Home » রাম, রামমন্দির ও ভারতজোড়ো রাজনীতি

রাম, রামমন্দির ও ভারতজোড়ো রাজনীতি

চুমকী সূত্রধর ও পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা ,২১ জানুয়ারি :  রামকে নিয়ে আলোচনার অন্ত বা শেষ ছিল না কোনওদিন। রামকে পুরুষোত্তমের মর্যাদা  দেওয়া হয়েছিল। তথাপি, চার দশক আগেও রাম ঘরে-বাইরে,খবরের শিরোনামে এভাবে আসেন নি কারণ রাম কোনও এজেন্ডা হয়ে ওঠেননি। রাম ভগবান না মানুষ এনিয়েও সে অর্থে চর্চা হয় নি আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগে। রাম ও রাম মন্দির  প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে চলে আসে  ১৯৮৯ সালে। তার পাঁচ বছর আগে, চার দশক আগে, ১৯৮৪ সালের লোকসভা ভোটে মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল বিজেপি। এরকমই অস্তিত্ব সংকটের মধ্যে  আজ থেকে ৩৫ বছর আগে,হিমাচলপ্রদেশের পালমপুর কনভেনশনে বিজেপি সরাসরি প্রস্তাব নিয়ে আসে অযোধ্যায় রামমন্দির স্থাপনের। অতঃপর সেই প্রস্তাব দেখা যায় নির্বাচনী ইস্তাহারে— ৫০০ বছরের বিতর্কিত জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের কথার ঘোষণার প্রাথমিক রূপরেখা সেসময় জনসমক্ষে আসে। সে বছরও ছিল লোকসভা নির্বাচন। ২০২৪ ও আরেকটি লোকসভা নির্বাচনের বছর। ৩৫ বছর পরে, রাজনৈতিক বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে, রাম ও রামমন্দির যেন হয়ে উঠেছে ভারতজোড়ো করার গৈরিক ভাবনা।

অযোধ্যায় রাম মন্দিরের উদ্বোধনের আগে দু-দিনের দক্ষিণ ভারত সফরে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মূলত, একগুচ্ছ সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধন করতে কেরল ও তামিলনাড়ু সফরে যান প্রধানমন্ত্রী। তবে সরকারি প্রকল্প উদ্বোধনের ফাঁকে তামিলনাড়ুতে একাধিক মন্দির পরিভ্রমণ করেন তিনি। মূলত, রামায়ণের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে এমন মন্দিরগুলি পরিভ্রমণ করেন মোদি। দক্ষিণে থেকে বিভিন্ন মন্দির ভ্রমণ, নানান আচার পালন। কিন্তু, কেন রাম মন্দির উদ্বোধনের আগে দক্ষিণী রাজ্যগুলোর মন্দিরকেই বেছে নিলেন মোদি? মোদি আসলে রাম মন্দির উদ্বোধনের মাধ্যমে উত্তর-দক্ষিণের মেলবন্ধন তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।

