সময় কলকাতা ডেস্ক:- বাংলাদেশি ইস্যুতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপে তৃণমূলের অন্দরেই চওড়া হচ্ছে ফাটল। তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশি বলে তোপ দাগছেন দলেরই একাংশ।
এই সুযোগে সুর চড়িয়েছে বিজেপি-ও। ভোটার তালিকায় কারচুপি করে বাংলাদেশিদের ঢোকানোর অভিযোগে সরব হয়েছেন বিজেপি নেতারা। কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে দিয়ে তদন্তের দাবিও তুলেছে বিজেপি। কারণ, এই ঘটনায় জড়িয়ে গিয়েছে টিএমসিপির এক নেতা এমনকী খোদ তৃণমূল বিধায়কেরও নাম।
গত বছর বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে জুলাই-বিপ্লবে যুক্ত এক নাগরিক এ রাজ্যের কাকদ্বীপেরও ভোটার, এমন অভিযোগ আগেই উঠেছিল। নিউটন দাস নামে ওই যুবকের সঙ্গে সুন্দরবন সাংগঠনিক জেলার তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভাপতি দেবাশিস দাসের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। দেবাশিসকে, তাঁর এক সময়ের ছায়াসঙ্গী নিউটনের জন্মদিন পালন করতেও দেখা গিয়েছে।
গত শনিবার রাতে আচমকা বাংলাদেশ থেকে পাঠানো নিউটনের এক ভিডিয়ো বার্তায় পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়েছে। সেই ভিডিয়োয় (যার সত্যতা যাচাই করেনি ‘সময় কলকাতা’) নিউটনকে বলতে শোনা গিয়েছে, এ দেশে তাঁর ভোটার কার্ড করিয়ে দেন খোদ কাকদ্বীপের তৃণমূল বিধায়ক মন্টুরাম পাখিরা। এর মধ্যেই প্রতাপাদিত্যনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূলের সদস্য বিপ্লব দাস অভিযোগ করেছেন, টিএমসিপি নেতা দেবাশিসের বাবা-মা এবং স্ত্রী — তিনজনেই বাংলাদেশি।
ঘটনাচক্রে দেবাশিসের স্ত্রী দীপ্তি দাস কাকদ্বীপ বিধানসভার শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধানও। আবার এই পঞ্চায়েতে গত কয়েক বছরে অস্বাভাবিক হারে ভোটার বৃদ্ধি নিয়ে সরব হয়েছেন খোদ বিধায়ক মন্টুরাম। শনিবার রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিয়ো বার্তায় নিউটনকে বলতে শোনা যায়, ‘২০১৪ থেকে আমি কাকদ্বীপের ভোটার। আধার কার্ড-সহ সমস্ত কিছু রয়েছে। ২০১৬–য় কাকদ্বীপের বিধায়ক মন্টুরাম পাখিরাকে ভোট দিয়েছিলাম। কিন্তু ২০১৭–য় আমার ভোটার কার্ডটি হারিয়ে যায়। ২০১৮–য় আবার বিধায়কের সহযোগিতা নিয়ে ভোটার কার্ডটি করি।’
মারাত্মক এই অভিযোগ অস্বীকার করে সোমবার মন্টুরাম বলেন, ‘ভোটার কার্ড হারিয়ে গেলে আমার কাছে আসবে কেন? যতসব গাঁজাখুরি গল্প। আমি ওদের কাউকেই চিনি না।’ ভোটার তালিকায় কারচুপি কাণ্ডে তদন্ত শুরু করেছে সুন্দরবন সাংগঠনিক জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। নিউটন বাংলাদেশে বসে কাকদ্বীপের কোন কোন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, কোন নেতার মাধ্যমে এ রাজ্যে তিনি ভিডিয়ো বার্তা পাঠিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখছে দল।
