Home » বিচারের বাণী: ইন্ডিয়া’স ডটার – নির্ভয়া

বিচারের বাণী: ইন্ডিয়া’স ডটার – নির্ভয়া

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ২৪ সেপ্টেম্বর: বিচার চাই, মৃত্যুদণ্ড চাই – আরজিকর ঘিরে উত্তাল বঙ্গ তথা গোটা দেশ। এমনটাই বিচারের দাবি উঠেছিল ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাত ৮ টা ৩০ মিনিটের পর ও ২০২০ সালের মার্চ মাসের ২০ তারিখের আগে। এই সময়কালের মধ্যে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ অপেক্ষা করেছিলেন দোষীদের চরম শাস্তির জন্য। কী হয়েছিল দিল্লিতে সেই ভয়াবহ রাতে?

১৬ ডিসেম্বর রাত, ২০১২ – চলো ফুর্তি করা যাক
দ্বারকা থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ দিল্লির রবিদাস কলোনি। ছুটির আনন্দ কীভাবে পালন করা যায়, পরিকল্পনা করছিল বাস চালক রাম সিং ও তার ছোট ভাই মুকেশ। ১৭ বছর বয়সী বাসের এক নাবালক হেলপার যার নাম প্রকাশ না করে গুপ্তা নাম দিয়ে বলা যাক – সে ও বাসের আরেক হেলপার অক্ষয় ঠাকুর সেদিন সন্ধ্যের পর থেকে মদের আসরে বসে পড়েছিল, শুরু করেছিল মদ্যপান। এসময় ভয়ঙ্কর লম্পট বলে কুখ্যাত এবং নির্ভয়া কাণ্ডের অন্যতম নাটের গুরু রাম সিং তাদের এসে বলে, “চলো ফুর্তি করা যাক।” তাদের সঙ্গে নিয়ে রাম -মুকেশ ট্রিপ শেষ হয়ে যাওয়া একটি বাসে করে দিল্লির দিকে রওনা হয়। বাস চালাতে শুরু করে মুকেশ। তারা ১৯ বছরের এক ফল বিক্রেতা পবন গুপ্তাকে সঙ্গী হিসেবে পেয়ে যায়, সঙ্গী হিসেবে পায় জিম ইন্ট্রাসক্টর বিনয় শর্মাকে। এই সময়েই প্রায় একা একা সিনেমা দেখে ফিরছিলেন নির্ভয়া ও তাঁর এক পুরুষ বন্ধু। রাত ৮ টা ৩০ নাগাদ তারা অফ-ডিউটি বাসে উঠেছিলেন। অতি দ্রুত অপরাধীরা চরম সক্রিয় হয়ে ওঠে। বাসটিতে থাকা ছয়জন পুরুষ দম্পতির উপর হামলা চালায়, পালাক্রমে মহিলাকে ধর্ষণ করার আগে, তাকে লোহার রড দিয়ে নির্মমভাবে আক্রমণ করে। তাঁর বন্ধুকে মারধর করা হয়। দুজনকেই নির্যাতন করা হয় এবং তারপরে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন     Tirupati Laddu: তিরুপতি লাড্ডুতে এবার গুটকা! অভিযোগে ফুঁসে উঠেছেন ভক্তেরা