খুব তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, অযোধ্যায় দক্ষিণের পূণ্যার্থীদের সুবিধার্থে এই প্রথম নবসাজে সজ্জিত বড় রাস্তাগুলিতে দক্ষিণ ভারতের সব ভাষাতেই লেখা হয়েছে পথ ও এলাকার নাম। শুধু কি তাই? প্রধানমন্ত্রী মোদি নতুন রাম মন্দিরে যে নতুন মূর্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে চলেছেন সেটি কালো পাথর কেটে তৈরি। উত্তর ভারতের মন্দিরে শিবলিঙ্গ বাদে অন্য দেবতাদের মূর্তি সাদা পাথরেরই বেশি। তবে, ব্যাখ্যা মিলেছে যে শ্রীরামচন্দ্র যেহেতু বিষ্ণুর অবতার, তাই কালো পাথরের ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যার পাশাপাশি বলা চলে, এর সঙ্গে জুড়েছে মূর্তির দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতি । দক্ষিণ ভারতে দেবদেবীর মূর্তিতে কালো পাথরের ব্যবহার বেশি। আর প্রাণ প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি তিনটি মূর্তি থেকে শেষ পর্যন্ত যেটি গর্ভগৃহে বসেছে সেটির নির্মাণ শিল্পী খ্যাতনামা ভাস্কর অরুণ যোগীরাজ কর্নাটকের বাসিন্দা। খুব সুক্ষভাবে দেখলে বোঝা যাবে, উত্তর ভারতে মোদির আধিপত্য বিস্তার ভালোভাবে হলেও দক্ষিণ সেভাবে বাগে আনতে পারেননি নরেন্দ্র মোদি। সম্প্রতি ভোট ফলাফল আরও খানিকটা হতাশ করেছে মোদিকে। ২০২৪-এই তিনি রাম জড়ে দাক্ষিণাত্য বিজয়ের লক্ষ্যপূরণ করতে চান। তালিকায় উপরের দিকে আছে তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু, কেরল। কর্নাটকে আগে থেকেই বিজেপি ভাল অবস্থায় আছে। শুধু রাজ্য সফরই নয়, দক্ষিণের মন জয়ে কাশী-তামিল সঙ্গম অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দক্ষিণী শার্ট-লুঙ্গি পরে অংশ নিয়েছেন। গায়ে জড়িয়েছিলেন দক্ষিণী অঙ্গবস্ত্রও। সেই অনুষ্ঠান চলাকালে বারাণসীর সর্বত্র শোভা পেয়েছে ‘বনাক্কাম কাশী’, তামিল ভাষায় যার অর্থ ‘কাশীতে স্বাগত’ লেখা পোস্টার-ব্যানার। সূত্রের দাবি, গত পাঁচ বছরে দক্ষিণের রাজ্য সফরে মোদী রেকর্ড করেছেন। প্রাক্তন দুই দক্ষিণী প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও, দেবগৌড়াও এতবার দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে যাননি যতবার মোদী গিয়েছেন। গত মাসে অযোধ্যায় বিমান বন্দর উদ্বোধন করতে এসে চালু করে গিয়েছেন অযোধ্যার সঙ্গে দক্ষিণের একাধিক শহরের সংযোগকারী বন্দে ভারত এক্সপ্রেস।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু দক্ষিণ ভারত বিজয় নয়, রাম মন্দিরকে ঘিরে মোদির ভোটের ভারত-জোড়ো অভিযানে আছে উত্তর ভারতের জাতের অঙ্কও। নতুন মন্দির পরিসরে বসে নিষাদ রাজা গুহ’র মূর্তি। রামায়ণের বর্ণনা অনুযায়ী যিনি রাম ও সীতাকে বনবাস যাত্রায় শ্রিংভেরাপুরার কাছে গঙ্গা পার হয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন। নিষাদ সম্প্রদায়ের প্রধান পেশা মৎস্য নির্ভর । আজকের ভারতে তারা অন্যান্য অনুন্নত শ্রেণি বা ওবিসি ভুক্ত জাতি, উত্তর প্রদেশ-সহ উত্তর ও পূর্ব ভারতে ভোট বৈতরণী পার হতে এই জেলে সম্প্রদায়ের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাজনীতির অঙ্ক আছে অযোধ্যায় সদ্য চালু হওয়া বিমানবন্দরের নামকরণেও। মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত ছিল নাম হবে রাম আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। আচমকাই নাম বদলে রাখা হয়েছে রামায়ণের রচয়িতা আদি কবি মহর্ষি বাল্মীকের নামে, উত্তর ভারতে একই সঙ্গে যাঁর দলিত-পুরুষ পরিচয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে আসছে। কংগ্রেস-সহ ইন্ডিয়া জোটের অধিকাংশ পার্টি যখন কাস্ট সেন্সাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজেপিকে জাতের অঙ্কে ঘায়েল করার কৌশল নিয়েছে তখন মোদি হাতিয়ার করছেন রাম মন্দির উদ্বোধন ঘিরে নানা সরকারি পদক্ষেপকে। তাই, বলা যায়, শুধু দক্ষিণ নয়, উত্তর-দক্ষিণ এক করে ভারত জোড়োয় নেমেছেন নরেন্দ্র মোদি। “রাম রতন ধন ” প্রাপ্তিযোগের সমীকরণ যে নইলে মিলবে না!

About Post Author