Home » আরামবাগে আরামে নেই তৃণমূল

আরামবাগে আরামে নেই তৃণমূল

পুরন্দর চক্রবর্তী ও চুমকী সুত্রধর,সময় কলকাতা,১৯ মে: 2024 Lok Sabha Elections শিয়রে ভোট। আরামবাগে ভোট পঞ্চম দফায়।আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্রের চিত্রটা একটু জটিল। ছটি বিধানসভা কেন্দ্র হুগলিতে আর একটি পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায়। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা বিধানসভা অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে হুগলি জেলার বাকি ছটি বিধানসভা কেন্দ্রের চেয়ে আলাদা হলেও একটি মিল রয়েছে।এই বিধানসভা কেন্দ্রে বামেদের আর আগের মত প্রভাব নেই। শেষ দুটি বিধানসভা ভোটেই তৃণমূল কর্তৃত্ব দেখালেও বিজেপি শক্তি বাড়িয়েছে এখানে। বামেদের ভোট সম্পূর্ণ ক্ষয়প্রাপ্ত হয় ২০২১ সালে। বাম প্রার্থী এখানে লড়েন নি। সংযুক্ত মোর্চার আইএসএফ প্রার্থীও এখানে সামান্যতম দাগ কাটতে পারেন নি। তবে এবারের চিত্র অন্য।বাম প্রার্থী হিসেবে বিপ্লব কুমার মৈত্র বাম ভোট কিছুটা ফেরাতে যে চলেছেন, তার হালকা ইঙ্গিত ধরা পড়েছে। অন্তত দশ হাজার ভোট যা আইএসএফ পেয়েছিল চন্দ্রকোনা বিধানসভা নির্বাচনে, তারচেয়ে ফল বামেদের ভালো হবেই তা কিছুটা নিশ্চিত। বাম শক্তি বাড়লে ক্ষতি কার হবে? বাম ভোট বাড়লে তৃণমূলের লাভ বঙ্গে এমনটাই এবারের লোকসভা নির্বাচনে সাধারণ ধারণা তৈরি হয়েছে। বাম ভোট ফ্যাক্টর হয়ে তৃণমূলের লাভ যদি হয় তাহলেও কেন বলা হচ্ছে আরামবাগে আরামে নেই তৃণমূল?

বনগাঁ কেন্দ্রে শান্তনুর গলার কাঁটা সুমিতা পোদ্দার, বিশ্বজিত কি বাজিমাত করবেন?

বাম ভোট সমীকরণ আরামবাগে বহুমুখী। আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্রের ভোটে কে জিততে চলেছে, তার সঙ্গে বামেদের ভোট ফ্যাক্টরের অনেকটাই মিল রয়েছে। আবার মিল নেই। কারণ তৃণমূলের শক্তি ও জনভিত্তি এই লোকসভা কেন্দ্রের অধিকাংশ বিধানসভা কেন্দ্রে অন্তর্হিত। হরিপাল, তারকেশ্বর ও চন্দ্রোকনা ছাড়া কোথাও ২০২১ সালের নির্বাচনে সুবিধে করতে পারে নি তৃণমূল। আরামবাগে তৃণমূলের সুজাতা মণ্ডলের মত হেভিওয়েট প্রার্থীও হেরে যান। আরামবাগ বিধানসভা কেন্দ্রে ৩৮ শতাংশ ভোট বাড়ায় বিজেপি। ৩০ শতাংশ ভোট কমে বামেদের। একই চিত্র গোঘাট, খানাকুল, পুরসুড়াতেও। সর্বত্র গৈরিক উত্থান ঘটেছে। এতটাই বিজেপির উত্থান ঘটেছে যা প্রাথমিকভাবে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটেও ধরা পড়ে। সামান্যর জন্য অপরূপা পোদ্দারের কাছে হেরে গেলেও ৩২ শতাংশের বেশি ভোট বাড়ান বিজেপির প্রার্থী তপন কুমার রায়। বামেদের ভোট কমে ২২ শতাংশ। ১০ শতাংশ ভোট কমে তৃণমূলের।অর্থাৎ সার্বিকভাবেই ভোটারদের বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ার ছবি লক্ষ্য করা যায়। এখানেই প্রশ্ন উঠছে বাম ভোট ফ্যাক্টর নিয়ে।

