পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৯ জুলাই :বঙ্গের যে চারটি বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম কেন্দ্র হল মানিকতলা। এই কেন্দ্রটি প্রাক্তন মন্ত্রী সাধন পান্ডের প্রয়াণের পর থেকে ফাঁকাই পড়ে আছে। বিধায়কহীন অবস্থায় ছ মাসের মধ্যে ভোট করার নিয়ম থাকলেও ২০২২ সালে সাধন পান্ডের মৃত্যুর পর থেকেই আইনি মারপ্যাঁচে এই কেন্দ্রে ভোট হয় নি। এই কেন্দ্রটি অনেক দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।
যে চারটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট হচ্ছে তারমধ্যে একমাত্র মানিকতলা কেন্দ্র তৃণমূলের জেতা আসন। বাকি তিনটিতেই জয়ী হয়েছিল বিজেপি। শুধু তাই নয়, সদ্য সমাপ্ত লোকসভা ভোটে অন্য তিনটি বিধানসভা কেন্দ্রেই লিড ছিল বিজেপির। মানিকতলায় এগিয়েছিল তৃণমূল। তবে ব্যবধান এতটাই কম ছিল যে তা অস্বস্তি জাগানোর পক্ষে যথেষ্ট। মাত্র ৩৫০০ ভোটে কলকাতা উত্তর কেন্দ্রের অন্তর্গত এই বিধানসভা কেন্দ্রে লিড ছিল লোকসভায় তৃণমূল প্রার্থী সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ফলে এবারের ভোটে তৃণমূলের কুণাল ঘোষ সহ একাধিক নেতাকে নামাতে হয়েছে ঘর গোছাতে। বিজেপির প্রার্থী পোড় খাওয়া কল্যাণ চৌবে।
সাধন পান্ডে বেঁচে থাকার সময় রাজনীতিতে উত্থান হয়েছিল তার মেয়ে শ্রেয়া পান্ডের। মনে করা হয়েছিল, সাধন পান্ডে প্রয়াত হওয়ার পরে সেই আসনের প্রার্থী পথ দেওয়া হবে শ্রেয়া পান্ডেকে। কিন্তু শ্রেয়া পান্ডে বিগত দু বছরে বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়েছেন। রোজভ্যালি স্ক্যামে তার কাছে সমন গিয়েছে। এছাড়াও আরও কিছু বিতর্ক দলের ভেতরেই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত মানিকতলা বিধানসভা কেন্দ্রে কল্যান চৌবের বিরুদ্ধে জয় আনতে সাধন পান্ডের স্ত্রী সুপ্তি পান্ডেকে প্রার্থী করা হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বান্ধবী সুপ্তি পান্ডেকে প্রার্থী পথ দেওয়ার মধ্যে বিতর্ক কমেছে, তবে বিস্ময়ের উপাদান থেকেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন যোগমায়া কলেজে পড়তেন তখন সুপ্তি পড়তেন গোখেলে কলেজে। যোগাযোগ তখন থেকেই প্রগাঢ়। এবার তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক ময়দানে নামিয়েছেন মমতা। তৃণমূল সুপ্রিমো একদিকে সুপ্তিকে প্রার্থী করলেও শ্রেয়ার বিষয়ে কঠোর বাধা নিষেধ আরোপ করেছেন তিনি । কুণাল ঘোষ সহ এবারের ভোটের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের তিনি সাবধান করে দিয়েছিলেন, শ্রেয়া কে যেন ভোটের প্রচারে দেখা না যায়। যায়ও নি । কেন ব্রাত্য শ্রেয়া তার বেশ কিছু রাজনৈতিক -অরাজনৈতিক ব্যাখ্যা থাকলেও সুপ্তি পান্ডে জিতবেন কিনা সেদিকেই নজর।

