পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা, ১ আগস্ট : #kakoli Ghosh Dastidar রেল দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। ঝরে পড়ছে অগণিত প্রাণ। অতি-সম্প্রতি চক্রধরপুর রেল দুর্ঘটনার পরেও আবার ঘটেছে রাঙাপানিতে মালগাড়ির লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা। তারও দেড় মাস আগে, রাঙাপানিতে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনায় দশজনের প্রাণহানি হয়। বিভিন্ন মহল থেকেই যাত্রী পরিষেবা ও রেলে যাত্রী সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেই চলেছে। অনেকেই সরব হচ্ছেন। তবে এরই মাঝে তৃণমূলের হয়ে কেন্দ্রীয় বাজেটে রেলের বরাদ্দ নিয়ে তাঁর বক্তব্য রাখতে গিয়ে যাত্রী সুরক্ষা প্রসঙ্গে তাঁর মূল্যায়ন সম্বলিত বাগ্মিতা দিয়ে মুগ্ধ করলেন ডক্টর কাকলি ঘোষ দস্তিদার। রেলের বরাদ্দ নিয়ে বক্তব্যের শুরু ও শেষ করে একাধিক মনোগ্রাহী প্রসঙ্গের অবতারণা ঘটালেন তিনি। সংসদে রেলের যাত্রী সুরক্ষা ও রেল পরিষেবা নিয়ে যে বক্তব্য পেশ করেন বারাসাতের তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার তা এক কথায় অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন।সংসদের চলতি অধিবেশনে কাকলি ঘোষ দস্তিদার প্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনলেন রেল পরিষেবার বেহাল দশাকে। একাধারে রেলযাত্রীদের রেলসফরে ক্রমাগত প্রাণহানির মর্মান্তিক প্রসঙ্গ তুলে শুধু কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রককে যে বিঁধলেন শুধু তাই নয়, একইসঙ্গে ট্রেন দুর্ঘটনার গাফিলতির কারণ তুলে ধরলেন। রেল দুর্ঘটনার কারণের মূলে গিয়ে ত্রুটি সমূলে উপড়ে ফেলার নিদানও দিলেন বারাসাতের সাংসদ।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেন, রেলযাত্রী তথা মানুষের প্রাণ বাঁচানো আগে জরুরি । রেলে যে মানুষরা প্রতিনিয়ত যাতায়াত করেন তাঁদের বাড়িতে শিশু সন্তান, স্ত্রী,মা অপেক্ষারত থাকে। পরিবারের লোকটির ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করে। কিন্তু মানুষের বদলে তার নিথর দেহ ফিরে এলে পরিবারের শোক ভয়াবহ আকার নেয়। এই মৃত্যু দেশের ক্ষতি। বাজেট বাড়ালেই হবে না, মৃত্যুও যে সমানুপাতিকভাবে বেড়ে চলেছে। যে বা যারা এর জন্য দায়ী তাকে বা তাদেরকে জাতি ও দেশের কাছে উত্তর দিতে হবে। এভাবেই নিজের বক্তব্যের নির্যাস ও সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে কাকলি ঘোষ দস্তিদার রেল পরিষেবা ও নজরদারির ব্যবস্থাকে তুলোধুনো করে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর জবাবদিহি রেলমন্ত্রকের কাছে দাবি করেন। রেল মন্ত্রক ও যাত্রী পরিষেবা নিয়ে তাঁর বক্তব্যের শুরুতে মসৃনভাবে তুলে আনেন বারাসাতের সাংসদ। আর বক্তব্যের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন যুগপৎ পরিসংখ্যানগতভাবে নিখুঁত ও যাত্রী নিরাপত্তায় শিথিলতার প্রতি আক্রমনাত্মক। মানুষের কথা, মানুষের জীবনের মূল্য বারবার প্রতিধ্বনিত হয়েছে তাঁর সংসদীয় বক্তব্যে।

নিজের রেল পরিষেবার মূল্যায়নগত বক্তব্যের সূচনায় কাকলি ঘোষ দস্তিদার একাধিক রেল দুর্ঘটনায় প্রয়াত যাত্রীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে সংসদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। অতঃপর তুলে আনেন পরিসংখ্যান। অর্থমন্ত্রীর নাম না করে আক্ষেপের সুরে বারাসাতের সাংসদ বলেন, রেলের বরাদ্দ নিয়ে নির্মলা সীতারামন নীরব থাকলেও কেন্দ্রীয় নথি থেকে জানা যাচ্ছে, রেলের বরাদ্দ ২ লাখ ৬২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। তাঁর বক্তব্যে এরপরই তীব্র শ্লেষ ফুটে ওঠে যাদের প্রাণ গেল তাঁদের প্রতি কেন্দ্রীয় মনোভাবের প্রসঙ্গ উপলক্ষ্যে । তিনি বলেন, যে যাত্রীরা বিগতদিনে রেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তাঁদের তো দোষ ছিল না। এরপরে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের প্রশ্ন, নিরপরাধ জাতির প্রাণহানিতে কার দোষ?
