Home » মহাকালের গ্রাসে আজ দীনবন্ধু মিত্রের বসতবাড়ি

মহাকালের গ্রাসে আজ দীনবন্ধু মিত্রের বসতবাড়ি

মধুমিতা দাস, সময় কলকাতা : একসময় যে বাড়িতে বসত সাহিত্যের আসর, চায়ের কাপের সঙ্গে জমে উঠত সাহিত্য – কৃষ্টি – সংস্কৃতি আড্ডা, যেখানে সাহিত্য বাসর জমাতে আসতেন সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ঈশ্বর গুপ্তর মত প্রথিতযশা সাহিত্যিকরা সেই বাড়ি আজ কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার প্রহর গুনছে!

উত্তর ২৪ পরগণার গোপালনগরের চৌবেড়িয়া গ্রাম। নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্রের জন্মভিটে। চৌবেড়িয়া গ্রামে থাকাকালীন তিনি তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘নীলদর্পণ’ নাটকের অনেকটাই লিখেছেন। নিরীহ নীলচাষীদের ওপর ইংরেজ নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে লেখা সেই নাটক ব্রিটিশ শাসকের মজবুত ভীতকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল।

নাটকটি প্রথমে ছদ্মনামে লেখা হলেও সেটির ইংরেজি অনুবাদ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং নাটকটি প্রকাশ করেন রেভারেন্ড জেমস লং। এরপর বেশকিছু ব্রিটিশ আধিকারিকদের কাছে পৌঁছে যায় সেই নাটক। খোঁজ চলে নাট্যকারের। নাটকটি ব্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার ওপর এমন তীব্র ভাবে আঘাত হানে যে তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকার ইন্ডিগো কমিশন পর্যন্ত বসান। নাটক প্রকাশের দায়ে লং সাহেবের কোর্টে অর্থদণ্ড হয়, এমনকি হাজতবাসও করতে হয়।

মহাকালের গ্রাসে আজ স্রষ্টার বসতবাড়ি। খসে পড়েছে বাড়ির ছাদ-পলেস্তরা, দরজা–জানলা, কড়ি – বর্গা আজ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বিশাল বাড়ি মহাকালের গ্রাসে ধুলোয় মিশেছে বেশিরভাগটাই। বাকিটুকুও যেন অস্তিত্ব হারানোর অপেক্ষায়।

২০১১ সালে ২৬ মার্চ তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার বাড়িটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করে। ২০১৬–১৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের পক্ষ থেকে বাড়িটি পরিদর্শনও করা হয়। কিন্তু তারপর? তারপর আজও পর্যন্ত বাড়িটি সংস্কার হয়নি। নীলদর্পণ নাটক স্রষ্টার পবিত্র বসত ভিটে গিয়ে দেখা গেল, এখন কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে বাড়িটি। বাড়িটিকে দখল করেছে জংলী আগাছা আর বিষাক্ত সাপ।

পরিবারের দাবি, একাধিকবার আবেদন করা সত্ত্বেও সংস্কারে উদ্যোগ নেয়নি কোন সরকার। জরাজীর্ণ সেই বাড়ির সামনে বসানো হয়েছে নাট্যকারের একটি আবক্ষ মূর্তি। পরিবারের আক্ষেপ, দীনবন্ধু মিত্রের জন্মদিন বা মৃত্যুদিনে তথ্য-সংস্কৃতি দপ্তরের পক্ষ থেকে একটা মাল্যদান পর্যন্ত করা হয় না এই মূর্তিটিতে। তবে আজও ইতিহাসের ছোঁয়া পেতে নিয়মিত বহু পর্যটক আসেন নাট্যকারের এই বাড়িটি দেখতে। পরিবারের আরও আক্ষেপ, দীনবন্ধু মিত্র ডাকবিভাগে চাকরি করলেও আজ পর্যন্ত ডাক দফতরের পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতিতে কোনও ডাকটিকিট বের করা হয়নি।

এই বাড়িটির পাশেই বসবাস করেন নাট্যকারের পরিবারের চতুর্থ পুরুষরা। দীনবন্ধু মিত্রের প্রপৌত্র সঞ্জিত মিত্র বলেন, “বারংবার দরবার করা সত্বেও বাড়ি সংস্কার হয়নি। হেরিটেজ ঘোষণা হয়েছে। ওই পর্যন্তই। জন্মদিন–মৃত্যুদিনে নাট্যকারের মূর্তিতে মালা পর্যন্ত কেউ দেন না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আমরা আস্থাশীল। তাঁর কাছে বিনীত অনুরোধ, তিনি যেন বাড়িটি সংস্কারে উদ্যোগ নেন।”

সামাজিক নাট্য রচনার পথিকৃৎ দীনবন্ধু মিত্র। তাঁর প্রথম নাটক নীলদর্পণ প্রকাশ হয় ১৮৬০ সালে। সাহিত্য পিপাসুরা বলছেন, বাংলা সাহিত্যকে যিনি এত সৃষ্টি দিয়ে সমৃদ্ধ করে তুলেছেন, বর্তমান স্কুলের সিলেবাসে নেই সেই দীনবন্ধু মিত্রের নাম। তাই নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অনেকে জানেই না দীনবন্ধু মিত্রের কথা। এ বিষয়ে সাহিত্যিক মলয় গোস্বামী বলেন, “শুধু স্মৃতি বিজড়িত বললেই হবে না, স্মৃতিকে জড়িয়ে রাখতে হবে, ঠিক ঠাক সারাতে হবে তবেই রক্ষা করা সম্ভব।”

বনগাঁ দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক স্বপন মজুমদার বলেন, “ওই বাড়ির যারা সদস্য তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। রাজ্য সরকারকে আমি এ বিষয়ে চিঠি লিখে জানাব।” অন্যদিকে,  তৃণমূল বনগাঁ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ দাস জানান, “দীনবন্ধু মিত্রের পরিবারের যারা রয়েছেন তারা সরকারকে লিখিতভাবে আবেদন জানালে আমরা নিশ্চয়ই চেষ্টা করব।”

About Post Author