Home » এক আদিম আশ্চর্য, ভিম বৈঠকা গুহা

এক আদিম আশ্চর্য, ভিম বৈঠকা গুহা

সময় কলকাতা ডেস্ক,১৮ জানুয়ারি: লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ভ্যানগগ রেমব্রান্ড প্রত্যেক শিল্পী ছবি সারা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে, প্রশংসিত হয়েছে বিশ্বের দরবারে। এছাড়া বহু শিল্পী, সূক্ষ্ম তুলির ছোঁয়ায় ক্যানভাসে ফুটে ওঠা ছবি আজ সমাদৃত সারা বিশ্বে। অথচ অপটুহাতে পাথরের দেওয়ালে আঁকিবুকি কেটে আঁকা ছবি বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে বিশ্বের আপামর শিল্পপ্রেমী মানুষের মনে শুধু শিল্প প্রেম নয় প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসবিদদের আগ্রহের অন্যতম আকর্ষণ গুহার এই দেওয়াল চিত্র। প্রস্তর যুগের এই গুহাচিত্র যা ২০০৩ সালে ইউনেস্কো দ্বারা বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে।

ভিম বৈঠকা মধ্যপ্রদেশের রাইসন জেলার দশ কিলোমিটার লম্বা এবং তিন কিলোমিটার চওড়া জায়গাটি ভোপাল থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে অবস্থিত। বিন্ধ পর্বত অঞ্চলের একটি উপত্যকায় শাল সেগুন গাছ-ভরা এক গহীন অরন্যের মাঝে দীর্ঘ যুগ অচেনা অজানা এবং অনাবিষ্কৃত অবস্থায় পড়েছিল এই ভীম বৈঠকা গুহা। এই গুহার আবিষ্কার এটা অনেকটা কাকতালীয়ভাবে হয়েছিল। এমনিতেই ভিম বৈঠকা ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের তালিকাভুক্ত ছিল তার কারণ এই অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের কিছু নিদর্শন বহু বছর আগে পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু আজ থেকে ৬০ বছর আগে উজ্জয়নী বিক্রম বিশ্ববিদ্যালয় পুরাতত্ত্ববিদ ডক্টর ভি এস ওয়াঙ্কার ট্রেনে করে ভোপাল যাওয়ার সময় ভিম বৈদিককার গঠনশৈলী দেখে অনুমান করেছিলেন এই পার্বত্য অঞ্চলে আদিম মানুষের বসবাস থাকতে পারে তার কারণ ফ্রান্স এবং স্পেনে যে সমস্ত পাহাড়ে আদিম মানুষের বসবাস পাওয়া গিয়েছিল সেই পাহাড়ের সঙ্গে ভিম বৈঠকা পাহাড়ের কিছুটা হলেও সাদৃশ্য রয়েছে। আর যেমন অনুমান করেছিলেন তিনি ঠিক তেমনি অনুসন্ধান করার পর খুঁজে পান প্রাগৈতিহাসিক যুগের আদিম মানুষের বসবাস করার এক গুহা অর্থাৎ শৈলাশ্রয়। ভিম বৈঠকার কেন এত প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে গুরুত্ব তার অবশ্য বহু কারণ আছে।

এই অঞ্চলে প্রায় ১৬ বছর ধরে অনুসন্ধান কার্য চালান প্রত্নতাত্ত্বিকরা সেই অনুসন্ধান চলাকালীন সাতশোর বেশি কিছু গুহা আবিষ্কৃত হয় যার মধ্যে প্রায় ৪০০ গুহাতে ছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহমানবদের আঁকা ছবি। শুধুমাত্র গুহাচিত্র নয় এই সমস্ত অঞ্চলে খননকার্য চালিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছে সেই সময়কার অস্ত্র গৃহস্থালি সরঞ্জাম। আবিষ্কৃত হওয়া এইসব নিদর্শন প্রস্তর যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত জনবসতির নিদর্শন বহন করে। সবচেয়ে প্রাচীন গুহাচিত্র গুলো বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার বছর আগের অর্থাৎ প্রস্তর যুগের সময়কার। এবং অন্যান্য গুহাচিত্রগুলো ১২ থেকে ১৫ হাজার বছর আগের অর্থাৎ মধ্যযুগের সময়কার।