বিষয়টির উপরে নজর রাখা শুরু করেছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারাও। সুন্দরবন সাংগঠনিক জেলার তৃণমূলের সভাপতি জয়দেব হালদার বলছেন, ‘দলের উচ্চ নেতৃত্বের নির্দেশে সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ এদিকে স্থানীয় তৃণমূল নেতা, পঞ্চায়েত সদস্য বিপ্লব দাসের আবার দাবি, ‘২০২১–এর অক্টোবরে বনগাঁ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ যাওয়ার পথে গ্রেপ্তার হয়েছিল নিউটন। তার কাছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে ভারতেরও ভোটার, প্যান ও আধার কার্ড ছিল।’
প্রায় তিন মাস জেল খাটার পরে ছাড়া পান নিউটন। বিপ্লবের অভিযোগ, তখন নিউটনের জামিনের জন্য টিএমসিপি নেতা দেবাশিস একাধিক বার বনগাঁ গিয়েছিলেন।
জামিন পেয়ে নিউটন কাকদ্বীপে ফিরে দেবাশিসের সঙ্গেই পার্টনারশিপে রেস্তোরাঁর ব্যবসা শুরু করেন। পরে ওই ব্যবসারই আর এক অংশীদারের থেকে আড়াই লক্ষ টাকা নিয়ে চম্পট দেন নিউটন। যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে সোমবার দেবাশিস বলেন, ‘কাকদ্বীপ বিধানসভায় প্রায় ৩০০ মেম্বার রয়েছে। কোথাকার কোন এক মেম্বার আমার বিরুদ্ধে মুখ খুলল, তা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।’ নিউটনের সঙ্গে পার্টনারশিপে রেস্তোরাঁর প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার আর হরি দাসের পার্টনারশিপে রেস্তোরাঁ ছিল। নিউটন কোথা থেকে ব্যবসা করবে?’
স্ত্রীর বাংলাদেশি পরিচয় প্রসঙ্গে দেবাশিস বলেন, ‘আমি যদি বাংলাদেশি হয়ে থাকি, তা হলে তো দেখা যাবে সকলেরই কোথাও না কোথাও বাংলাদেশের সঙ্গে যোগসাজস রয়েছে। আমার জন্ম এখানে, আমার বাবা–মায়ের জন্ম এখানে, আমার স্ত্রীর জন্মও এখানে। কোথা থেকে কে বাংলাদেশি খুঁজে বের করছে?’ কাকদ্বীপ বিধানসভার বিজেপির কনভেনর অভিজিৎ মণ্ডলের অভিযোগ, ‘নিরপেক্ষ তদন্ত চাই। টাকার বিনিময়ে কাকদ্বীপ বিধানসভায় কত বাংলাদেশি ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে, তা খুঁজে বের করতে হবে। কারণ, এতদিন এদের ভোটেই তো তৃণমূল জিতেছে। নিউটনের ভিডিয়ো বার্তা এ দেশে কী ভাবে এল? এনআইএকে দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করাতে হবে।’
অভিজিতের অভিযোগ, ‘বাংলাদেশের বসবাসকারীরা কাকদ্বীপে এসে ধর্মপরিচয় গোপন রেখে নিউটনের মতো বাস করছিল। এরা ও পার বাংলার জিহাদি এবং সন্ত্রাসবাদি। এরা জামায়াতের লোক।’ কাকদ্বীপের তৃণমূল নেতা তথা পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য প্রদীপ প্রামাণিক আবার বলছেন, ‘নিউটনকে আমি চিনি, এখানের ভোটার। ওর বাবা–মা বাইরেই থাকে। এটুকু ছাড়া বিশেষ কিছু আমরা জানতাম না। এখন জানতে পারছি বাংলাদেশের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নিউটন।’


More Stories
তারাপিঠে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুমিছিল, মৃতের সংখ্যা ৮, গ্রেফতার হোটেল মালিক
দেশে আইনশৃঙ্খলা নেই, কংগ্রেস নেতা খুনে ডবল-ইঞ্জিন সরকারকে দুষলেন কংগ্রেস নেতা শিসপাল সিং
শরীর ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে, হিউম্যান বিলবোর্ড ফালাকাটার অধীর বর্মন