বারাসাতের সাংসদ বলেন, রেলযাত্রীরা কোথাও যাবেন স্থির করে সফর শেষ করার আগেই মাঝপথে প্রাণ হারাচ্ছেন । তাহলে দোষ রেলমন্ত্রকের এবং রেল পরিষেবার নজরদারিতে গাফিলতি । তাঁর উল্লেখ, সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত একশো জনের প্রাণহানি হয়েছে । গত ২-৩ মাসে অন্তত ৯ টি রেল দুর্ঘটনা হয়েছে। দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্তরা গদি বাঁচাতে ব্যস্ত। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের মতে, মানুষের প্রাণ বাঁচানোর সদিচ্ছাই নেই রেলমন্ত্রকের । তাঁর পরবর্তী প্রশ্ন, কবে থামবে এই রেল দুর্ঘটনা? রেলের ফ্ল্যাশার টানার বিষয়টির দিকে মনোযোগী হওয়ার উত্থাপন করে, তাঁর তীক্ষ্ণ প্রশ্নবান- আদৌ কি রেললাইনের ফিসপ্লেট খতিয়ে দেখা হয় , রেল ট্র্যাকে কি নজরদারি আদৌ আছে? এই কারণগুলি সমূহ বিপদ হয়ে দেখা দিচ্ছে, প্রাণ যাচ্ছে নিরীহ যাত্রীর, মন্তব্য বারাসাতের সাংসদের ।

কাকলি ঘোষ দস্তিদার উল্লেখ করেন, বঙ্গের তৃণমূল সুপ্রিমো ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন অ্যান্টি কলিসন ডিভাইস ব্যবহার হত। এখন বলা হয়, কবচ সুরক্ষা রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, বর্তমান রেলমন্ত্রকের আমলে কবচ-সুরক্ষা প্রকল্প দিয়ে কতদূর আমরা যাত্রীদের প্রাণ বাঁচাতে পারছি?
এখানে বারাসাতের সাংসদ রেল দুর্ঘটনা ও যাত্রীর প্রাণ বাঁচাতে বেশ কিছু নিদান ও দাওয়াইয়ের উল্লেখ করেন পরামর্শ হিসেবে। তিনি বলেন, যেভাবে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি হচ্ছে তাতে এরোপ্লেনের মত এবার সিট বেল্ট লাগাতে হবে। তিনি বলেন, ঝাঁকুনিতে প্রাণ যাচ্ছে। এখানে আবার একাধিক মৃত্যুর নজির টেনে আনেন তিনি। কাকলি ঘোষ দোস্তি দ্বার সংসদের সামনে তথ্য হিসেবে উত্থাপন করেন যে, রেলের ঝাঁকুনিতে একজন ওপরের বার্থ থেকে পড়ে মারা যান , আর একজন নিচের বার্থে থেকেও ঝাঁকুনির প্রাবল্য সামলাতে না পেরে মারা যান। বারাসাতের সাংসদের নিদান, ট্রেনে দরকারি হয়ে উঠছে সিট বেল্ট।
অতঃপর যাত্রী সুরক্ষার অবনতির সমূলে কুঠারাঘাত করে কাকলি ঘোষ দস্তিদার আয়ের পাশাপাশি রেলের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন । ইজ্জত টিকিটের প্রসঙ্গের অবতারণা করেন তিনি। কেন্দ্রের কাছে তাঁর প্রশ্ন, ড্রাইভার, ইঞ্জিনিয়ার, রেল স্কুল ও হাসপাতাল খাতে কত টাকা রাখা হচ্ছে? রেল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে কি যথাযথভাবে কাজ হচ্ছে? বারাসাতের সাংসদের মন্তব্য, এরকম দুর্ঘটনা তো হতে পারে না ট্রেনিং-য়ে কোথাও খামতি না হলে। চিত্তরঞ্জনপুর ফ্যাক্টরির প্রসঙ্গ টেনে তাঁর সংযোজন, রেলে নতুন কর্মসংস্থান বাড়ানো প্রয়োজন।
যাত্রী সুরক্ষায় ও রেল পরিষেবার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত দিকের উল্লেখও করেন বারাসাতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার । নতুন উদ্যোগ হিসেবে তিনি জার্ক ফ্রি সেমি পার্মানেন্ট অটোমেটিক কাপলার -সিল গ্যাংওয়ের উল্লেখ করেন তিনি । তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, রেল বাজেট বৃদ্ধি শুধু নয়, রেল যাত্রা সুরক্ষিত করা দরকার করা দরকার।