মৃতজনে প্রাণসঞ্চারের ব্যর্থ চেষ্টা
নির্ভয়াকে বাঁচানোর জন্য, তাঁর আরও ভালো চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু নির্ভয়ার ওপরে নির্যাতনের মাত্রা এত তীব্র ছিল যে নির্ভয়ার মধ্যে প্রাণশক্তি সামান্যই অবশিষ্ট ছিল। কার্যত প্রায়-মৃতা একটি মেয়ের মধ্যে প্রাণ সঞ্চারের চেষ্টা চলছিল। ২৯ ডিসেম্বর অর্থাৎ ঘটনার ১৩ দিন পর সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ফিজিওথেরাপির শিক্ষানবীশ ২৩ বছর বয়সী নির্ভয়ার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। অত্যাচার এতটাই ভয়াবহ ছিল নির্ভয়ার বাঁচা কার্যত অলীক কল্পনা ছিল। তবুও ১৩ দিন লড়েছিলেন নির্ভয়া।
নির্ভয়া চলে গিয়েছেন। রেখে গিয়েছেন বেশ কিছু প্রশ্ন। মৃতার বন্ধুর স্মৃতির বোঝা ভয়াবহ। তিনি সেদিনের ভয়ঙ্কর রাতের স্মৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন কিন্তু সেই রাতের দুঃস্বপ্ন তাঁর জীবনকে আজও স্বাভাবিক হতে দেয়নি। তাঁর স্মৃতিচারণা এবং সেদিনের বাসের চালক মুকেশের বক্তব্য পরবর্তীতে সামনে এসেছিল। প্রকট হয়ে যায় মৃত্যুর আগে নির্ভয়াকে কী অমানুষিক কষ্ট তিলে তিলে পেতে হয়েছিল যার প্রতিটি মুহূর্ত ছিল নরক যন্ত্রণা ও মৃত্যু যন্ত্রণার সামিল।
ড্রাইভার মুকেশ ও নির্ভয়ার বন্ধু যা বলেছিল…
মুকেশ ও নির্ভয়ার বন্ধু জানিয়েছিল, অপরাধীদের ছজনের মধ্যে চারজন যাত্রী হওয়ার অভিনয় করে, ফলে নির্ভয়া ও তাঁর পুরুষ বন্ধু বাসে উঠে আসে। এরপরে তার চুল ধরে টানতে টানতে বাসের পেছনদিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ৪৫ মিনিট ধরে ধর্ষণ করে তার উপরে শুরু হয় নৃশংস আক্রমণ। প্রায় এক ঘন্টা ধরে নির্ভয়াকে ভয়ঙ্কর ও অভাবনীয় অত্যাচার করা হয়েছিল, তার যোনিতে একাধিক অস্ত্র ও বস্তু দিয়ে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। মৃত, নগ্ন নির্ভয়ার শরীরের মধ্যে বিভিন্ন জিনিস প্রবেশ করানো ছাড়াও লোহার রড দিয়েও নির্যাতন করা হয়েছিল। দুজনের সব জামাকাপড় খুলে নিয়ে ও জিনিস কেড়ে নিয়ে তাদের বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয়। মুকেশ এসব কথা নিজের মুখেই বলেছিল। সে দাবি করেছিল, সে ধর্ষণে অংশ নেয়নি এবং তার দাদা রাম সিংহের নির্দেশে সে ঘটনার দিন বাস চালাচ্ছিল। যদিও নির্ভয়ার বন্ধু সকলকেই সমান অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। যদিও নির্ভয়া তাঁর আক্রমণকারীদের শনাক্ত করতে যথেষ্ট সময় বেঁচে ছিলেন কিন্তু ভারত জুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর এই ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও মহিলা নিরাপত্তার দাবি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। এরই মাঝে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে মারা যান নির্ভয়া।
সেদিনের চরিত্ররা
রাম সিং সহ বাকিদের কথা বলার আগে নির্ভয়ার কথা আরেকবার বলা যাক। নির্ভয়া ফিজিওথেরাপি পড়ছিলেন এবং একটি কল সেন্টারে কাজ করতেন। তাঁর বাবা বিমানবন্দরের ব্যাগেজ হ্যান্ডেলার হিসেবে কাজ করতেন। ছয় অপরাধী থাকত দক্ষিণ দিল্লির একটি বস্তিতে। ঘটনার পরে তারা ধরাও পড়ে একে একে। একমাত্র এক নাবালক অপরাধী ছাড়া ৫ জনেরই চরম দণ্ড হয়। এদের মধ্যে রাম সিং জেলে আত্মহত্যা করে বলে জানা যায়। যদিও রাম সিংকে খুন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে যদিও তা প্রমাণিত হয়নি। অপরাধের সময় সতেরো বছর বয়সী কিশোর মাত্র তিন বছর সংশোধনাগারে থাকার পরে মুক্তি পেয়ে যায় যদিও তার ছাড়া পাওয়ার বিষয়ে নির্ভয়ার পরিবার ও সুশীল সমাজ আপত্তি তুলেছিল। তার মানসিক স্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সে জিহাদি জঙ্গির সঙ্গে কারাবাসে থাকায় তার মানসিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে, তার মানসিক অবস্থা নিয়ে একাধিক মহল শঙ্কিত ছিল। তাছাড়া এই ঘটনারও প্রমাণ মেলে যে নাবালক অত্যন্ত নির্মম ও কার্যত বিকারগ্রস্ত। নাবালক ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, সে-ই লোহার রড নিয়ে নির্ভয়াকে অত্যাচার করেছিল। তবুও ট্রায়াল কোর্টের বিচারক যোগেশ খান্না নাবালক ছাড়া মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সময় বাকিদের ক্ষেত্রে সদয় হননি। উল্লেখ করা যেতে পারে খুব বেশি না হলেও নাবালক অপরাধীর বয়স অপরাধের সময় ১৭ বছর হওয়ায় সেই একমাত্র মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে রক্ষা পায়। মুক্তির পরে তাকে