে তিনি ছিলেন অনন্য। প্রমথনাথ বিশী কীআর সাধে তাঁর ইতিহাসের গল্প নিয়ে লিখেছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র ছাড়া আর কেউ এমন করে লেখেন নি।
১৮৯৯ সালে উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরে মামার বাড়িতে জন্ম শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের। যেমন তাঁর বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবাধ যাতায়াত ঠিক তেমনটাই ছিল তাঁর জীবন। কলকাতার বরানগরে তাঁদের আদি বাড়ি ছিল। জন্ম যেমন প্রবাসে তেমন কলকাতার বাইরে কেটেছে তাঁর জীবনের দীর্ঘ সময়। স্কুলের পড়াশুনো মুঙ্গেরে। কর্মসূত্রে মুম্বাই, শেষ জীবনে স্থায়ী বসবাস পুনে। বঙ্গে খুব সামান্য সময় কাটলেও বাংলা সাহিত্যের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে আছে তাঁর নাম। রবীন্দ্রনাথ – বঙ্কিমচন্দ্র আলোকিত বাংলা সাহিত্যের রবীন্দ্রোত্তর যুগে তাঁর প্রভাব সম্ভবত সবচেয়ে সার্বিক। একথা বলা অত্যুক্তি নয় যে, বাংলা সাহিত্যে ডিটেকটিভ এবং ঐতিহাসিক তথা ইতিহাস-আশ্রয়ী গল্প বা উপন্যাস রচনায় তাঁর চেয়ে বেশি প্রভাব কেউ কাটতে পারে নি।

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সব ধরণের লেখায় পারদর্শী। তাঁর লেখা সামাজিক গল্প- উপন্যাস খুবই জনপ্রিয়। এই বিভাগে রোমান্টিক লেখা দাদার কীর্তি যেমন উল্লেখযোগ্য তেমনই রয়েছে মনস্তত্ব নিয়ে লেখা ‘ট্রেনে আধঘন্টা ‘।তাঁর লেখা ভূত বা অতিপ্রাকৃত গল্প, বরদা কে নিয়ে গা ছমছমে অলৌকিক গল্পমালাও বিশেষ জনপ্রিয়।ডিটেকটিভ ছাড়াও কিশোর কিশোরদের কাছে সমান জনপ্রিয়। সদাশিব নামের খুদে চরিত্র কে নিয়ে তাঁর লেখা বা ভূমিকম্পের পটভূমির নাম এক্ষেত্রে চলে আসে।কৌতুক গল্প রচনায় আশ্চর্য কুশলী ছিলেন শরদিন্দু। একমাত্র কবিতায় হয়তো তাঁর সে অর্থে যাতায়াত ছিল না, অথচ অনেকেই জানেন না বিদ্যাসাগর কলেজে পড়ার সময়ে কবিতা দিয়েই কার্যত তাঁর সাহিত্য রচনার শুরু। আরও একটি তথ্য অনেকেরই অজানা যে শরদিন্দুর ছদ্মনাম ছিল চন্দ্রহাস।
লেখার গুনে স্বতন্ত্র শরদিন্দু অধিক খ্যাত ঐতিহাসিক কাহিনী এবং ব্যোমকেশের সত্য অন্বেষণকে কেন্দ্র করে।বাঙালি মননশীল পাঠকের কাছে তাঁর সমধিক খ্যাতি ইতিহাসের গল্প ঘিরে। ঐতিহাসিক কাহিনী রচনায় তাঁর ছিল আশ্চর্য দক্ষতা। অতীতকে তিনি অবলীলায় পাঠকের চোখের সামনে তুলে ধরতেন। ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে ‘ সম্ভবত তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কালজয়ী রচনা যার জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার পান। রমেশচন্দ্র মজুমদার পর্যন্ত তাঁর লেখার কাহিনীর প্রেক্ষাপট ও মনোরম বর্ণনার প্রভুত প্রশংসা করেন। হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় লেখককে জানান ” ইতিহাসের অভিজ্ঞতা এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গী দুইই তোমার তুল্যমূল্য। ” কোথাও বিজয়নগরের বর্ণনা বা কোথাও বাঙালির আগ্নেয়াস্ত্র চালনায় নিপুনতা যার উল্লেখ বাবরের লেখায় আছে তাকে তুলে ধরেছেন তাঁর ইতিহাস কল্পনার নির্মাণে।’