সময় কলকাতা ডেস্ক, ১৫ আগষ্ট : ভারতের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে জড়িয়ে থেকেছেন লক্ষকোটি ভারতবাসী। তাদের মধ্যে আমরা অনেকের নাম জানি অনেকের নাম জানিনা। অসংখ্য মানুষের রক্তের বিনিময়ে এসেছে ভারতের স্বাধীনতা। স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মহতি দিয়েছেন অসংখ্য বীর বিপ্লবী। ৭৭ তম স্বাধীনতা দিবসে বা তারও আগে থেকে একটি প্রশ্ন তবুও সদাজাগ্রত। কে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শহীদ? মঙ্গল পান্ডে নাকি ক্ষুদিরাম বসু? এই দুজনের মধ্যে কে প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদ তা নিয়ে চৰ্চা অব্যাহত। অথচ অনেকেই জানেন না কাগজে কলমে ভারতের প্রথম শহীদ হিসাবে গণ্য করা হয় অন্য আরেক দেশপ্রেমীকে। তাঁর নাম জয়কৃষ্ণ রাজাগুরু মহাপাত্র। ১৮৫৭ সালে মঙ্গলপান্ডের ফাঁসি বা ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরামের ফাঁসির ঢের আগে বুকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আগুন নিয়ে জয়কৃষ্ণ রাজাগুরু মহাপাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের যে প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন তা বহু মানুষের মধ্যে প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আক্রমণ সুসংগঠিত করে ব্রিটিশ শাসকদের কোপানলে পড়েন জয়কৃষ্ণ ও তাঁকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়।কে ছিলেন জয়কৃষ্ণ রাজাগুরু মহাপাত্র? কি এমন বৈপ্লবিক কান্ড ঘটিয়েছিলেন তিনি যার জন্য তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় ?
জয়কৃষ্ণ রাজাগুরু মহাপাত্র ওড়িশার স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে জয়ী রাজাগুরু নামে পরিচিত। ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে পুরীর কাছে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম।তিনি ওডিশা থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করেন অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে, যা চূড়ান্ত আকার নেয় উনবিংশ শতকের প্রথম দশকে ।খুরদা রাজ্যের দরবারে একজন রাজ-পুরোহিত হয়েও তিনি এগিয়ে এসেছিলেন ব্রিটিশদের প্রতিহত করতে। রাজাগুরু রাজার সমর্থনে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ করেছিলেন।ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত প্রদেশকে পুনরুদ্ধার করতে মারাঠাদের সঙ্গে সুকৌশলে একযোগে মরিয়া হয়ে ওঠেন তিনি। একজন মারাঠা বার্তাবাহক সেসময় ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়ে এবং রাজাগুরুর গোপন কৌশলগুলি উন্মোচিত হয়। রাজার দরবার থেকে তাকে অপসারণ করতে ব্যর্থ হলে, একটি ব্রিটিশ বাহিনী খুরদা দুর্গ আক্রমণ করে এবং রাজাগুরুকে বন্দী করে।পরে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ১৮০৬ সালের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখে নৃশংসভাবে মেদিনীপুরের বাঘিটোটায় তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
জয়ী রাজাগুরু পুরোহিত হলেও নিজে সামরিক কৌশল জানতেন এবং স্বয়ং ছিলেন সামরিক বিদ্যায় অভিজ্ঞ।বর্গীদের আক্রমণের সময় গ্রামের পর গ্রাম আতঙ্কিত হয়ে থাকত। দেশপ্রেমিক রাজগুরু বর্গীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একটি পাঁচ দফা কর্মসূচি ( পঞ্চসূত্রী যোজনা ) তৈরি করেন ও গ্রামের যুবকদের সংঘটিত করে তাদের সামরিক অনুশীলন ও অস্ত্র এবং গোলাবারুদ তৈরির প্রশিক্ষণ দেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ তথা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যকলাপ তার কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে যখন বাংলা-বিহার-ওড়িশার বিভিন্ন প্রদেশ গুলি দখল করতে শুরু করে। ১৮০৪ সালে ব্রিটিশরা জোর করে খুরদা দখলের চেষ্টা করে। এতে রাজা জগন্নাথ মন্দিরের ঐতিহ্যগত অধিকারে ব্যর্থ হলে ক্ষিপ্ত হয়ে রাজাগুরুর সুসংগঠিত করা বাহিনী ব্রিটিশদের আক্রমণ করে। শুধু তাই নয়,রাজাগুরু অন্য রাজাদের ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে এককাট্টা করার চেষ্টা করছিলেন। অবশেষে খুরদার সামরিক বাহিনী ও ব্রিটিশদের মধ্যে ঐতিহাসিক লড়াই হয়। প্রথমে রাজগুরু জয়কৃষ্ণ মহাপাত্রকে গ্রেফতার করা হয় ও পরে রাজাকেও গ্রেফতার করে ব্রিটিশ শাসকরা।কারাগার থেকে রাজার দাখিল করা আবেদনের কথা বিবেচনা করে ব্রিটিশ কৌঁসুলিরা রাজা মুকুন্দ দেব-দ্বিতীয়কে মুক্তি দেন এবং তাঁকে পুরীতে পাঠান।
ছাড়া পান নি রাজাগুরু জয়কৃষ্ণ মহাপাত্র। রাজাগুরুর বিচার মেদিনাপুরের বাঘিটোটায় করা হয়েছিল। “দেশের আইনত প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে” যুদ্ধ চালানোর জন্য তাকে দোষী ঘোষণা করা হয়েছিল। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল নির্মমভাবে, গাছের বিপরীতমুখী দুটি ডাল থেকে তাঁর দুটি পা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।নৃশংসভাবে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হলেও থামিয়ে মুছে দেওয়া যায় নি তাঁর দেখা স্বাধীনতার স্বপ্নকে। তাঁর ফাঁসি-পরবর্তী ১৪১ বছরে এই স্বপ্ন সারা ভারত জুড়ে বাস্তব রূপ নেয়। হয়তো কিছুটা তিনি অনুচ্চারিত। তবুও ৬৭ বছর বয়সে দেশমাতৃকার চরণে আত্মাহুতি দেওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শহীদ জয়কৃষ্ণ রাজাগুরু মহাপাত্রের অবদান ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অনস্বীকার্য।।


More Stories
ভারতরত্ন সম্মান : ইতিহাস ও বিতর্ক
“ইতিহাসের পাতা থেকে” কালজয়ী : সাহিত্যের মণিমুক্তো
স্বামী বিবেকানন্দের মা বীর জননী আখ্যা পেয়েছিলেন, কিন্তু কার জন্য? জানেন কি?