সময় কলকাতা ডেস্ক,১৮ জানুয়ারিঃ পাকিস্তানের বোলান নদী, সম্প্রতি এই নদী বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিতি লাভ করেছে অন্য রূপে। বোলান নদী করাল রূপ ধারণ করে তার দুই পাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভাসিয়ে দিয়ে স্তব্ধ করে দিয়েছে আধুনিক সভ্যতার আগ্রাসনকে। পাক অধিকৃত বালুচিস্থানের বহু মানুষ রাতারাতি হয়ে গিয়েছেন বেঘোর। অথচ কয়েক হাজার বছর আগে এই বোলার নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল এক প্রাচীন সভ্যতা। প্রত্নতাত্ত্বিকদের দ্বারা আবিষ্কৃত হওয়া অবিভক্ত ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতা এই বোলান নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল, যার নাম দেওয়া হয়েছে মেহেরগড় সভ্যতা। বলা হয়ে থাকে ভারতের প্রাচীনতম গ্রামীণ সভ্যতা হল প্রাগৈতিহাসিক নব্য প্রস্তর যুগের মেহেরগড় সভ্যতা আর এই সভ্যতার সময়কাল ছিল ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। মেহেরগড় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছে বর্তমান পাকিস্তানের বালুচিস্থানের বোলান নদীর তীরে বোলান গিরিপথের কাছে কাচ্চি সমভূমিতে , সিন্ধু উপত্যকার পশ্চিম দিকে, কোয়েটা শহর থেকে ১৫৯ কিলোমিটার দূরে প্রায় ৬০০ একর এলাকা জুড়ে।

এই মেহেরগড় সভ্যতা কোয়েটা, সিবি, এবং কালাত শহরের খুবই সন্নিকটে অবস্থিত। ভারতীয় অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রামীণ প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতার এই হদিশ কিন্তু একদিনে পাওয়া সম্ভব হয়নি দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানের ফলে ১৯৭৪ সালে ফরাসি প্রত্নবিজ্ঞানী ফাঁসোয়া জারিজ তার অনুসন্ধানকারী দলের সঙ্গে অনুসন্ধান এবং গবেষণা চালাচ্ছিলেন কোয়েটা শহরের সন্নিকটে। অনুসন্ধানকারী দলের এক সদস্য আচমকাই সন্ধান পান এক প্রাচীন প্রত্ন দ্রব্যের। আর সেখানেই অনুসন্ধান করে পাওয়া যায়, প্রাগৈতিহাসিক নব্য প্রস্তর যুগের এক উন্নত সভ্যতার হদিশ। এবার আসা যাক মেহেরগড় সভ্যতার ভৌগোলিক অবস্থানের বর্ণনায়।

মেহেরগড় সভ্যতার উত্তরে বােলান গিরিপথ, কাকর পর্বতশ্রেণি, দক্ষিণে কাচ্চি সমভূমি, সিন্ধুনদ, কিরথর পর্বতশ্রেণি, পূর্বে সুলেমান পর্বতশ্রেণি, সিন্ধু উপত্যকা এবং পশ্চিমে রয়েছে হেলমান্দ, মারগাে ও তাহলাব মরুভূমি। অর্থাৎ বলা যেতে পারে এই সভ্যতা গড়ে উঠেছিল চারিদিকে পর্বতের নিরাপদ আশ্রয়ে আর নদীমাতৃক অঞ্চলের সচ্ছলতার পরিবেশে। এই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল ধীরে ধীরে নিজেদের উন্নতি সাধনের মাধ্যমে। বছরে পর বছর এই সভ্যতা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নিজেদের ক্রম বিকাশ ঘটিয়েছিল।আনুমানিক ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ অবধি ছিল সভ্যতার বিকাশের প্রথম পর্ব। দ্বিতীয় পর্বের উন্নতি সাধন ঘটেছিল আনুমানিক ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ অবধি। আনুমানিক ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এই সভ্যতা ছিল উন্নতির চরম শিখরে।

