Home » জয়নগরে প্রতিমার জয় কি রুখতে পারবেন অশোক?

জয়নগরে প্রতিমার জয় কি রুখতে পারবেন অশোক?

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা,২৮ মে : ভোট বড় বালাই। নির্বাচনের দামামা বাজলেই  জয়নগরের প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে নদী বাঁধ। স্বাভাবিকভাবেই,২০২৪ সালের জয়নগর লোকসভা কেন্দ্রের ভোটে নদীবাঁধ নিয়ে প্রতিশ্রুতির বহর বাড়াতে হচ্ছে আর অজুহাতকে জোরালো করতে হচ্ছে শাসক দল ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের। ভোটের সময় প্রতিবারই থাকে কালবৈশাখীর ভ্রূকুটি। তারসাথে এবছর যোগ হয়েছে ঘূর্ণিঝড় রেমাল। সবমিলিয়ে উপকূলবাসী তথা জয়নগর নদীর বিক্ষুব্ধ জল রাশির মতই ফুসছেন। তাই প্রতিযোগিতার বহর বাড়ছে প্রতিশ্রুতিতে। শাসক দলকে তীব্রতর করতে হচ্ছে অজুহাত ও অঙ্গীকার। কি আছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং তৃণমূলের বক্তব্যই বা কী? জয়নগরে প্রতিমার জয় রুখতে পারবে কি বিপক্ষের রাজনৈতিক শক্তি গুলি? বিজেপির সম্ভাবনাই বা কতটা? জয়নগর লোকসভা কেন্দ্র নিয়ে বিস্তারিত  আলোচনার আগে একটু চোখ রাখা যাক নদীবাঁধ সম্পর্কিত তৃণমূলের বিপক্ষে অভাব -অভিযোগে।

আয়লা, ফনি, ইয়াস, আম্ফান। ঝড় আসে ঝড় যায়। গৃহহারা হন উপকূলবাসীরা। সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি আকাশ ছুঁয়ে যায়। জমি-জায়গা নদী গর্ভে বিলীন হওয়ায় অনেককে নদীর পাড়ে বসবাস করতে হয়। ২০০৯ সালে আয়লার পরে সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকায় কংক্রিট  নদীবাঁধ নির্মাণ করার জন্য কেন্দ্র থেকে পাঁচ হাজার বত্রিশ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল (৫০৩২ কোটি টাকা ) বাম আমলে, ২০১০ থেকে কাজও শুরু হয়েছিল। কিন্তু  কাজ বিশেষ এগোয় নি, বামেরা সেভাবে সময়ও পায় নি। বামেরা ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ার পরে  তৃণমূল  জমি অধিগ্রহণ করে আবার কাজও শুরু করেছিল । কিন্তু কাজ থমকে যায়।তৃণমূলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মাত্র ১০০০ কোটি টাকার কাজ হওয়ার পরে কাজ না হওয়ায় কেন্দ্রীয় টাকা ফিরে চলে যায়। অভিযোগ আজও রয়ে গিয়েছে তৃণমূলের নদী বাঁধ তৈরিতে  উদাসীনতার বিরুদ্ধে। তৃণমূল অবশ্য এসব অভিযোগে বিশেষ কান দিতে নারাজ। তারা এখন দুষছে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে টাকা বন্ধ হয়ে যাওয়া। জেলা পরিষদের উপাধ্যক্ষ  অনিমেষ মন্ডলের কথায়,”কেন্দ্র একশো দিনের কাজের টাকা বন্ধ করে দেওয়ায় সুন্দরবনের নদীবাঁধের কাজ কিছুটা হলেও থমকে গিয়েছে। পঞ্চায়েতগুলি একশো দিনের কাজের টাকায় বাঁধের সংস্কারের কাজ করে থাকে। টাকা বন্ধ হওয়ায়  বাঁধের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ” এই যুক্তি মানতে নারাজ বিরোধীরা। দক্ষিণ ২৪ পরগনার একদা দাপুটে বাম নেতা ও প্রাক্তন সেচমন্ত্রী সুভাষ নস্কর অভিযোগ করেছেন,“তৃণমূল সরকারের উদাসীনতার ফলেই আজও ভুগতে হচ্ছে সুন্দরবনের মানুষকে। অনেক চেষ্টা করে কেন্দ্রের তরফ থেকে টাকা জোগাড় করেছিলাম। কিন্তু তৃণমূল কাজই করে নি। ” ২০২৪ লোকসভা ভোটে জয়নগর লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির প্রার্থী অশোক কান্ডারি বলেছেন, ভোটে জিতে সুন্দরবনের কংক্রিটের নদী বাঁধ তৈরি করা তাঁর প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য। তবে তিনি ভোটে জিতলে তবে তো! তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, জয়নগর লোকসভা কেন্দ্রের  দুবারের সাংসদ তৃণমূলের প্রতিমা মন্ডল এবারও জয়ের বিষয়ে এককদম এগিয়ে রয়েছেন অন্তত হাওয়া তাই বলছে। তৃণমূল প্রার্থী প্রতিমা মন্ডল জয়ের বিষয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসী।

