সময় কলকাতা ডেস্ক, ১৯ মে: তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভোটের উত্তাপ। অষ্টাদশ লোকসভা ভোটের চার দফা ইতিমধ্যে সমাপ্ত। এখনও বাকি রয়েছে তিন দফা। আগামী ২০ মে লোকসভা নির্বাচনের পঞ্চম দফা। দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট ৪৯ টি কেন্দ্রে রয়েছে ভোট। রাজ্যের ৩ টি জেলার ৭ টি কেন্দ্রও রয়েছে তারমধ্যে। যার মধ্যে অন্যতম শ্রীরামপুর। হুগলি জেলার পাঁচটি ও হাওড়া জেলার ৩ টি বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে এই লোকসভা ক্ষেত্রটি গঠিত। এর মধ্যে রয়েছে – উত্তরপাড়া, জগৎবল্লভপুর, ডোমজুড়, শ্রীরামপুর, চাঁপদানি, চণ্ডিতলা এবং জাঙ্গিপাড়া। রাজ্যের মানচিত্রে অবস্থিত এই কেন্দ্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে এই কেন্দ্র ছিল ডেনিশদের অধীনে। তখন এর নাম ছিল ফ্রেডরিক্সনগর নগর।

স্বাধীনতার আগে থেকে এই অঞ্চলে অসংখ্য ছোট বড় মাঝারি মানের শিল্প গড়ে উঠেছিল। দেশ তথা রাজ্যের প্রথম ও দ্বিতীয় পাটকল যথাক্রমে ওয়েলিংটন ও ইন্ডিয়া পাটকল এখানেই স্থাপিত হয়েছিল। হাজার হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে চিত্রটা। বিগত বছরগুলিতে বিভিন্ন কারণে তালা ঝুলছে একের পর এক চটকলে। বর্তমানে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা কিছু কারখানা ও চাষবাস এখানকার মানুষের প্রধান উপজীব্য। শিক্ষার দিক থেকেও এই অঞ্চলটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এশিয়ার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় শ্রীরামপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের দ্বিতীয় কলেজ শ্রীরামপুর কলেজ ও দেশের প্রথম গ্রন্থাগার উইলিয়ামস কেরি লাইব্রেরিও এখানেই স্থাপন করা হয়েছিল। পাশাপাশি, ফুরফুরা শরীফ ও পুরীর আদলে তৈরি জগন্নাথ মন্দিরও এই কেন্দ্রের অন্তর্গত। ধর্ম, শিল্প ও শিক্ষার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র শ্রীরামপুরে জোরকদমে বইছে ভোটের হাওয়া।
এই কেন্দ্রে রাজ্যের শাসক দলের টিকিটে লড়ছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পেশায় আইনজীবী কল্যাণ এই কেন্দ্র থেকে গত তিনবার জয়ী হয়েছেন। স্বাধীনতার পর থেকে শ্রীরামপুরের ভোটাররা একাধিকবার দল বদল করেছে। কখনও বামপন্থীরা ক্ষমতায় এসেছে বা কখনও ক্ষমতা দখল করেছে কংগ্রেস। টানা তিনবার এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন সিপিএমের দীপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। জয়ের হ্যাটট্রিকের রেকর্ড গত নির্বাচনেই ছুঁয়েছেন কল্যাণ। ২০০৯ সালে সিপিএমের থেকে আসনটি দখল করে তৃণমূল। সিপিএম প্রার্থী শান্তশ্রী চট্টোপাধ্যায়কে প্রায় ১ লক্ষ ৩৭ হাজার ভোটে পরাস্ত করেন কল্যাণ। ২০১৪ সালেও ভোট বাক্সে বড় ধস নামলেও শেষ পর্যন্ত জয়ী হন তিনি। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিএমের তীর্থঙ্কর রায়কে ১ লক্ষ ৫২ হাজারের বেশি ভোটে পরাস্ত করেন। বামেদের শক্তি বেশ কিছুটা ক্ষয় হয়। তিন নম্বরে শেষ করলেও বিজেপির ভোটের হার বৃদ্ধি পায় প্রায় ১৮ শতাংশ। প্রায় ২ লক্ষ ৮৭ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন কিংবদন্তি গায়ক ও সুরকার বাপি লাহিড়ী। ২০১৯ সালেও এই কেন্দ্রটি ধরে রাখেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থী দেবজিত সরকারকে সাড়ে ৯৮ হাজারের কিছুটা বেশি ব্যবধানে পরাস্ত করেন। ভোটের হার প্রায় ১৭ শতাংশ কমে সিপিএম শেষ করে তৃতীয় স্থানে। এই বারও আদি-পন্থী নেতা কল্যাণের উপর আস্থা রেখেছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার বিপক্ষে শ্রীরামপুর আসন থেকে লড়ছেন কংগ্রেস সমর্থিত সিপিএম প্রার্থী দীপ্সিতা ধর ও বিজেপির টিকিটে লড়ছেন কবীর শঙ্কর বসু। যিনি আবার তৃণমূল প্রার্থীর প্রাক্তন জামাই। সংযুক্ত মোর্চার জোট ভেস্তে যাওয়ায় এই কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়েছে আইএসএফও। খাম চিহ্নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন শাহরিয়ার মল্লিক।
আরও পড়ুন: লকেটকে হারিয়ে ইতিহাস রচনা কি সম্ভব?