প্রাগৈতিহাসিক নব্য প্রস্তর যুগের এই প্রাচীন সভ্যতায় গড়ে উঠেছিল এক উন্নত সমাজ ব্যবস্থা। অবশ্য প্রশ্ন উঠতেই পারে যে,কেন বলা হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক নব্য প্রস্তর যুগ। সাধারণত ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে যে সভ্যতার কোন লিখিত বিবরণ থাকে না শুধুমাত্র আবিষ্কৃত হওয়া প্রমাণের উপর নির্ভর করে এক সভ্যতার সময়কাল নির্ধারণ করা হয় সেই সভ্যতাকে বলা হয় প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা। মেহেরগড় সভ্যতা প্রস্তর যুগের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সময়কালের এক সভ্যতা, ফলে এই সভ্যতার পরতে পরতে ছিল উন্নতির বিকাশ। কিন্তু কেমন ছিল সেই সভ্যতার সমাজ ব্যবস্থা কতটাই বা উন্নতি করেছিল নগরায়নে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ঐতিহাসিকরা ধীরে ধীরে প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। প্রত্নতাত্ত্বিকদের প্রমাণের ভিত্তিতে জানা গিয়েছে, মেহেরগড়বাসী মাটির পাত্রের ব্যবহার বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছিল। শুধু মৃৎশিল্প নয় অন্যান্য কারিগরি শিল্পেও তারা ছিলেন পারদর্শী। বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় পাত্র বড় এবং ছোট আকৃতির পাত্র তারা তৈরি করতেন। পোড়ামাটির সিলমোহর ব্যবহৃত হতো প্রশাসনিক কাজে। স্মরণ কার্যের সময় উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন নারী পুরুষের মূর্তিগুলো ছিল নান্দনিক।

মেহেরগড় সভ্যতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় বাণিজ্যৈ উন্নতি সাধন। অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্য চালাতেন মেহেরগড় বাসী। চাকার আবিষ্কার হয়েছিল এই সভ্যতায় তারও প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে খনন কার্যের সময়। অনেক ইতিহাসবিদ এবং প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে হরপ্পা সভ্যতা আদতে মেহেরগড় সভ্যতার বিকশিত রূপ। অর্থাৎ উন্নত নগরায়ন এবং উন্নত সমাজ ব্যবস্থার যে প্রমাণ হরপ্পা সভ্যতায় পাওয়া যায় সেই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল তারও কয়েক হাজার বছর আগে এই মেহেরগড় সভ্যতায়। তুলোর চাষ তামা, পোড়ামাটির ব্যবহার প্রশাসনিক কাজের সীলমোহর এর ব্যবহার এটাই প্রমাণ করে যে মেহেরগড়ের গ্রামীণ সভ্যতা ধীরে ধীরে উন্নতি লাভ করে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতায় পর্যবসিত হয়েছিল। পরবর্তী ক্ষেত্রে যার আরো উন্নত রূপ আমরা দেখতে পেয়েছি হরপ্পা সভ্যতায়। মেহেরগড় বাসীরা সাধারণত জীবিকা নির্বাহের জন্য পশুপালন, শিকার, কৃষিকাজ, ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যও শুরু করেছিল।

খনন কার্যের সময় খননস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর মধ্যে পাওয়া গিয়েছে পোড়ামাটির নারী মূর্তি ,তামার পুঁথি, ছুরি, আংটি ইত্যাদি। বিভিন্ন রকম দুষ্প্রাপ্য পাথর এবং মনির ব্যবহার করতেন সে যুগের নারীরা রূপসজ্জার জন্য। শুধু কারিগরি শিল্প নয় প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও উন্নতি সাধন করেছিল এই মেহেরগড় সভ্যতা। পশুর লোম দিয়ে উল এবং কাপড় বুনতে শিখে গিয়েছিল মেহেরগড় বাসী। তবে মিশরীয় সভ্যতার মতন মমি প্রথার নিদর্শন মেহেরগড় সভ্যতায় পাওয়া যায়নি। মেহেরগড় বাসী মৃতদেহ সমাধিস্থ করতেন আর সমাধিস্ত করার সময় মিশরীয়দের মতন মৃত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্র, বহুমূল্য রত্ন মৃতের পাশে রেখে সমাধিস্ত করা হত। অর্থাৎ সে যুগেও তারা বিশ্বাস করতেন মৃতের পুনর্জন্ম। ৭ হাজার খ্রিস্টপূর্বে গড়ে ওঠা এই সভ্যতার পরতে পরতে লেগেছিল বিকাশের ছোঁয়া। এ কথা বলা যেতেই পারে যে মেহেরগড় সভ্যতার আবিষ্কার ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাস শুধু নয় বিশ্বের প্রাচীনতম সভ্যতার ইতিহাসের এক নব দিগন্তের দরজা খুলে দিয়েছে।


More Stories
ভারতরত্ন সম্মান : ইতিহাস ও বিতর্ক
“ইতিহাসের পাতা থেকে” কালজয়ী : সাহিত্যের মণিমুক্তো
স্বামী বিবেকানন্দের মা বীর জননী আখ্যা পেয়েছিলেন, কিন্তু কার জন্য? জানেন কি?