কাকলি ঘোষ দস্তিদারের রেল মন্ত্রকের উদ্দেশ্যে বিদ্রুপ,খুদেরা রেল লাইনের পাশে খেলতে গিয়ে ফিস প্লেট উধাও দেখে ট্রেন থামিয়ে দুর্ঘটনা বাচায়, রেল ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে থাকে । কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেন, রেল ট্র্যাকে নজরদারি শিশুদের দায়িত্ব হতে পারেনা। ব্রেক টানার কতটা পরে ট্রেন থামছে যেমন জানা জরুরি তেমন প্রতিনিয়ত ও প্রয়োজনে রাতে রেল ট্র্যাক খুঁটিয়ে দেখার কাজ রেলের রুটিন মাফিক দায়িত্ব । বারাসাতের সাংসদের মতে, আন্তর্জাতিক ভাবে ভারতে রেল পরিষেবা ও যাত্রী সুরক্ষা আন্তর্জাতিক স্তরের বিচারে প্রধান মাপকাঠির নিরিখে খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে । খালি রেলের শৌচাগার বা ট্রেনের ঝকঝকে কামরা দিয়ে যাত্রী পরিষেবার মাপকাঠি বিচার করা যায় না।। যাত্রী সুরক্ষা প্রদান রেল পরিষেবার আশু কর্তব্য ও মূল কথা। বাজেট বাড়ালেই হবে না, মৃত্যুও যে সমানুপাতিকভাবে বেড়ে চলেছে, সংযোজন চতুর্থ বারের সাংসদের ।
কাকলি ঘোষ দস্তিদার তাঁর সংসদীয় ভাষণে, রেলের করুণ হালের কথা বলতে গিয়ে সারাদেশের উদাহরণ হিসেবে বারাসাত সংসদীয় ক্ষেত্রের রেল পরিষেবার কথা তুলে ধরেন। স্টেশন গুলিতে মহিলারা কিধরণের অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন সে কথাও তুলে ধরেন তিনি। মহিলারা শৌচাগারে যেতে পারেন না, তাঁর অভিযোগ। তাঁর বক্তব্য, নতুন ট্র্যাক করলেই হবে না, পুরনো লাইনের মেরামতিও চাই। তাঁর আক্ষেপ, রেলরোড গেটে প্রহরী হিসাবে লোকই থাকেনা। প্রহরী থাকলেও ঠিকঠাক কাজ করে না গেট। সময়মত গেট পড়ে না। রেল রাস্তার ভয়ংকর দুরবস্থা প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটায়। তাই তাঁর বক্তব্য, রেল পরিষেবার দুরবস্থায় মানুষের প্রাণ ঝরে পড়ছে অথচ রেল বিভাগ ও রেল মন্ত্রক রেল বরাদ্দ করেই খালাস। মানুষের প্রাণের দায় নিতে হবে ভরা সংসদে তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যে দাবি তোলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার। বারাসাতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার নিরীহ রেল যাত্রীর মর্মান্তিক পরিণতির সকরুণ উল্লেখ করে রেল পরিষেবার উন্নতিতে খোল-নলচে পাল্টে ফেলার আহ্বান জানান সংসদে। তাঁর পরামর্শ, যাত্রী সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে বিবেচনা করা দরকার একাধিক বিষয়। ডক্টর কাকলি ঘোষ দস্তিদারের প্রশ্ন, বারংবার রেল দুর্ঘটনায় রেলযাত্রী তথা সাধারণ মানুষের প্রাণহানির দায় কেন নেবে না রেল মন্ত্রক?


More Stories
বারাসাতে মিছিল কি তৃণমূলের শেষের শুরুর ইঙ্গিত ?
যুদ্ধের জাঁতাকলে ভারত
আবার বিজয়ী, ইতিহাস গড়ল ভারত