রবিবাসরীয় গ্রন্থ আলোচনা
বিখ্যাত লেখক, বিখ্যাত গ্রন্থ
(পাঠকের চোখ – পর্ব ৩)
পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা :
আজ রবিবাসরীয় গ্রন্থ আলোচনায় থাকছে সাগরময় ঘোষের “সম্পাদকের বৈঠকে “
“সম্পাদকের বৈঠকে” পুস্তক নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে একটি উদ্ধৃতির পুনরায় উল্লেখ করা যাক ।’সম্পাদকের বৈঠকে’র একজায়গায় উল্লেখ আছে যে সফল লেখার সমীকরণ প্রসঙ্গে সৈয়দ মুজতবা আলী প্রায়ই আনতোলে ফ্রাসের একটি উদ্ধৃতি ব্যবহার করতেন – ” ইফ ইউ উইশ টু ট্র্যাভেল মোর ট্র্যাভেল লাইট “। লেখক সাগরময় ঘোষের ‘সম্পাদকের বৈঠকে’ গ্রন্থে সেই ধারাই অনুসৃত হয়েছে – সরল ভঙ্গীতে পাঠকের হৃদয়ের গভীরে যেতে চেয়েছেন সম্পাদক লেখক । কিছু টুকরো বাস্তবভিত্তিক বৈঠকী গল্পর সমাহারে গড়ে ওঠা এ এক অসামান্য গ্রন্থ। পাঠক এই একটি মাত্র বই পড়েই যেন ছুঁতে পারেন বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী রচনার স্রষ্টা অসংখ্য লেখককে।রবি ঠাকুর থেকে শুরু করে কে নেই সেই তালিকায়। আর এখানেই গল্পের ছলে বলা রম্যরচনা গ্রন্থ পেয়ে যায় ঐতিহাসিক উপাদান সমৃদ্ধ এক গ্রন্থের আদল।
আমরা জীবনী গ্রন্থ পড়ি মহাপুরুষদের জানার জন্য, অনুপ্রাণিত হতে এবং তাঁদের বাণী ও আদৰ্শকে অনুসরণ করে চলতে। আবার আমরা যখন লেখকদের জীবনী পড়ি তখন তাঁদের জীবনের টুকরো ঘটনা কাহিনী এবং সাহিত্যসৃষ্টির সাথে জড়িয়ে থাকা না জানা কাহিনী পড়ি। রবি- জীবনী , নজরুল – বঙ্কিম – মাইকেলের জীবনী পড়ি। কিন্তু হাতে গোনা কয়েকজন বাদে অধিকাংশ লেখকদের জীবনের হাসি- কান্না – সাফল্য ব্যর্থতা বা সাহিত্য সৃষ্টির গভীরের কথা জানতেই পারি না। সব লেখকের জীবনী লেখা হয় না, যাদের জীবনী লেখা হয় সেই কবি তথা লেখকের সাথে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ছোটো ছোটো গল্পের কথা অনেকেই জানতে পারেন না। কিছু কাহিনী শুধুমাত্র জানতে পারেন ঘনিষ্ঠ মানুষেরা, আড্ডার আসরে অনেক সময় সেই গল্প বিনিময় হয়। লেখকদের আড্ডার আসরের সুধারসধারা তো একেবারেই অন্যমাত্রার।সম্পাদকের বৈঠকে দেখা যাবে সম্পাদকের কাছে এসে অবসরে আড্ডায় মেতে উঠছেন সুধীজন ও লেখকরা, আর সেই কথকতার কোলাজ পাঠকের মনকে ভরিয়ে দেয় অনাবিল আনন্দে। অনেক সময়ে সম্পাদক বা প্রকাশকের অথবা বিশেষ সময়কালের শীর্ষস্থানীয় লেখকের কাছে যে আড্ডা বসে তার মধু আমরা আস্বাদন করি সম্পাদকের বৈঠকের মত বই লেখা হয় বলে। দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষের কাছে অবসর সময়ে এসে গল্প গুজবে মেতে উঠতেন যে লেখককুল – তাঁদের অভিজ্ঞতার ঝুলি উজাড় করা গল্পের কথা রম্যরচনার আকারে নিবদ্ধ করেছেন সাগরময় ঘোষ। বিমল মিত্র, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী,নরেন্দ্র নাথ মিত্র, সুশীল রায়, হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায় এবং তৎকালীন এক ঝাঁক লেখক দেশ পত্রিকার সম্পাদকের দপ্তরে এসে আড্ডার ফাঁকে যে গল্প শোনাতেন তার মধ্যে থেকে বাছাই করা কিছু কাহিনী এবং