বঙ্গ রাজনীতির বর্ণময় চরিত্রগুলির মধ্যে নিঃসন্দেহে অন্যতম কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই লোকসভা কেন্দ্রটি প্রচারের সামনের সারিতে উঠে আসার অন্যতম কারণও তিনি। একটা সময় দলের অভ্যন্তরে নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রবীণদের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন হাইকোর্টের দুঁদে আইনজীবী। শোনা যায়, এই লোকসভা নির্বাচনে কল্যাণের পরিবর্তে শ্রীরামপুর থেকে নতুন মুখকে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন তৃণমূলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইচ্ছেতেই চতুর্থবারের জন্য টিকিট পেয়েছেন কল্যাণ। চতুর্থ বারের জন্য টিকিট পাওয়ার পর থেকে স্ব-মহিমায় ফিরেছেন কল্যাণ। কখনও প্রতিপক্ষ সিপিএম প্রার্থী দীপ্সিতাকে ‘মিস ইউনিভার্স’ এবং ‘সোফিয়া লোরেন” বলে কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়েছেন। আবার কখনও কল্যাণ বাণে বিদ্ধ হতে দেখা গিয়েছে প্রাক্তন জামাইকে। সেই সঙ্গে গতবারের তুলনায় জয়ের ব্যবধান দেড় লাখের বেশি হবে বলেও আশাবাদী শ্রীরামপুরের বিদায়ী সাংসদ।
যদিও বিদায়ী সাংসদের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। পাশাপাশি, শিল্প ও কারখানাগুলির বেহাল দশার পিছনে সাংসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দুই বিরোধী প্রার্থী। তবে বর্ষীয়ান নেতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দুই দলের প্রার্থী অপেক্ষাকৃত তরুণ। একদিকে বিজেপির কবীর শঙ্কর বসু ও অন্যদিকে কংগ্রেসের সমর্থনে সিপিএম প্রার্থী দীপ্সিতা ধর। গত তিনটি লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্রে ভোটের হার বাড়িয়েছে বিজেপি। কিন্তু এই লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির সংগঠন মজবুত নয়। প্রার্থী কবির শঙ্কর বসুকে নিয়েও দলের নিচুতলায় অসন্তোষ রয়েছে। কারণ নির্বাচনের সময় ছাড়া তাঁর দেখা পাওয়া যায় না। নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থেকে তিনি ঘোরাফেরা করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে দেশে বিজেপির হাওয়া ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত করিশ্মাকে পুঁজি করে প্রাক্তন শ্বশুরকে শ্রীরামপুরের প্রাক্তন সাংসদ করার ব্যাপারে আশাবাদী বিজেপি প্রার্থী।
রাজনীতির জগতে কবির শঙ্কর বসু নতুন নাম। তার এখনও পরিচিতি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাক্তন জামাই হিসাবে। তাই অনেকেই মনে করছেন এই কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীর মূল প্রতিপক্ষ জোট প্রার্থী দীপ্সিতা। কারণ এই অঞ্চলে সিপিএমের সক্রিয় সংগঠন রয়েছে। পাশাপাশি, টিকিট পাওয়ার পর নিজের নির্বাচনী এলাকা চষে ফেলছেন বাম নেত্রী। পৌঁছে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষের হেঁসেলে। কথা বলছেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। তার প্রচারে তরুণ যুবক-যুবতীদের উপস্থিতি থাকছে চোখে পড়ার মত। আসলে রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে দীপ্সিতা। তাঁর দাদু পদ্মনিধি ধর ছিলেন সিপিএমের তিন বারের বিধায়ক। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় চুটিয়ে রাজনীতি করেছেন। বাংলা, ইংরেজি ও হিন্দি তিন ভাষাতেই সমান সাবলীল বাম নেত্রী। শ্রীরামপুরের মোট ভোটারের প্রায় ২৫ শতাংশ হিন্দিভাষী। তাদের কাছেও নিজের দলের বক্তব্য তুলে ধরতে পারছেন তিনি।
তবে বাম প্রার্থীর জন্য এই কেন্দ্রের লড়াই কঠিন করে দিয়েছে আইএসএফ। সংযুক্ত মোর্চার জোট ভেস্তে যাওয়ায় এই কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়েছে নওশাদ সিদ্দিকীর দল। শাহরিয়ার মল্লিককে প্রার্থী করেছে তারা। এই কেন্দ্রে একটা বড় অংশে সংখ্যালঘু মানুষের বাস। বিশেষ করে জগৎবল্লভপুর এবং ডোমজুড় বিধানসভায়। এছাড়াও এই কেন্দ্রের রাজনীতি অনেকটা জাঙ্গিপাড়ার ফুরফুরা শরীফকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। গত লোকসভা নির্বাচনে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় বড় ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন তৃণমূল প্রার্থী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ভোটব্যাঙ্ক এবার তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলে, লড়াই আরও হাড্ডাহাড্ডি হবে বলে মত রাজনৈতিক মহলের।


More Stories
কেন ফুল বদলালেন লিয়েন্ডার পেজ?
বারাসাতে মিছিল কি তৃণমূলের শেষের শুরুর ইঙ্গিত ?
বোমা-বন্দুক আনব, তৃণমূল নেতাদের গণপিটুনির হুঙ্কার দিলীপ ঘোষের