এ কথা বলা যেতেই পারে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন জনবসতির অন্যতম নিদর্শন এই ভিম বৈঠকা। যে গুহাগুলি আবিষ্কৃত হয়েছে সেই গুহাগুলির মধ্যেও রয়েছে প্রকারভেদ। অর্থাৎ তৎকালীন সময়ে গুহায় বসবাসকারী আদিম মানবেরাও একত্রে বসবাস করত। এর প্রমাণ স্বরূপ এই ভিম বৈঠকা অঞ্চলে পাওয়া গিয়েছে অডিটোরিয়াম অর্থাৎ সভাগৃহ। যদিও এই ৭০০ গুহার মধ্যে শুধুমাত্র ভ্রমণ প্রিয় মানুষদের জন্য আর্কোলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া ১৫ টি গুহা খুলে রেখেছেন। এই অঞ্চলে পাওয়া গিয়েছে জু রক যার ছাদে রয়েছে একাধিক রংবেরঙের গুহাচিত্র। একাধিক গুহা রয়েছে যে গুহার মধ্যে ঢোকা কার্যত অসম্ভব কারণ গুহায় ঢোকার মুখ দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত থাকার কারণে এতটাই সরু হয়ে গিয়েছে যে সেখান থেকে মানুষ ঢোকা কার্যত অসম্ভব।। একটি বিশাল আকৃতির গুহা রয়েছে যাকে বলা হয় অডিটোরিয়াম কেভ অর্থাৎ সভাগৃহ। ২৫ মিটার লম্বা এবং ১২ মিটার উঁচু দুই দিক খোলা প্রশস্ত সুরঙ্গ যা ভেতর থেকে আড়াআড়িভাবে বিভক্ত। আর তার পাশেই রয়েছে অপেক্ষাকৃত আরেকটি ছোট্ট সুরঙ্গ আর এই দুই সুরঙ্গের সংযোগস্থলে রয়েছে একটি বিশাল পাথর যে পাথরকে স্থানীয়রা নাম দিয়েছে সরদারের পাথর এই পাথরটির উচ্চতাও নেহাত কম নয়। প্রায় ২৫ মিটার উচু। আর সাড়ে তিন মিটার চওড়া। এইসব গুহার মধ্যে কাফের মতন কিছু গর্ত পাওয়া গিয়েছে। যা খুব শক্ত পাথরের ওপর আরো শক্ত কোন পাথর দিয়ে খোদাই করে এই গর্তের রুপ দেওয়া হয়েছে। এবার নজর যাক গুহা মানবদের আঁকা গুহাচিত্রের দিকে। ৪০০টি গুহায় যে গুহাচিত্র পাওয়া গিয়েছে সেই গুহাচিত্রে মূলত দেখা গিয়েছে সাদা কালো রঙে আঁকা কিছু ছবি পাশাপাশি -লাল হলুদ ও সবুজ রঙে আঁকা কিছু ছবি।

তারা মূলত সাদা রং যে ব্যবহার করত তা বানাতো তারা চুনাপাথর দিয়ে আর সবুজ রং বানাতো ক্যালসিডনি নামে একরকম সবুজ পাথর গুঁড়ো করে। আর ক্যালসিডনির সঙ্গে তারা মেশাত কচি গাছের ছাল। লাল রং তৈরির জন্য গুহা মানবেরা বিভিন্ন খনিজ পদার্থের ব্যবহার করত। ম্যাঙ্গানিজ লোহার আকর নরম লাল পাথর ও কাঠ কয়লার মিশ্রণ তৈরী করে তারা তৈরি করতো লাল রং। সজাগ গুহাচিত্র গুলির প্যাটার্ন নিয়ে। মূলত গুহাচিত্রগুলিতে একাধিক ধরনের প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়।