সাগরময় ঘোষের শান্তিনিকেতনে ছাত্রকালীন এবং সম্পাদক জীবনের অসাধারণ সব গল্পগাঁথা দিয়ে গড়ে উঠেছে ” সম্পাদকের বৈঠকে “। এই বৈঠকে কথিত বাস্তব অভিজ্ঞতার কাহিনী ও লোকমুখে চলে আসা কাহিনীর চরিত্র হয়ে দেখা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র,বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়,মানিক বন্দোপাধ্যায়,তারাশঙ্কর,প্রেমেন্দ্র মিত্র, মুজতবা আলী সহ অজস্র স্বনামধন্য কবি সাহিত্যিক। এসেছে রঙ্গমঞ্চের কথা, এসেছে শাস্ত্রীয় সংগীতের ওস্তাদের কথা, এসেছে ফুটবলখেলা।বিভূতিভূষণ বা মানিক বন্দোপাধ্যায়ের আলোড়ন ফেলা প্রথম রচনা যথাক্রমে পথের পাঁচালি বা অতসী মামী রচনার প্রেক্ষাপট জেনেছে পাঠক।সাগরময় ঘোষ নিজে সম্পাদক তাই তাঁর লেখায় বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে ভারতবর্ষ পত্রিকার সম্পাদক জলধর সেন ছাড়াও বহু সম্পাদকের কাহিনী।আছে বহু আনন্দ মুখর কাহিনী। খাদ্যরসিক কবি নিশিকান্তকে ঘিরে যেমন বলা-না বলা কাহিনী,আছে প্রভাত দেব সরকারের এক গল্পকে ঘিরে তৈরি হওয়া অশ্রুসজল আলেখ্যর অবতারণা।এসেছে বহু মজাদার ঘটনার উল্লেখ। এসেছে লেখকের কলমের ধারালো প্রয়োগ ও লেখনীর বিভিন্ন কষাঘাতের কাহিনী।তার দুয়েকটি উল্লেখ করা যাক ।

শিবরাম চক্রবর্তীকে লেখার নাট্যরূপের অর্থ থেকে বঞ্চিত করায় শরৎচন্দ্রের প্রতি শিবরামের ক্ষোভ ছিল। শরৎচন্দ্রর প্রিয় কুকুর ভেলি মারা যাওয়ার পরে শরৎ অনুগামী ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা মুষড়ে পড়লেন । শরৎচন্দ্রর এমনই একজন মোসাহেব সম স্তাবক ছিলেন জনৈক অবিনাশ ।সে সময় শিবরাম ভেলির মৃত্যুতে যে দু লাইনের লিমেরিক লিখেছিলেন তার উল্লেখ মেলে সম্পাদকের বৈঠকে বইয়ে ।অনবদ্য সে দু লাইন : “ভেলির বিনাশ নাই / ভেলি অবিনাশ “। অগ্রগতি পত্রিকায় দীনেশ দাসের ছাপতে দেওয়া কবিতার স্থানে হীরালাল দাশগুপ্ত মেশিনম্যানদের হাত করে কিভাবে নিজের কবিতা বসিয়ে নেওয়ায় ক্ষুব্ধ দীনেশ দাস বিবেকানন্দর উদ্ধৃতি সহযোগে চালাকির দ্বারা মহৎ কর্মের যে উল্লেখ হয় না তা সখেদে জানিয়েছিলেন। উল্লেখ্য পরবর্তীতে কবি হিসেবে দীনেশ দাস প্রতিষ্ঠা পেলেও হারিয়ে যান কবি হীরালাল দাশগুপ্ত।হীরালাল দাশগুপ্ত সম্পর্কে সুশীল রায় অন্য এক প্রসঙ্গে লেখেন “যে হীরালাল শিকার করেন, সে হীরালাল বন্য / এই হীরালাল পদ্য লেখেন, মানুষ মারার জন্য।” রয়েছে কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষের থিরবিজুরী লেখার পেছনে কৌতূহলোদ্দীপক কাহিনী, শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশের তাড়ার মধ্যে অসহায় লেখক, সম্পাদক ও ছাপার কাজে ব্যস্ত মানুষদের নিরলস পরিশ্রম ও অদম্য জেদের গল্প রয়েছে। আর এরকম টুকরো টুকরো অজস্র ফুলের মালা দিয়ে গাঁথা সম্পাদকের বৈঠকে – মুলত লেখক মহল কেন্দ্রিক সময়ের এক দলিল এই বই ।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
চলে গেলেন শংকর
প্রাণের অভাব নাকি বই বিক্রির রেকর্ড? বইমেলার প্রাপ্তি -অপ্রাপ্তি নিয়ে কী বলছেন লেখক-প্রকাশকরা?