শুল্কযুদ্ধ চরমে। উপলক্ষ ছিল হয়তো সেটাই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক শুল্কবোমার আছড়ে পড়া যদি একটা ‘সিকোয়েন্স’ হয়, তাহলে পরক্ষণেই সেই শুল্কবোমা সামলে ওঠার আরেক ‘সিকোয়েন্স’ তৈরি হতে দেখা যায় চিনের মাটিতে। আর সেই সিকোয়েন্সের উপলক্ষ ছিল সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন অর্থ্যাত্ এসসিও-র বার্ষিক সম্মেলন। বৈঠকে যোগ দিতে চিনের তিয়ানজিন শহরে পৌঁছেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তাঁদের স্বাগত জানান চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের আবহে এই তিন রাষ্ট্রপ্রধানের একত্রিত হওয়া নিছক একটি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য, এমনটা মনে করছেন না অনেকেই। বরং মনে করা হচ্ছে, ট্রাম্পের শুল্কবাণ প্রতিহত করতে আরও কাছাকাছি আসে তিন দেশ।
‘হিন্দি-চিনি ভাই ভাই’, পাশে ‘পুরনো সঙ্গী’ রাশিয়াও
ঠারেঠোরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিশানা !সোমবার দিনভর আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ইউরোপের তাবড় তাবড় দেশের সংবাদমাধ্যমগুলির শিরোনাম কমবেশি ছিল ‘কাছাকাছি—মোদি-জিনপিং-পুতিন’, তিন রাষ্ট্রপ্রধানের একজোট হয়ে কড়া বার্তা ট্রাম্পকে। এই চর্চা ছাড়া উপায়ও তো নেই। কারণ, বেজিং থেকে দেড়শো কিলোমিটার দূরে কিছু পাহাড় এবং সমুদ্রতটবর্তী তিয়ানজিন শহরে সোমবার বিশ্ব ক্ষমতায়নের নতুন সমীকরণের, নতুন অক্ষের সূচনা হয়। রবিবার সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন সম্মেলনের আগে নরেন্দ্র মোদি চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। জিনপিং এবং মোদি ঘোষণা করেন, এই দুই প্রাচীন সভ্যতার দেশের মধ্যে মৈত্রী এবং সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের সূত্রপাত হল।
তবে সেখানেই শেষ নয়, অপেক্ষা ছিল তারপরও। কারণ, রাশিয়া তখনও আসরে নামেনি। আর তাই সাত বছর পর মোদির সঙ্গে জিনপিংয়ের ওই বৈঠক যতটা না হাই ভোল্টেজ ছিল, তার থেকেও যেন সোমবারের একটি দৃশ্য গোটা বিশ্বের কাছে চমকপ্রদ হয়ে রইল। সোমবার সম্মেলনে শি জিনপিং, নরেন্দ্র মোদি এবং ভ্লাদিমির পুতিনকে দেখা গেল কখনও হাতে হাত ধরে পরস্পরের সঙ্গে আলাপচারিতায় মত্ত। কখনও আবার ব্যক্তিগত আড্ডায় অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছেন।এ যেন বন্ধুত্বের হাওয়া বদল! ব্যাকগ্রাউন্ড ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফোরগ্রাউন্ডে ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিং এবং নরেন্দ্র মোদি। একেই কি বলে শাপে বর?