কিছু লেখার মাধ্যমে মানুষ এবং জন্তু-জানোয়ারের আকৃতিকে তারা গুহার দেওয়ালে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। কিছু গুহাচিত্রে দেখা গিয়েছে একজন মানুষ তীর হাতে পাথরের উপর বসে আছে। কোথাও বার হয়েছে ঢাল তলোয়ার বর্ষার তীর ধনু হাতে যুদ্ধ করছে। সেখানে রয়েছে একটি বাঘের ছবি। একটি জায়গায় একটি বাঁদরের ছবিও আঁকা রয়েছে। কয়েকটি গুহায় পাওয়া গিয়েছে সাদা রঙের আঁকা তীর ধনুক হাতে পদাতিক এবং একদল অশ্বারোহী যাদের হাতে লাঠি এবং মোটা পাথরের মতন অস্ত্র দেখতে পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন পশু পাখির ছবি দুটি হাতি ছবি আঁকা রয়েছে যার শূরের তুলনায় তার শরীর খুবই ছোট। ঘোড়ার পিঠে বসে রয়েছে অশ্বারোহী এবং তাদের মাথায় টুপি এই ছবি থেকে বিশেষজ্ঞদের অনুমান তৎকালীন সময়ে মাথায় শিরস্তান পড়ার প্রচলন হয়েছিল। তবে এই ছবিগুলি খুব একটা প্রাচীন নয়। গুহার দেওয়ালে বাই সন বাঘ সিংহ হাতি ঘোড়া বুনো শুয়োর গন্ডার কুকুর নীলগাই কুমির ময়ূর ইত্যাদি ছবি যেরকম পাওয়া গিয়েছে তেমনি কিছু কাল্পনিক জন্তুর ছবিও পাওয়া গিয়েছে গুহাচিত্রে। দেওয়ালের গায়ে এক শিশুর হাতের ছবিও রয়েছে।। ৭০০ গুহার মধ্যে যে ৪০০ গুহাতে গুহাচিত্র পাওয়া গিয়েছে সেই সমস্ত গুহাচিত্রে একাধিক কালের ছবি রয়েছে এমনও ছবি রয়েছে যা প্রায় ৩০ হাজার বছর আগের আর এমনও ছবি রয়েছে যা পাঁচ থেকে ১০ হাজার বছর আগের। অর্থাৎ গুহাচিত্রে মিশ্র যুগের মিশ্র ছবি এবং যে রঙের ব্যবহার হয়েছে সেই রঙের আবিষ্কারও বিভিন্ন যুগে আবিষ্কৃত হয়েছে। সাদা রঙে আঁকা হাতে হাত ধরে মানুষের নিত্যের ছবি পাশে রয়েছে ঢোলের মতন বাদ্যযন্ত্র হাতে নিয়ে বাজানোর ছবি। অর্থাৎ ভীম বইখার এই গুহাচিত্র এক কথায় বলতে গেলে একাধিক যুগের সমাজ ব্যবস্থা তাদের আবেগ তাদের সুখ-দুঃখ তাদের পারিপার্শ্বিক জীব জন্তুর একটা সঠিক বর্ণনা পাওয়া যায়। পৌরাণিক মতে পাণ্ডবেরা নাকি এর ভীম বেঠকা অঞ্চলে এসে একটি গুহার মধ্যে তারা আশ্রয় নিয়েছিল। ভিম এই অঞ্চলে বসেছিলেন বলেই এই জায়গার নাম ভীম বৈঠকা। তবে পাণ্ডবেরা এখানে এসেছিলেন অথবা ভীম এই অঞ্চলে বসবাস এবং বসেছিলেন কিনা তার সঠিক তথ্য না থাকলেও এটা ঠিক ভিম বৈঠকার এই গুহাচিত্র আজ বিশ্বের এক গবেষণার বস্তু। ঐতিহাসিক মানুষের আঁকা ছবি প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল স্পেনের আলতামিরা গুহায়। কিন্তু সেক্ষেত্রে ভীম বৈঠকাও খুব একটা পিছিয়ে নেই। ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন গুহাচিত্র বলা হয় এই ভীমবৈঠকার গুহাচিত্রকে। ২০০৩ সালে ইউনেস্কো একে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এই স্বীকৃতির থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সেই সময়কার মানবেেরা যে রং এর সৃষ্টি করেছিল মনের ভাব ফুটিয়ে তোলার জন্য যে গুহাচিত্র এঁকেছিল তা এককথায় অনবদ্য। যা আরও কয়েক প্রজন্ম এবং কয়েক যুগ ধরে গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে থাকবে।

About Post Author