অনিল বসুর আমলে এখানে বাম ভোট যেমন একচেটিয়া ভাবে পড়ত, তেমনই ছিল এলাকা জুড়ে সন্ত্রাসের ছবি। খানাকুল, গোঘাট রক্তাক্ত হয়েছে বারবার। গত এক দশকে আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বিভিন্ন বিধানসভা অঞ্চলগুলিতে শান্তি ফিরেছে। বামেদের প্রতি এখনও বিতৃষ্ণা রয়েছে বেশ কিছু অঞ্চলে। ফলে সিপিএমের ভোট গতবারের থেকে কিছুটা বাড়লেও হয়তো বাড়তে পারে কিন্তু সার্বিকভাবে শান্তি প্রত্যাশী মানুষ যে এই অঞ্চলে সিপিএমকে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হবেন না, তা এলাকার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরলেই মালুম হয়। আর এখানেই সাফল্যের চাবিকাঠি বাঁধা ছিল তৃণমূলের কাছে। ইকবাল আহমেদের মৃত্যুর পরে খানাকুল, পুরশুড়ার নিয়ন্ত্রণ চলে গিয়েছে তৃণমূলের হাত থেকে। অন্যদিকে, চন্দ্রকোনা বা তারকেশ্বরে তৃণমূল এখনও শক্তি অক্ষত রেখেছে। তবে আরামবাগ বা গোঘাটে বিজেপির শক্তি বাড়লেও ভোটের পরে আবার অশান্তির আবহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ভোট পূর্ববর্তী প্রচারে সন্ত্রাসের ছবি লক্ষ্য করা গিয়েছে। শান্তি প্রত্যাশী মানুষ সেজন্য কিছুটা হলেও শাসকদলের দিকে ঝুঁকতে পারেন মনে করা হলেও এই দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি কিন্তু শক্ত নয়। খালি হরিপালে ভোট বাড়িয়ে এই লোকসভা কেন্দ্র ধরে রাখাও সম্ভব নয়। কারণ আরামবাগ লোকসভার শুধু একটি বা দুটি বিধানসভা কেন্দ্রে নয়, এলাকার বিভিন্ন অংশে, বিভিন্ন ভাবে মানুষের ক্ষোভ রয়েছে দুবারের সাংসদ হিসেবে অপরূপা পোদ্দারকে নিয়েও। আরামবাগে আরামে নেই তৃণমূল যে কয়েকটি কারণ তাঁর একটি কারণ তিনি।

পার্থ – অর্জুনের যুদ্ধে কোথায় কে এগিয়ে, কোথায় কে পিছিয়ে?