এসসিও বৈঠক আসলে নিছকই বৈঠক হয়ে আর থাকল না। অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক হয়ে দাঁড়াল সম্পর্কের উষ্ণতার প্রদর্শন। আর সবটাই ফটো এবং ভিডিওয়। সকাল থেকে বিশ্বজোড়া সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সেগুলিই ছড়িয়ে পড়ে। পুতিন অপেক্ষা করছেন মোদির জন্য। সম্মেলনে যাবেন একসঙ্গে। ডেকে নিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে। নিজের লিমুজিনে। এখানেই শেষ নয়! গন্তব্যে পৌঁছনোর পরও তাঁরা গাড়ি থেকে নামছিলেন না। ৫০ মিনিট তাঁদের ওই একান্ত আলোচনা চলল গাড়ির মধ্যে। এরপর পৃথকভাবে সম্মেলন স্থলে দেখা যায় মোদি এবং পুতিন হাত ধরাধরি করে ঢুকছেন। এগিয়ে এসে তাঁদের স্বাগত জানাচ্ছেন জি জিনপিং। এসসিও সম্মেলনের মঞ্চের বাইরে তিন রাষ্ট্রপ্রধান দীর্ঘক্ষণ ব্যস্ত থাকছেন হাসি-ঠাট্টায়। পরস্পরের হাত ধরে। প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি শরীরি ভঙ্গি—আদতে স্পষ্ট বার্তা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। পুতিনের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠতার এই বার্তা দিয়ে মোদি সাফ বুঝিয়ে দিলেন, রাশিয়ার সঙ্গ তিনি ত্যাগ করছেন না। আর আপস করারও প্রশ্ন নেই। মোদি বলেছেন, বহু সঙ্কটময় সময়ে রাশিয়া ও ভারত পরস্পরের পাশে থেকেছে।
পুতিনের বক্তব্য, ভারত রাশিয়ার স্বাভাবিক মিত্র। এই বন্ধুত্বের অবসান হবে না। অর্থ্যাত্, আমেরিকার ৫০ শতাংশ শুল্কঝড়ের মাঝেই আরও কাছাকাছি ভারত ও রাশিয়া। চিন-ভারতের সম্পর্কে অতীতে তিক্ততা থাকলেও ভারত-রাশিয়ার বন্ধুত্ব বহু পুরনো। তাহলে হঠাত্ মোদি-পুতিনের এই বৈঠক কেন ভারত-চিন বৈঠকের পাশাপাশি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াল ? আসলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া। তাদের অপরিশোধিত তেলের বৃহত্তম ক্রেতা চিন ও ভারত। রাশিয়ার থেকে তেল কেনার অপরাধে ট্রাম্প ভারতের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। এরপরেও অবশ্য মস্কের থেকে তেল কেনা থামায়নি দিল্লি। অন্যদিকে চিনের উপরে শুল্ক চাপিয়েছে আমেরিকা। সেই চিনও তেল কেনা বন্ধ করেনি। এই পরিস্থিতিতের মধ্যে চিনে এসসিও সামিটে ভারত-চিন-রাশিয়া একসঙ্গে। নিঃসন্দেহে মোদি-জিনপিং-পুতিনের ছবি বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে এক নয়া সমীকরণের। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবশ্য পাল্টা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা একটা করেছেন। ট্রাম্পের সাফাই, ভারতই আমেরিকায় বেশি রপ্তানি করে। আমেরিকার থেকে নেয় কম। কাজেই ক্ষতিটা একতরফা। এমনকী ভারত শূন্য-শুল্কের প্রস্তাব দিয়েছিল বলেও দাবি করেছেন ট্রাম্প। কিন্তু এখন নাকি দেরি হয়ে গিয়েছে। ট্রাম্পের ক্ষোভের আরও একটি কারণ কী? পুতিন যখন সব রাষ্ট্রপ্রধানকে নিয়ে গ্রুপ ফটো তোলার কথা বলেন, তখন পাক প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে কেউ ডাকেনি। তিনি ঠিক পিছনে। একাকী। চিনের মাটিতে দাঁড়িয়ে মোদি যেমন পহেলগাঁও হামলার বিরুদ্ধে ভারতের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেন, তেমনই পাকিস্তানের দিকে আঙুল তুলে বলেন, সন্ত্রাসের মদতদাতাদের যেন ক্ষমা না করা হয়। আবার সভ্যতা সংলাপ মঞ্চ নামক একটি নতুন নীতি নির্ধারণ প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাবও দিলেন। এসসিওর যৌথ বিবৃতিতেও নিন্দা করা হয় পহেলগাঁও সন্ত্রাসের। স্পষ্টতই এই প্রস্তাবের পিছনে পরোক্ষ বার্তা—মাত্র ৫৩৩ বছরের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ভারত, চিন, রাশিয়ার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। সুতরাং তিন প্রাচীন সভ্যতা হতে চলেছে নয়া পশ্চিমি সংস্কৃতির প্রধান প্রতিস্পর্ধী। নজর করার বিষয়, এই অক্ষের পাশে আসার বার্তা দিয়েছে ইরান, জাপানও। সুতরাং ছবিটা স্পষ্ট, ট্রাম্পের শুল্কনীতি পৃথিবীর নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ার সূত্রপাত ঘটাল।


More Stories
জার্সিতে যৌন অপরাধে প্রাক্তন শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
বিপত্তারিণী রক্ষাকবচ, অবশেষে হরমুজ প্রণালী ভারতের জন্য খুলে গেল, রান্নার গ্যাস আসছে
ইরানের নয়া শীর্ষ নেতা মোজতাবা খামেনি কেন বিতর্কিত?