সময় কলকাতা ডেস্ক : বাংলার হৃদয় ও মস্তিস্ক থেকে রক্তক্ষরণ। অন্তত বিশেষজ্ঞরা তেমনটাই মনে করছেন। বারাসাতের হেস্টিংস হাউস প্রাচীন ইতিহাসের পরিচিত মুখ তার ওপর থেকে মুছে যাচ্ছে সময়ের চিহ্ন। স্থাপত্যকলা ও প্রাচীন পুরাকীর্তির ওপরে বালি, সিমেন্ট, কংক্রিটের আস্তরণ পড়েছে। ইতিহাসকে হত্যা করার অভিযোগ উঠছে। আমরা সময় কলকাতার পর্দায় আজ দেখে নেব প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী বারাসাতের হেস্টিংস হাউসের অতীত ও বর্তমান।
বিশাল অট্টালিকার পরতে পরতে ইতিহাস। কিছুদিন আগেও জরাজীর্ণ ঐতিহাসিক অট্টালিকা থেকে খসে পড়ত ইট বালি আর পলেস্তারা। প্রশ্ন উঠত, বহু ইতিহাসের সাক্ষী বারাসাতে ওয়ারেন হেস্টিংসের স্মৃতি বিজড়িত ভিলা যা হেস্টিংস হাউস বা ভিলা নামে পরিচিত তা হেরিটেজের মর্যাদা পেলেও তাকে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে না কেন? দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। অবশেষে আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্ট হেস্টিংস হাউজের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু করে।ইতিহাসপ্রেমী যে গুটিকয়েক মানুষ মাকড়সার জাল আর ধুলোবালি সরিয়ে হেস্টিংস হাউসে ঢুকে ওক কাঠের কড়িকাঠের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন তাঁদের প্রবেশও কালের সাথে সাথে বন্ধ হয়ে গেল । বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকল সংস্কার কার্য বা রিনোভেসন। অথচ দুর্ভাগ্যের বিষয়, সংস্কার কার্যে প্রাচীন পুরাতত্ত্বের সঙ্গে নিবিড় হবে যোগ থাকা ঐতিহ্য স্থাপত্য পুরা-নিদর্শনের দিকে নজর যথাযথ ভাবে দেওয়া হল না।সংস্কারের নামে অতীতের সঙ্গে সাযুজ্য থাকা ইতিহাসকে মুছে ফেলা হতে থাকল হেস্টিংস হাউজের অট্টালিকার গা থেকে। আধুনিক স্থাপত্যের রূপ নিল অতীতের হেস্টিংস হাউস। সংস্কারের কিছু কাজ আজও বাকি।সর্বসাধারণের জন্য প্রবেশদ্বার আজও উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়নি। হেরিটেজের স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে হেস্টিংস হাউসের যে পরিবর্তনটুকু এসেছে তা বাহ্যিকভাবে আশাহত করার মত। হেস্টিংস হাউজকে আজ আর ইতিহাসের নিদর্শন মনে হয় না বাইরে থেকে। ইতিহাস বোদ্ধাদের মতে, এখন আর দেখে মনে হয় না প্রাচীন স্থাপত্যের বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট আছে। প্রাচীন ঐতিহ্যকে মনে হয় বর্তমান যুগের একটি বিশাল অট্টালিকা মাত্র। অট্টালিকা বাঁচলেও ইতিহাস বাঁচে নি। সংস্কৃতিপ্রেমী ও ইতিহাস নিয়ে যারা আলোচনা করেন তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন হেস্টিংস হাউসের বর্তমান রূপ দেখে।
উত্তর চব্বিশ পরগনার সদর শহর বারাসাতস্থিত জেলাশাসকের কার্যালয়ের সামান্য দূরে ওয়ারেন হেস্টিংসের থাকার জন্য প্রমোদ উদ্যানের কেন্দ্র থাকা এই ভিলাটি তৈরি হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দুশো বছরের ও আগে। অট্টালিকার নির্মাণকালের প্রকৃত সময় নিয়ে সামান্য বিতর্ক রয়েছে । ঐতিহাসিকদের অধিকাংশ মনে করেন হেস্টিংস হাউস তৈরি হয়েছিল ১৭৭২ থেকে ১৭৮৫ সালের মধ্যে। ঐতিহাসিকরা মনে করেন হেস্টিংস ফোর্ট উইলিয়াম প্রেসিডেন্সির গভর্নর বা বাংলার গভর্নর হওয়ার পরই সাজিয়ে নেওয়া হয়েছিল হেস্টিংস হাউস। সঠিকভাবে ধরলে প্রায় আড়াইশো বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে অনেক ইতিহাসের সাক্ষী বারাসাতের হেস্টিংস হাউস। কিন্তু বর্তমানে হেস্টিংস হাউসের শরীর থেকেই যেন উধাও হয়ে গেছে অতীতের গন্ধ। পুরো খোলনলচে পাল্টে দেওয়া হয়েছে হেস্টিংস হাউসের। অষ্টাদশের শতকের স্থাপত্য শৈলীকে মর্যাদা দিয়ে ধরে রাখা হয়নি , অন্তত বাইরে থেকে তেমনটাই বোধ করছেন অতীতের বারাসাতবাসীরা। হেস্টিংস হাউসের অভ্যন্তরেও ইতিহাস ও সময়কে ধরে রাখার চেষ্টা আদৌ করা হয়েছে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান ইতিহাসপ্রেমীরা।

হেস্টিংস হাউসের বাইরের রূপ দেখে মুগ্ধ হতে পারছেন না যারা, তারা দাবি করছেন ইতিহাসপ্রেমী দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হোক হেস্টিংস হাউসের প্রবেশদ্বার। চেহারার ভোল যতই পাল্টাক, ইতিহাস প্রেমীরা যেন অবিলম্বে ঐতিহাসিক ইমারতে প্রবেশের অধিকার পান। ইতিহাসপ্রেমীদের মনের গভীরে এখনও আশা, হয়তো হেস্টিংস অভ্যন্তরের রূপ এতটা আশাহত করবে না। ইতিহাস ও সময় কে ধরে রাখার কিছু হলেও চেষ্টা করা হবে।।


More Stories
ভারতরত্ন সম্মান : ইতিহাস ও বিতর্ক
স্বামী বিবেকানন্দের মা বীর জননী আখ্যা পেয়েছিলেন, কিন্তু কার জন্য? জানেন কি?
আগ্রার ঔরঙ্গজেবের ‘মুবারক মঞ্জিল’ গুঁড়িয়ে দেওয়া হল! নিন্দায় সরব ঐতিহাসিকরা