সময় কলকাতা স্পোর্টস ডেস্ক : তিনি লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো নন। এমনকি মদরিচের মতো বল প্লেয়ারের সঙ্গে তাকে এক আসনে রাখেন না অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞ। তবুও তাঁর খ্যাতি খুব কম নয়। মেসি, রোনাল্ডো, মদরিচের মত তাঁরও সম্ভবত এই শেষ ফুটবল বিশ্বকাপ। এ বছর মে মাসেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন কাতার বিশ্বকাপের পরেই তিনি অবসর নেবেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে। তিনি যেদিন ফর্মে থাকেন, তাঁর নিজের দিনে, যেদিন তার বাঁ পা কথা বলতে শুরু করে, সেদিন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকতে হয় মাঠের অন্য ২১ জনকে খেলোয়াড়কে। একেক সময় তথাকথিত বিশ্বসেরাদেরও তাঁর পাশে ম্লান মনে হয়। তিনি কি করতে পারেন তাঁর প্রমাণ তিনি রেখেছেন লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনালে মাত্র ৬৩ মিনিটের অবকাশে। তিনি যখন মাঠ ছাড়ছেন তখন আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে। রবিবার বিশ্বকাপ ফাইনালে লিওনেল মেসি ও কিলিয়েন এমবাপের উপস্থিতি সত্বেও মাঠে আলো ছড়ালেন তিনি। তিনি অ্যানজেল ডি মারিয়া। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার জয়ে ডি মারিয়ার অবদান ও তার ফুটবল জীবনের ছোট্ট কোলাজ নিয়ে আলোচ্য প্রতিবেদন।

এঞ্জেল ডি মারিয়া কে নিয়ে আলোচনার আগে উল্লেখ করা দরকার আর্জেন্টিনার কোচের একটি অসামান্য চাল নিয়ে।সম্ভবত এই চালের জন্য ফাইনালের আগে যতই যুক্তি বা অঙ্কে ফ্রান্সকে এগিয়ে রাখা হোক, আবেগের কাছে হার মেনে যায় সমীকরণ। অভিজ্ঞতার কাছে বশ্যতা স্বীকার করে গতি ও শক্তি। আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি খেলা শুরুর আগে সবচেয়ে বড় যে চালটি দিয়ে বসেন তাতেই বাজিমাত না হলেও কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিনার জয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন হয়ে যায় । মেসি বনাম এমবাপের লড়াই বলে অভিহিত হওয়া কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে সবাইকে চমকে আর্জেন্টিনার কোচ প্রথম একাদশে রাখেন ডি মারিয়াকে। প্রথম একাদশে ডি মারিয়াকে রাখা হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় ছিলই। আর সুযোগ পেয়ে ডি মারিয়া খেলার প্রথমার্ধে যেন ছাপিয়ে গেলেন সবাইকে। মেসির ইতিহাস গড়ার দিন রবিবার ফাইনালে কম আলোচিত থেকেও এমবাপে ও মেসির পাশাপাশি নায়ক হিসেবে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত ডি মারিয়া। দুই অভিজ্ঞ বল প্লেয়ার কে আটকাতে হিমশিম খেয়ে যায় ফ্রান্সের রক্ষণ। এক মেসি তে রক্ষা নেই ডি মারিয়া দোসর হয়ে দেখা দেন মহারণে । ফ্রান্সের রক্ষণভাগে তিনি সঞ্চার করেন ত্রাসের।খেলা শুরুর ২৩ মিনিটের মধ্যে একাধিক প্লেয়ার কে অতিক্রম করে বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েন ডি মারিয়া। তাঁর বিপজ্জনক স্কিল থামাতে তাঁকে পেছন থেকে ধাক্কা দিতে বাধ্য হন ডেম্বেলে।ব্যক্তিগত দক্ষতায় পেনাল্টি আদায় করে নেন ডি মারিয়া পেনাল্টিতে গোল করতে ভুলচুক করেন নি জাদুকর মেসি । প্রথমার্ধের ৩৬ মিনিটে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোল করে খেলার ভাগ্য যেন কার্যত নিশ্চিত করে দিলেন সেই ডি মারিয়া। এবারও কাজ করে মেসি -ডি মারিয়া যুগলবন্দী। ৬৩ মিনিট মাঠে থেকে ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের অন্যতম মূল চরিত্র ডি মারিয়া যখন মাঠ ছাড়েন তখন দর্শকদের অনেকেই ভেবেছিলেন অ্যাকুনাকে নামিয়ে কিছুটা কিছুটা রক্ষণাত্মক হয়ে যাওয়াই হয়তো আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের প্রকৃত পথ। বাস্তবে পরবর্তী সময়ে দেখা যায়,ডি মারিয়া না থাকায় আলভারেজ ও মেসি প্রায়শই একা হয়ে পড়ছিলেন আর এরই ফাকে জোড়া গোল করে ফ্রান্সের আশা দারুণভাবে জাগিয়ে তোলেন এমবাপে। ঠিক সে সময় দর্শকদের মনে হয়ে থাকতেই পারে কোচ স্কালোনি বহুযুদ্ধের ঘোড়া ডি মারিয়াকে আরও একটু সময় দিতে পারতেন। অন্যদিকে, সদ্য চোট ছাড়িয়ে আসা ডি মারিয়াকে ৯০ মিনিট খেলানো ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলেন কোচ। কোচের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত খেটে যায় আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয়ী হওয়ায়। আর আপাত দৃষ্টিতে ডি মারিয়াকে পার্শ্বনায়ক মনে হলেও খেলার শুরু থেকেই একের পর এক বাম প্রান্তিক আক্রমণ তুলে আনছিলেন ডি মারিয়া। খেলার প্রথম ৭৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার মনোবল বৃদ্ধির এবং ফ্রান্সের খোলসে ঢুকে যাওয়ার পেছনে অন্যতম চালিকা শক্তি ছিলেন ডি মারিয়া।