দলের মধ্যে ক্ষোভ, এলাকার উন্নয়ন না করা, দুর্নীতি প্রসঙ্গে বারবার অপরূপার নাম সামনে এসে পড়া ,এলাকায় তৃণমূলের এবং ব্যক্তিগতভাবে তাঁর হারিয়ে যাওয়া জনসমর্থন ফিরে পেতে জনসংযোগ নতুন করে গড়ার চেষ্টা না করা – অনেক কিছুই কাজ করেছে অপরূপা পোদ্দার ওরফে আফরিন আলির বিরুদ্ধে। জেলা নেতৃত্ব তাঁকে এবার প্রার্থী হিসেবে চায় নি, দল তাঁকে টিকিটও দেয়নি। দল এবার প্রার্থী করেছে মিতালি বাগকে। তৃণমূল স্তর থেকে রাজনীতি করে উঠে আসা তথাকথিত সমাজের আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের প্রতিনিধি মিতালি সততার প্রশ্নেও দরাজ সার্টিফিকেট পেয়ে যান উচ্চ নেতৃত্বর কাছে । টিকিট না পেয়ে অপরূপা সরব হয়েছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু মুশকিল হল,প্রার্থী বদলেও কতটা তা লাভ হবে, নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে যার প্রতিফলন ঘটতে চলেছে পঞ্চম দফার ভোটে। তৃণমূলের তথা মুখ্যমন্ত্রীর সাধের প্রকল্পগুলিও কতটা মিতালী বাগকে জেতাতে সাহায্য করবে তা নিয়েও প্রশ্ন। বঙ্গের ৪২ টি আসনের সবকটির দিকে চোখ রেখে মুখ্যমন্ত্রীর প্রচার করেছেন বা করছেন। বলা হচ্ছে, সবচেয়ে কম সাড়া পেয়েছেন তিনি আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্রে। তাঁকে বিজেপির বেড়ে চলা ভোটের দিকে তাকিয়ে এবং তৃণমূলের প্রতি জনতার ক্ষোভের দিকে তাকিয়ে বলতে হয়েছে – বিজেপি ক্ষমতায় এলে মন্দিরে মন্দিরে অশান্তি হতে পারে। তাঁকে বলতে হয়েছে, তৃণমূল দোষ করলে চড় মারার অধিকার রয়েছে। বিপক্ষের জুজু দেখিয়ে বা শুদ্ধিকরণের কথা বলেও কাজ খুব একটা হচ্ছে না। মুখ্যমন্ত্রীর সভাতে লোক না হওয়া অশনি সংকেত শুধু নয়, বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন যা বিগত ২০১৯ সালের ভোটের আগের থেকেই ধরা পড়ছিল। অপরূপা পোদ্দার জিতেছিলেন মাত্র ১১৪২ ভোটে। ২০২১ সালেও এই লোকসভা কেন্দ্রে প্রায় ষাট হাজার ভোটে পিছিয়ে থেকেছে তৃণমূল। নতুন মুখ তবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মী মিতালি বাগকে এনেও হালে পানি পাওয়া তৃণমূলের পক্ষে বেশ দুস্কর। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৪২ টির মধ্যে ২২ টি কেন্দ্রে জিতেছিল তৃণমূল। বিভিন্ন সমীকরণ থেকে এবার যে কেন্দ্রটি প্রায় নিশ্চিতভাবে তৃণমূলের হাতছাড়া হওয়ার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম আরামবাগ। বিজেপি প্রার্থী অরূপ কান্তি দিগার তাই খোশ মেজাজে রয়েছেন। গোঘাটের বাসিন্দা স্কুল শিক্ষক গাণিতিকভাবে অবশ্যই এগিয়ে আছেন, বাম ভোট ফ্যাক্টর তাঁর অঙ্কে বিশেষ হেরফের ঘটাবে বলেও খুব আশঙ্কা বিজেপির নেই। জয়ের গন্ধ পেয়েছে বিজেপি। নরেন্দ্র মোদি এই লোকসভা কেন্দ্রে সভা করেছেন, বিজেপির স্বপ্ন এবং পাখির চোখ রয়েছে আরামবাগে। অন্যদিকে, তৃণমূল কর্মী সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা হলেও উদাসীনতা এবং এককাট্টা না হওয়ার ছবি। তাঁরা একজোট হয়ে কাজ করলে বিজেপির সমস্যা বাড়ত, জেতার বিষয়ে বিজেপির স্বপ্ন সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কষ্টকর হয়ে উঠত। তাও হয় নি। লক্ষীর ভান্ডার বা অপরূপার প্রস্থান কতটা কাজ করবে বলা মুশকিল, তবুও লড়াই জোরদার । বিজেপি এই কেন্দ্রে এগিয়ে থাকলেও আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপি – তৃণমূলের জোর লড়াই হবে এ নিয়ে সন্দেহ নেই।।

# আরামবাগে আরামে নেই তৃণমূল

লকেটকে হারিয়ে ইতিহাস রচনা কি সম্ভব?

About Post Author