সময় কলকাতা ডেস্ক : বাসন্তী অধিকারীর বয়স আশি ছাড়িয়েছে। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেন নি। তিনি দেশের স্বাধীনতা লাভের জন্য কোনও আন্দোলনের শরিক ছিলেন না। দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন তাঁর বয়স ছিল ৭। বাবার হাত ধরে তিনি দেখেছিলেন দেশবাসী স্বাধীনতা পাওয়ার আনন্দে মেতেছে। উদযাপন হচ্ছে স্বাধীনতালাভ।মিষ্টি বিতরণ হচ্ছে। বহু প্রতীক্ষার অবসানে স্বাধীনতা এসেছে। তিনি ভেবেছিলেন দেশের প্রতিটি কোণে স্বাধীন দেশের মানুষ ভালো ভাবে বাঁচবে। মানুষের অন্ন ভাতের সংস্থান হবে। স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।

স্বপ্ন প্রয়াণ হয়েছে জীবনের ওঠাপড়ায়। বাসন্তী অধিকারী আর স্বপ্ন দেখেন না।এখন তাঁর স্বপ্ন দেখার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।তাঁর আরাধ্য দেবতা গোপাল তাঁকে জীবনে যতটুকু দিয়েছে তাতেই তিনি সন্তুষ্ট।স্বাধীন দেশের মানুষ হিসেবে প্রাপ্তির ভাড়ার প্রায় শূন্য।উত্তর চব্বিশ পরগনার বারাসাতে টিনে ঘেরা একটি ছোট্ট কামরায় শূন্যহাতে ঈশ্বরের নাম নিয়ে দিন কাটে তাঁর।

বাসন্তী অধিকারীর জীবন আলেখ্য উল্লেখযোগ্য নয়। তাঁর জীবন আর পাঁচটা অতি সাধারণ মানুষের মত ঘটনাবিহীন। তাঁর মত সাধারণ মানুষেরা স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রকৃত অর্থে মুক্তির, ন্যূনতম চাহিদা পূরণের।তাঁরা খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থানের স্বপ্ন দেখেছিলেন।স্বাধীনতার ৭৫ বছর কেটে যাওয়ার পরে তাঁদের স্বপ্ন প্রয়াণের মধ্যে তাঁরা আছেন কায়ক্লেশে বাঁচার দিনকে সঙ্গী করে।

অবিভক্ত ভারতের যশোর জেলায় জন্ম বাসন্তী অধিকারীর । আজন্ম বাঁচার সংগ্রামে থাকতে হয়েছে স্বচ্ছলতাহীন জীবনে। স্বাধীন ভারতে এসেছিলেন স্বামীর সঙ্গে।আজ স্বামী নেই। পুত্র কন্যারাও তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে। স্বাধীন ভারতের বয়স্ক মানুষের বাঁচার জন্য আর্থিক অবলম্বন জোটে খুব সামান্য। তবুও তার মধ্যেই বাঁচেন বাসন্তী অধিকারী। বর্তমানে বারাসাত-ব্যারাকপুর রোডের পাশে একটি ছোট চায়ের দোকানকে সম্বল করে স্বাধীন ভারতে জীবন যুদ্ধে মেতেছেন তিনি। সেখানেই তিনি চব্বিশ ঘন্টা কাটান। অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বিরাশি বছরের বৃদ্ধার।

বাসন্তী অধিকারীর কাহিনীর সঙ্গে ফারাক নেই দেশের সিংহভাগ প্রবীণ মানুষের।দেশের এরকম আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষজন মনে করেন, সব বিধিনির্ধারিত।তাঁদের অনেকের বাসন্তী অধিকারীর মতই দশ ফুট বাই দশ ফুট ঘর। দুবেলা শাকান্ন জোটে না, চিকিৎসা নেই অসুখে। তাঁরা এক বস্ত্র ও একটি গামছা দিয়েই লজ্জা নিবারণ করেন ।তাঁদের কাছে স্বাধীনতা দিবস জীবন যুদ্ধের একটি দিন।যারা অসহায় কণ্ঠে বলেন ওঠেন, ” যা পেয়েছি কপাল জোরে, তাই বা কম কী? ” বিধির বাঁধন কাটার শক্তি তাঁদের নেই, আজন্ম স্বাধীন দেশে বাঁচেন তাঁরা একাকী অসহায় ভাবে। তাঁদের সুদিন আসে না। বাসন্তী অধিকারীরা স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও নিজেভূমে পরবাসী।।


More Stories
লেনিনের মৃত্যু : বিতর্ক এবং বাস্তব
রাজ কিরণ অন্তর্ধান রহস্য
নেতা নয় নায়ক, যমের অরুচি, ঋতব্রতকে ভয়ঙ্কর আক্রমণ শতরূপের