২০১৯ সালে জয়নগর লোকসভা কেন্দ্রে  প্রতিমা মন্ডল বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটে বনগাঁর প্রাক্তন সাংসদ গোবিন্দ নস্করের কন্যা প্রতিমা মন্ডল প্রথমবার তৃণমূলের টিকিটে হারিয়ে দিয়েছিলেন প্রাক্তন সেচমন্ত্রী আরএসপির সুভাষ নস্করকে। সুভাষ নস্কর বাসন্তী বিধানসভা কেন্দ্রে ১৯৮২  থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জয়ী হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রাক্তন আমলা প্রতিমা মন্ডল তাঁকে হারিয়ে সাংসদ হন।  ব্যবধান ছিল এক লক্ষ আট হাজারের এবং সেবার তৃতীয় হয়েছিলেন ২০০৯ সালে এই কেন্দ্রে তৃণমূল সমর্থিত এসইউসিআই দলের সাংসদ তরুণ মন্ডল।  তরুণ মন্ডল ২০০৯ সালে জয়নগর কেন্দ্রে  ১৯৮০ সালের লোকসভা ভোট থেকে চলে আসা আরএসপির আধিপত্য প্রথম ধ্বংস করেন। ২০১৯ সালে প্রথমবারের মত  আরএসপি তৃতীয় স্থানে চলে যায়। এই কেন্দ্রে তৃণমূলের  প্রধান বিপক্ষ শক্তি হয়ে ওঠে  বিজেপি। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপির  হয়ে অশোক কান্ডারী ২৩ শতাংশের চেয়েও বেশি ভোট বাড়ালেও প্রতিমা মন্ডল ৩ লক্ষ ১৭ হাজার ভোটে হারিয়ে দেন তাঁকে। এবার প্রতিমা মন্ডলের প্রধান প্রতিপক্ষ যে অশোক কান্ডারী তা প্রচার এবং ভোটের হাওয়া থেকে পরিষ্কার। বঙ্গের লোকসভা ভোটের চালচিত্রে অধিকাংশ জায়গার মত এখানেও মূল লড়াই তৃণমূল বিজেপির।

জয়নগর কেন্দ্রে ভোটের আসরে রয়েছে আরও  তিনটি শক্তিশালী রাজনৈতিক  দল যদিও তারা জয়নগরে কতটা এঁটে উঠতে পারবে বলা মুশকিল ।তবে এরা লোকসভা ভোটে ফ্যাক্টর তো অবশ্যই।আরএসপির প্রার্থী সমরেন্দ্রনাথ মন্ডল। তবে বামেদের সেদিন আর নেই।  কারণ দাপট বেড়েছে “সাধারণ জনতার”।একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। জয়নগর কেন্দ্রের লোকসভা ভোটের প্রচারে,  কুলতলি বিধানসভার ঘটিহারানিয়া বাজার এলাকায় সমরেন্দ্রনাথ মন্ডলের সমর্থনে আয়োজিত একটি পথসভা শেষ হতেই হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। জানা যায়, বাম প্রার্থীর সমর্থনে মঞ্চে বক্তব্য রাখছিলেন সিপিএম-এর জেলা কমিটির সদস্য তথা জেলা ডিওয়াইএফআই-এর সম্পাদক অপূর্ব প্রামাণিক। মঞ্চ থেকে নামতেই শুরু হয় বেধড়ক মারধর। তৃণমূলের পক্ষ থেকে বলা হয়, পথসভায়  তৃণমূলকে চোর বলাতেই ‘ সাধারণ জনতা’ বামেদের মারধর করে । এই ” সাধারণ জনতা ‘ জয়নগর কেন্দ্র জুড়ে অত্যন্ত সক্রিয়।