কেজরিওয়ালের সরকার থেকে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছিল। সে বেঁচে গেলেও বাকিরা বাঁচেনি। অপরাধের সময় ১৯ বছরের পবন গুপ্তা যেমন আইনের চরমতম সাজার হাত থেকে বাঁচেনি। সে পেশায় ছিল ফল বিক্রেতা। প্রাথমিকভাবে পবনকে তার আইনজীবীরা নাবালক সাব্যস্ত করার চেষ্টা করেছিল, যদিও তা ধোপে টেকেনি। অপর অপরাধী অক্ষয় ঠাকুর কর্ম উপলক্ষে বিহার থেকে দিল্লি এসেছিল। অপরাধের সময় ২৮ বছর বয়স ছিল অক্ষয় ঠাকুরের। সে ভয়ঙ্কর অপরাধ করে বিহারে তার গ্রামে পালিয়ে গিয়ে বাঁচার চেষ্টা করলেও পুলিশ তাকে তুলে আনে। সে ছিল বিবাহিত এবং তার একটি শিশু সন্তান ছিল। এই ছয় অপরাধীর মধ্যে একমাত্র বিনয় শর্মা ছিল প্রতিশ্রুতিমান এবং মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশের আগে তাকেই বিশেষভাবে অনুতপ্ত দেখিয়েছিল। সে ছিল জিম ইন্সট্রাক্টর। পরিবারের প্রয়োজনে তাকে অর্থ উপার্জন করার জন্য অল্প বয়স থেকেই কাজে নামতে হয়। মাসে তিন হাজার টাকা আয় করত। তার এক ছোট ভাই ও দুই বোনের টাকাও সে সংসারে পৌঁছে দিত। তার চোখে স্বপ্ন ছিল ভারতীয় বিমান বাহিনীতে যোগ দেওয়ার। করেশপন্ডেন্সে সে গ্র্যাজুয়েশনও সম্পন্ন করেছিল। ছবি আঁকায় তার অসামান্য দক্ষতা ছিল। অপরাধের সময় তার বয়স ছিল কুড়ি বছর, অনুতাপ ও মানসিক অবসাদে জেলের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টাও সে করেছিল। অবশেষে বিনয় ও বাকি তিনজনের জীবন ফাঁসি কাঠে শেষ হয়ে যায় ২০২০ সালের মার্চ মাসের ২০ তারিখে।
সুবিচার কি মিলেছিল?
রাম সিং আত্মহত্যা করার পরে বিচার চলতে থাকা অবশিষ্ট চার অপরাধীকে ২০১৩ সালে মৃত্যুদণ্ডর নির্দেশ দেওয়া হয়। অবশেষে তিহাড় জেলে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০২০ সালে এই ঘটনা ছিল ২০১৫ সালের পর ভারতের প্রথম মৃত্যুদণ্ড। শেষ কয়েক মাসে, চারজন দোষীই তাদের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিল। কিন্তু শীর্ষ আদালত তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। মৃত্যুদণ্ড কমানোর জন্য শেষ মুহূর্তের আবেদনও ফাঁসির কয়েক ঘণ্টা আগে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সকালে দোষীদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়ার কয়েক মিনিট পর নির্ভয়ার মা বলেন, “আমি আমার মেয়ের ছবি জড়িয়ে ধরেছিলাম এবং তাঁকে বলেছিলাম আমরা অবশেষে ন্যায়বিচার পেয়েছি।” নির্ভয়ার বাবা বলেছিলেন যে অবশেষে তার “বিচার ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস পুনরুদ্ধার হয়েছে”।
ফাঁসি ও অতঃপর
তিহাড় জেলের পাশে তখন উল্লাস। মিলেছে সুবিচারের অন্তিমে পশুদের পাপের প্রতিফল। প্ল্যাকার্ড নিয়ে একদল লোক তিহাড় কারাগারের গেটের বাইরে জড়ো হয়েছিল এবং ফাঁসির ঘোষণার পরে তাঁদের আনন্দঘন সেলিব্রেশন শুরু করেছিল।কেউ কেউ “ধর্ষকদের মৃত্যু” বলে স্লোগান দেয় এবং বিচার বিভাগকে ধন্যবাদ জানিয়ে পোস্টার নাড়ায়। সকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট করেন যে “ন্যায়বিচারের জয় হয়েছে”। তিনি যোগ করেন যে দেশকে “এমন একটি জাতি গড়ে তুলতে হবে যেখানে নারীর ক্ষমতায়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া হবে”।
তথাপি বলাবাহুল্য, এই ঘটনাটি ধর্ষণ এবং নারীর প্রতি যৌন হিংসার বিরুদ্ধে সুবিচারের বাণী বয়ে নিয়ে আসার আশা ও প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ কমছে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে ধর্ষণ বেড়েই চলেছে।

রাম, মুকেশ, বিনয়, অক্ষয়, পবনরা চরম শাস্তি পেয়েছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কিন্তু দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি, পারেনি সমাজকে পবিত্র করতে। পুরুষের লালসা ও কুদৃষ্টি এবং ভয়ংকর বহিঃপ্রকাশের হাত থেকে আজও নারীরা যেন বাঁচে না। বঙ্গ হোক অথবা ভারত – বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আজও ভেসে আসে অত্যাচারিতা নির্ভয়াদের করুণ আর্তনাদ। নির্ভয়ার মৃত্যুর পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলেছিলেন। এনিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই, নারীদের দুর্গা হয়ে উঠতে হবে, হয়ে উঠতে হবে প্রতিবাদী। ঘুরে দাঁড়ানোর সময় শুরু নারীদের। তবুও প্রতিবাদেই নেই হয়তো নিরাপত্তার নিশ্চিত আশ্বাস। দায়িত্ব আজ প্রতিটি পিতা-মাতার। তাঁদের সুশিক্ষার বীজ সন্তানের মধ্যে রোপন করার মধ্যেও রয়েছে সামাজিক সংস্কারের অঙ্গীকার।

About Post Author