সাধন পান্ডের জীবদ্দশায় সুপ্তি পান্ডে রাজনীতির ধারেকাছে যেতেন না। বিগত কিছুদিন ধরে তাঁকে সভা সমিতিতে দেখা যাচ্ছিল এবং তৃণমূলের সঙ্গে নিজের যোগাযোগ ক্রমশ বাড়িয়েছেন তিনি। সাধন-পত্নী ভোটে দাঁড়ালে এবং তাঁর প্রচার জোরদার হলেও অস্বস্তি থেকেই গিয়েছে।মাত্র ৩৫০০ ভোটের লিড। সবচেয়ে বড় কথা, লোকসভায় সাধন পাণ্ডের নিজের ওয়ার্ডে তৃণমূল খুব বেশি লিড আনতে না পারলেও পরেশ পালের এলাকায় তৃণমূল গোহারা হেরেছে। ফলে খুব গভীরভাবে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট করতে হচ্ছে তৃণমূলকে। অথচ পরিসংখ্যানের কথা বললে দেখা যাবে সাধন পান্ডে এখানে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন বারবার । ২০১১ সালের ৬০শতাংশের উপরে ভোট পাওয়া সাধন পান্ডে ২০১৬বা ২১ সালে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ২০১৬ সালে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সিপিআইএমের রাজীব মজুমদার। সেবারও এই কেন্দ্রে সিপিআইএমের ভোট ছিল ৩৩ শতাংশ।এবারের ভোটেও বাম প্রার্থী রাজীব মজুমদার । বঙ্গে বিজেপির উত্থানের পরে সিপিআইএম বা বামেদের রাজ্যজুড়ে অস্তিত্ব সংকটের মতই মানিকতলায় বাম ভোটব্যাঙ্ক ধসে গিয়েছে। ২০২১ সালে কল্যাণ চৌবে মানিকতলা কেন্দ্রে বিজেপির ভোট এক ধাক্কায় ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে ফেলেন। কল্যাণ চৌবে এবারও বিধানসভা উপনির্বাচনে মানিকতলার বিজেপি প্রার্থী। তিনি তাঁর প্রচারে গতি আনার কোনও কার্পণ্য রাখেন নি। তিনি বিভিন্ন ইস্যুতে শাসক দলকে বারবার বিঁধেছেন। তাঁকে বাড়তি রসদ যোগাচ্ছে লোকসভা নির্বাচনে মানিকতলা অঞ্চলে বিজেপির ভালো ফল। তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির কুড়িহাজারের বেশি ব্যবধান ছিল শেষ বিধানসভা নির্বাচনে। ফলে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন তৃণমূলের কাছে কার্যত অশনি সংকেত ।

প্রশ্ন উঠছে, তিন বছরের মধ্যে ১৭, ০০০ ভোট কোথায় গেল? এর উত্তর হতে পারত বিজেপির শক্তি বৃদ্ধি যা বিজেপি মনে করলেও তৃণমূল শিবিরের মত রাজনৈতিক বিশ্লেষক দের অনেকেই মনে করছেন না।তাঁদের ধারণা, তৃণমূল দলের সদ্য প্রাক্তন ও প্রবীণ নেতা তাপস রায় বিজেপি প্রার্থী হওয়ার পরে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় কে হারানোর জন্য তৃণমূলেরই একটি অংশ সক্রিয় হয়েছিল। তাদের এবারের উপনির্বাচনে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল মনে করছে, সুপ্তি পান্ডের পায়ের তলায় মাটি অত্যন্ত মজবুত। লোকসভার সময় ৪২ টি কেন্দ্রে ভোট ছিল অর্থাৎ ২৯৪ টি বিধানসভা ক্ষেত্র জুড়ে ভোট হয়েছে।এবার মাত্র ৪ টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট। ফলে তৃণমূল নেতৃত্ব সহ সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ৱ্যাডারে সবকিছু অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে । মহানগরীর বুকে একমাত্র বিধানসভা কেন্দ্রে নজর যেমন থাকছে তেমনই অতীন- কুণাল ঘোষ সহ তৃণমূলের প্রথম সারির নেতাদের তৎপরতা দেখা গিয়েছে। ভোটের প্রাক মুহূর্তে তাঁদের সহ অত্যন্ত নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে তৃণমূল শিবিরকে। বিজেপির কল্যাণ চৌবে প্রচারে খামতি রাখেন নি তবুও তৃণমূল মনে করছে বিগত বিধানসভা নির্বাচন গুলির মতই বড় মার্জিনে জয় আসবে। তাঁদের ধারণা, সাধন পান্ডের মতই বিপুল ভোটে জিতবেন সাধন পত্নী সুপ্তি।কুণাল ঘোষ বলেছেন, ৩৫০০ এর চেয়ে মার্জিন বাড়বে। তবুও এখনই ঝেড়ে কাশতে চাইছে না তৃণমূল নেতৃত্ব। ভোট বড় বালাই, না আঁচালে বিশ্বাস নেই যে!


More Stories
“রাজনৈতিক প্রতিহিংসা “, জামিনের আবেদন সুজিত বসুর
ডিমথেরাপি অশোকনগরের গ্রেফতার চেয়ারম্যান প্রবোধ সরকারকে
কার্যত ভুল স্বীকার করে নিলেন অভিষেক, সুর নরম কল্যাণের, অভিষেক – কল্যাণ বিবাদ মিটল!