বিজেপি ও বাম ছাড়াও ভোট টানতে পারে এসইউসিআই ও আইএসএফ।এসইউসিআই দলের  প্রার্থী নিরঞ্জন নস্কর। অন্যদিকে,আইএসএফের প্রার্থী মেঘনাথ হালদার।আইএসএফ আসরে থাকলেও জয়নগর কেন্দ্রে তারা হীনবল, একমাত্র ক্যানিং পূর্ব কেন্দ্রে তাদের কিছুটা প্রভাব রয়েছে ।  জয়নগর কেন্দ্রে সংখ্যালঘু ভোট রয়েছে ৩৬ শতাংশ তবুও সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলেরও অন্যতম প্রধান ভোটব্যাঙ্ক এবং জয়নগর এবং ক্যানিং পূর্ব জুড়ে উল্লেখযোগ্য ভাবেই  রয়েছেন সওকত মোল্লা। তিনি ক্যানিং পূর্ব কেন্দ্রের বিধায়ক এবং এই বিধানসভা এলাকা থেকেই তৃণমূল  বড় লিড আনতে চলেছে। সৌজন্যে সওকত মোল্লা। একদা, শওকত মোল্লা এই কেন্দ্রে আরএসপির জয়ের অন্যতম কারিগর ছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে তিনি ক্যানিং পূর্ব কেন্দ্রের বিধায়ক হন এবং হয়ে ওঠেন জয়নগর কেন্দ্রের তৃণমূলের প্রধান চালিকাশক্তি  যাকে বিরোধীরা বলে থাকেন  তৃণমূলের বাহুবলের ভিত্তি। বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেস উভয় সরকারেই মন্ত্রী থাকা আব্দুর রাজ্জাক মোল্লাকেও ২০১১ সালে জয়ী করার পেছনে ছিলেন শওকত মোল্লা। জয়নগরের সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রেই ২০২১ সালে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল। বিধানসভা ভোটের কয়েক মাসের মধ্যেই গোসাবার তৃণমূল বিধায়ক জয়ন্ত নস্করের প্রয়াণের পরে উপনির্বাচনে ৮৭ শতাংশ ভোট পেয়ে বিধায়ক হন সুব্রত মন্ডল। গোসাবা, ক্যানিং পূর্ব ছাড়া ও জয়নগরের বাকি পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্র ক্যানিং  পশ্চিম, মগরাহাট পূর্ব, কুলতলী, বাসন্তী এবং জয়নগর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রতিটিতে ২০২১ সালের  ভোটে তৃণমূল বড় মার্জিনে জয়ী হয়েছিল। তবুও আশাবাদী বিজেপি। আশাবাদী বিজেপির প্রার্থী অশোক কান্ডারী। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে বিজেপি এখানে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। ভোটও বেড়েছে প্রচুর। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ক্যানিং পূর্ব ছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রেই তারা দ্বিতীয় স্থানে থেকেছে।  তৃণমূলের বিরুদ্ধে তাঁদের মূল অস্ত্র নদীবাঁধ,অনুন্নয়ন, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি  প্রভৃতি হলেও তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্ব তাদের সুবিধা করে দিতে পারত । অনিমেষ মন্ডল, সুব্রত মন্ডল এবং একাধিক গোষ্ঠী তৃণমূলের মধ্যে বিভিন্ন পথের পথিক হলেও  লোকসভা ভোটের বৈতরণী পার হতে তৃণমূল মোটের ওপরে এককাট্টা। শারীরিক কারণে কার্যত অথর্ব হয়ে পড়া এই কেন্দ্রের একদা দোর্দন্ডপ্রতাপ নেতা  আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা এখন রাজনীতির ময়দানে না থাকলেও  এই কেন্দ্রের হালহকিকত ও চরিত্র বোঝেন। বিজেপি প্রার্থী অশোক কান্ডারী তার কাছে আশীর্বাদ চাইতে গিয়েছিলেন। তিনি নিজের মত করে পরিষ্কার বলে দেন, বিজেপি  সুবিধা করতে পারবে না। জয়নগর লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপির কেউটে ধরা কতটা কঠিন তাঁর মত আর কে জানে! তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আছে, নদীবাঁধের সমস্যা ছিল ও আছে,  কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে আছেন সুব্রত,অনিমেষ,সওকত মোল্লা প্রমুখ। রয়েছেন “সাধারণ জনতা” যারা নাকি তৃণমূলের নামে কুকথা ও বিষ-উদগার শুনলেই ক্ষেপে ওঠে! সার্বিকভাবে তৃণমূলের সম্ভাব্য সাফল্যের পেছনে রয়েছে, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও তৃণমূলের একজোট হয়ে জয়ী হওয়ার বাধ্যবাধকতা, সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্ক এবং সর্বোপরি তৃণমূলের জোরদার ভোট মেশিনারি।  প্রতিমা মন্ডলের পায়ের তলায় মাটি এবারের লোকসভা ভোটেও অত্যন্ত মজবুত। জয়নগরে প্রতিমার জয় রুখে বিজেপির জয় কঠিন, অত্যন্ত কঠিন।

আরও পড়ুন  বারাসাত লোকসভা কেন্দ্রে জিতবে কে?

About Post Author