সময় কলকাতা ডেস্ক:- বর্তমান পৃথিবীতে পরিবেশগত প্রধান সমস্যাসমূহের মধ্যে অন্যতম বিশ্ব উষ্ণায়ন। আর এই বিশ্ব উষ্ণায়নেরহার ক্রমশও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে জলবায়ু কখনও এক থাকেনি। কখনও খুব উষ্ণ ও শুষ্ক থেকেছে। কখনো শীতল হয়ে বরফে ঢেকেছে। কিন্তু পরিবর্তন হয়েছে অনেক ধীর গতিতে।
তবে সমকালীন পরিবর্তন নিয়ে সবাই খুব চিন্তিত কারণ এ পরিবর্তন ঘটছে অতি দ্রুত এবং এই পরিবর্তনের একটি বড় কারণ হচ্ছে পৃথিবী পৃষ্ঠে মানুষের ক্রিয়া-কর্ম। একশ বছর পূর্বে গড় তাপমাত্রার তুলনায় প্রায় ০.৬° সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিজ্ঞানীগণ কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জলবায়ুগত পরিবর্তন সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, ২১ শতকের সমাপ্তি কালের মধ্যে গড় তাপমাত্রা প্রায় আরও ২.৫ থেকে ৫.৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধি হতে পারে। এর ফলে পর্বতের উপরিভাগের জমা বরফ এবং মেরু অঞ্চলের হিমবাহের মুক্ত গলনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের জলের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে।
২০১১ সাল থেকে রাশিয়া, মঙ্গোলিয়া ও চীন তৃতীয় মেরু বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে গবেষণার কাজ করে চলেছে। এই বছর প্রথম ভারতীয় দল পশ্চিমবঙ্গ থেকে গবেষক হিসেবে কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর প্রদীপ কুমার কর, ডঃ রচিতা সাহা ও সুব্রত সাহা, রাশিয়ার ন্যাশনাল রিসার্চ টমস্ক স্টেট ইউনিভার্সিটি এর আমন্ত্রণে যুক্ত হলেন।
কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে রাশিয়ার টমস্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির মউ চুক্তি কয়েক বছর আগেই স্বাক্ষর হয়েছে। সেই সুবাদেই এই গবেষক দলটি গত ২৫ জুন থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত সাইবেরিয়ার অ্যাকট্রু রিসার্চ স্টেশন-এ গিয়ে বিভিন্ন রকম পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে ফ্লোরা, ফনা হিমবাহের তথ্য সংগ্রহ করেন। এছাড়াও সেখানের জল, গাছ ও হিমবাহের নমুনাও সংগ্রহ করেন বিজ্ঞানীরা।

ইকোলজিস্ট সের্গি কিরপটিন, প্লান্ট প্রটেকশন ও বায়োডাইভার্সিটির হেড অ্যান্ড্রে ব্যাবেনকো এবং হিমবাহ বিশেষজ্ঞ অ্যালেক্সান্ডার এরোফিভ এর সহায়তায় এই গবেষণামূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং এখনও চলছে।
ওই অ্যাকট্রু অঞ্চলটি বিশেষভাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল এর নানাবিধ হিমবাহের উপস্থিতির জন্য। সার্ক, ভ্যালি, হ্যাঙ্গিং ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের হিমবাহ এখানে অবস্থিত। গবেষক দল এই হিমবাহগুলির গঠন, গতিবিধি এবং সর্বোপরি গলনের প্রক্রিয়া ও গতিবেগ বিশেষভাবে তদন্ত করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই হিমবাহগুলি কত দ্রুত গলে যাচ্ছে, তার বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ এই অভিযানের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল।
তৃতীয় মেরু শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এটি একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক ল্যাবরেটরি, যা আমাদের জলবায়ু, জলের উৎস ও বাস্তুতন্ত্রের ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।
এর সুরক্ষা মানেই এশিয়ার—এবং পরোক্ষভাবে বিশ্বের—ভবিষ্যৎ রক্ষা। এই প্রথম যৌথ অভিযান ভবিষ্যতে আরও ব্যাপক সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করেছে।
এই অভিযানে অংশগ্রহণকারী গবেষকদের অনেকেই মনে করেন, আলতাইয়ের অ্যাকট্রু অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ভারতের এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়াটা তৃতীয় মেরুর ভবিষ্যৎ রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয় মেরু অঞ্চলের সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ভারতের এই যৌথ উদ্যোগে অংশগ্রহণ। আলতাইয়ের অ্যাকট্রুতে ভারতীয় গবেষকদের এই অভিযান কেবল গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ভবিষ্যতের জন্য আরও গভীর ও বিস্তৃত গবেষণার মজবুত ভিত্তিও গড়ে তুলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটময় সময়ে তৃতীয় মেরুর ভবিষ্যৎ এশিয়া তথা সমগ্র বিশ্বের ভবিষ্যতের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই যৌথ প্রচেষ্টা তাই বৈশ্বিক পর্যায়ে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে চলেছে।


More Stories
শিক্ষা দুর্নীতিকে গুরুতর পাপ বলার পরেও বিরোধীদের কাঠগড়ায় প্রধানমন্ত্রী
শতাধিক মহাকাশ বিজ্ঞানীর ইস্তফায় নতুন নির্দেশিকা জারি কেন্দ্রীয় সরকারের
আর পারলেন না, মমতার হয়ে মদনের লড়াই শেষ