ডি মারিয়া মাঠে থাকার সময় আর্জেন্টিনার আক্রমণ ভাগ কতটা ক্ষুরধার ছিল এ দিন তার প্রমাণ মেলে প্রথম ৭৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার ফ্রান্সের গোলমুখী ৯ টি প্রচেষ্টা এবং আর্জেন্টিনার তরফে ৫টি সরাসরি গোলমুখী শটের পরিসংখ্যান দেখলেই। অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য বিষয়,প্রথম ৭৫ মিনিট পর্যন্ত একটি শটও আর্জেন্টিনার গোলে রাখতে পারেনি ফ্রান্স। ডি মারিয়া যতক্ষণ মাঠে ছিলেন ততক্ষণ ফ্রান্সের রক্ষণভাগকে বারে বারে নাজেহাল করে ছেড়েছেন তিনি। হয়তো ফ্রান্সের কোচের ভাবনাতে আর্জেন্টিনার প্রথম একাদশে ছিলেন না ডি মারিয়া। তাই ডি মারিয়াকে রোখার রণ কৌশল জানা ছিল না ফ্রান্সের ডিফেন্ডারদের। নির্যাস আর্জেন্টিনার তৃতীয় বার বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম কারিগর হয়ে থাকলেন এঞ্জেল ডি মারিয়া।

উত্তর আমেরিকায় আগামী বিশ্বকাপ যখন শুরু হবে তখন প্রায় ৩৯ বছর বয়স হয়ে যাবে ডি মারিয়ার। ১৪ বছর আগে নীল সাদা জার্সি গায়ে চাপিয়েছিলেন ডি মারিয়া। ১২৯টি ম্যাচে আর্জেন্টিনা হয়ে ২৮ টি গোল করেছেন। তবে প্রয়োজনের অংকে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে রবিবার বিশ্বকাপ ফাইনালে দ্বিতীয় গোলটি। কাতার বিশ্বকাপ তার চতুর্থ বিশ্বকাপ অভিযান।২০১৪ সালে যেবার আর্জেন্টিনা জার্মানির কাছে রানার্স হয় সেবার দর্শকদের মন কেড়েছিলেন তিনি। সুইজারল্যান্ড দলের বিরুদ্ধে একটি অনবদ্য গোলও করেন তিনি। ২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ৩-৪ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। আর্জেন্টিনার পক্ষে গ্লানির সে ম্যাচে যেন মেসিকে ছাপিয়ে গেছিলেন ডি মারিয়া। সেদিন একটি দূরপাল্লার শটে গোল করেছিলেন যেমন, তেমনই বারবার ফ্রান্সের দুর্গে হানা দিয়েছিলেন ডি মারিয়া। তবুও শেষরক্ষা হয়নি । চার বছর আগের পরাজয়ের কথা হয়তো মনে রেখেছিলেন মূলত বাঁ পায়ের আক্রমাত্মক এই মিডফিল্ডার যিনি বরাবরই উইং দিয়ে আক্রমণ শানাতে ভালোবাসেন। তাই গোল করে ও গোল করিয়ে ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালকে স্মরণীয় করে তুললেন তিনি।

চোট আঘাত মাঝে মাঝেই বিব্রত রেখেছে ডি মারিয়াকে।২০১৪ সালের বিশ্বকাপের মত ২০২২ সালের বিশ্বকাপে এসেও দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে ডি মারিয়াকে।বদলার ম্যাচে লিওনেলস স্কালোনির অন্যতম মূল হাতিয়ার হয়ে ওঠা ডি মারিয়াকে হয়তো বিশ্বকাপে আর দেখা যাবে না , কারণ তিনি আগেই জানিয়েছিলেন কাতার বিশ্বকাপের পরেই তিনি অবসর নিতে চান। একদিকে ডি মারিয়ার পক্ষেও যেমন ভোলা সম্ভব নয় কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ অন্যদিকে ফুটবলপ্রেমীদেরও তাঁকে ভোলা সম্ভব হবে না কোনওদিন।।


More Stories
ছয় বিদেশীতে মোহনবাগান প্রস্তুত, জেরবার ইস্টবেঙ্গল, কবে আসছেন এফিয়ং?
সিরিজের মাঝপথে পাকিস্তানের ৭ প্লেয়ার ছাঁটাই
ব্রাজিল ম্যাচের ভারতীয় দল ঘোষিত