কালের মন্দিরা’ বা ‘কুমারসম্ভবের কবি’ অথবা যেকোনো ঐতিহাসিক কাহিনী পড়লে পাঠক টাইম মেশিনে চেপে চলে যান অতীতে। নিজেও আনন্দ পেতেন ইতিহাসের গল্প রচনায়। ” ইতিহাসের গল্প লিখেই বেশি তৃপ্তি পেয়েছি,মনে কেমন একটা সেন্স অফ ফুলফিলমেন্ট হয়, ” নিজের লেখার বিশ্লেষণ করে নিজেই লিখেছেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর লেখা ইতিহাসের ছোট গল্প যেমন চুয়াচন্দন বা বাঘের বাচ্চা একটিবার পড়লে ভোলার জো নেই। আবার ঝিন্দের বন্দী উপন্যাসেও কল্প ইতিহাসের আখ্যান রয়েছে। ব্যোমকেশ – অজিতের কাহিনী ‘ দুর্গরহস্য’ কে ঘিরে রয়েছে ইতিহাস।
ইতিহাসের গল্পের সফল রূপকার বাংলা ভাষায় সম্পূর্ণ নিজস্ব ধারায় গোয়েন্দা গল্প লিখে গিয়েছেন। সিনেমার দৌলতে ব্যোমকেশের স্রষ্টা হিসেবে তাঁর নাম আজকাল আরও বেশি মানুষ জানছে।ব্যোমকেশ নিয়ে আজকাল ধুম পড়েছে ছবি করার। যাই হোক না কেন, ব্যোমকেশের স্রষ্টার অবশ্য নাড়ির যোগ ছিল চলচ্চিত্র জগতে। চোদ্দোটি বছর (১৯৩৮-৫২) তিনি বম্বে টকিজে কাটিয়েছেন চিত্রনাট্যকার হিসেবে। তিনি বেঁচে থাকতেই উত্তমকুমারকে ব্যোমকেশ চরিত্রে রেখে চিড়িয়াখানা সিনেমাটি করেছিলেন সত্যজিৎ রায়।
ব্যোমকেশকে নিয়ে বত্রিশটি কাহিনী লিখে তেত্রিশতম কাহিনীতে হাত দিলেও অন্তিম রচনা ‘বিশুপাল বধ ‘ অসমাপ্ত থেকে যায়।একাত্তর বছরের জীবনকালে (১৮৯৯-১৯৭০) হয়তো আরও লিখতে পারতেন ব্যোমকেশ কাহিনী যদি না বেশ কিছু কাল গোয়েন্দা গল্প লেখা বন্ধ রাখতেন।১৯৩২ সালে পথের কাঁটা গল্প দিয়ে ব্যোমকেশের আত্মপ্রকাশ। অতঃপর সীমান্তহীরা। শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় নিজেই জানিয়েছেন এই দুটি কাহিনীর পরে তাঁর ব্যোমকেশকে নিয়ে একটি সিরিজ করার ইচ্ছে হয়। ‘সত্যান্বেষী: ছিল তাঁর তৃতীয় ব্যোমকেশ কাহিনী। তাঁর প্রথম প্রকাশিত ডিটেকটিভ গ্রন্থ ‘ব্যোমকেশের ডায়েরি’ গ্রন্থে প্রথম গল্প ছিল ‘সত্যান্বেষী’ ফলে অনেকেই এই গল্পকে তাঁর প্রথম ডিটেকটিভ রচনা ভেবে থাকেন। ১৯৩২ সাল থেকে ৩৬ সালের মধ্যে দশটি ডিটেকটিভ গল্প – উপন্যাস লিখে পনেরো বছর ব্যোমকেশের দিকে ফিরেও তাকান নি লেখক। জানা যায় বন্ধু লেখক পরিমল গোস্বামীর বাড়ির ছোটরা যাঁদের মধ্যে লেখক হিমানীশ গোস্বামী ও ছিলেন, তাঁদের আবদারে আবার ব্যোমকেশ কাহিনী নিয়ে ফেরেন শরদিন্দু। চিত্রচোর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম লেখা। অতঃপর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি ব্যোমকেশ সহকারী অজিতকে নিষ্কৃতি দেন রচনার দায় থেকে। সাধু ভাষা থেকে চলিত ভাষায় লিখতে শুরু করেন। পাঠককে জানিয়েছিলেন,অজিত আর ব্যোমকেশের কেয়াতলার বাড়ি তৈরির দেখাশোনা করছে অজিত। বেণী সংহার গ্রন্থ থেকে শুরু করার নতুন ধারার শেষের লেখাগুলিও সমান জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রয়াণের ৫২ বছর পরে আজও বাংলা সাহিত্যে ঐতিহাসিক কাহিনী ও ব্যোমকেশ বক্সী – অজিত- সত্যবতীর স্রষ্টা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় রয়েছেন অদ্বিতীয় আসনে।


More Stories
রবীন্দ্র জন্মদিন : মোদি ও মমতার কবিগুরু স্মরণ
রবীন্দ্রনাথের পরলোক চেতনা ও প্রেতচৰ্চা
ভিনগ্রহী তত্ত্ব প্রমাণে ১৬২টি নতুন ফাইল প্রকাশিত