পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ১৫ নভেম্বর : প্রশ্ন এখন বঙ্গ জুড়ে। বিহারের বিধানসভা ভোটের ফলাফল কি বঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে পড়বে? তার চেয়েও বড় কথা, বঙ্গ বিজেপি বঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে পাখির চোখ করে যা মনে করছে এবং যা বলে চলেছে তার সারবত্তা কতটা? বিজেপির দাবি, এসআইআর হওয়ার পরে বঙ্গ দখল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। সত্যি কি তাই? এসআইআর হলেই কি তৃণমূলের ভোটবাক্সে ফাটল ধরবে আর বঙ্গে ক্ষমতায় আসবে বিজেপি? অঙ্ক কী বলছে? এসআইআরের জোরে বিজেপির বঙ্গ বিজয়ের স্বপ্ন সফল হওয়া কতটা সম্ভব? এসআইআরের নিরিখে বঙ্গের আসন্ন নির্বাচ সম্ভাব্য চিত্র ঠিক কিরকম?
বিহারে ভোট শেষ। ভোটের ফলাফলে এনডিএ জোট ইন্ডিয়া জোটকে পর্যুদস্ত করার পরে বঙ্গ বিজেপি যেন আলাদা অক্সিজেন পেয়েছে। কয়েকমাস পরেই বঙ্গে ভোট। বিহারে এসআইআর হওয়ার পরে ভোট হয়েছে এবং সংশোধনের পরে হওয়া ভোটে বিজেপি -জেডিইউ অভাবিত এবং অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। এনডিএজোট জয় পেয়েছে ২০২ টি আসনে যেখানে মহাগঠবন্ধন বা ইন্ডিয়া জোটের বিহার সংস্করণ-এর জোটের আসন থমকে গিয়েছে ৩৪ টি আসন পেয়ে।
এখানে উল্লেখ করা ভালো, ২৪৩ টির বিহারে বিজেপির জোট এনডিএ দুশোর বেশি আসন পেলেও বঙ্গে এমুহূর্তে ২৯৪ জন বিধায়কের মধ্যে বিজেপি বিধায়ক সংখ্যা ৬৯। চার বছর আগে ভোটে বিজেপি ৭৭ আসন পেলেও তাদের মধ্যে অনেকেই দল পরিবর্তন করেছেন বা মারা গিয়েছেন। ফলে বেশ কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে বিজেপি। লোকসভা ভোটেও বিজেপির ফল বঙ্গে খুব আশাপ্রদ হয় নি।তারপরে কি এই পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব?
এবার আসা যাক গণিতে, আসা যাক ভোটের রসায়নে। এসআইআর এবং বিহারের ভোটের প্রেক্ষিতে আসা যাক বঙ্গের ভোটার তুলনায়। বিহারে এসআইয়ের হওয়ার পরে বিহারের ভোটার থেকে নাম কাটা গেছে ৪৭ লক্ষ। ৫১ টি বেশি বিধানসভা আসন বিশিষ্ট বঙ্গে ভোটার ও স্বাভাবিকভাবে বেশি। শুভেন্দু অধিকারীদের হুংকারের পরে যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় বঙ্গে বিহারের চেয়ে ভুতুড়ে ভোটারের সংখ্যা বেশি যা এস আই আর এরপরে বাদ যাবে এবং সেই সংখ্যা ৪৭ লক্ষের চেয়েও বেশি তাহলে কী হতে পারে? ধরে নেওয়া যাক এই ৪৭ লক্ষ বা তার চেয়ে সামান্য বেশি যা এসআইআরে বাদ যেতে পারে তার সবই তৃণমূলের। কিন্তু এই ভোটারের সবই তৃণমূলের পক্ষে ছিল মেনে নিয়ে অঙ্ক করা যাক যদিও তা বাস্তবে হওয়া কার্যত অসম্ভব। কেন অসম্ভব?
বাস্তব হল ভোট করাতে হয়। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের কথা বাদ দিলেও শুধুমাত্র ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের হিসেব ধরলে বলতে হয় ২০২৫ সালের এসআইআরে ভোটারের নাম বাদ পড়বে। ২০২১ সালে এমন কিছু আসনে বিজেপি জয় পেয়েছে যেখানে তৃণমূলের শক্তি নগণ্য ছিল এবং সেখানে তৃণমূলের সংগঠনও মজবুত ছিল না। সেখানে তৃণমূল যে ইচ্ছেমত ভোট করিয়েছে বা ভুতুড়ে ভোটারের ভোট নিজেদের বাক্সে এনেছে সেকথা বলার কোনও প্রকৃত যুক্তি নেই। শুভেন্দুর গড়ে ভুতুড়ে ভোটাররা একের পর এক বুথে ভোট দিয়েছে একথাও বলা যায় না। কারণ বিজেপি ৭৭টি আসন পেয়েছিল ২০২১ সালের এবং উত্তরবঙ্গে এক বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে তারা রীতিমত দাপট দেখিয়ে তৃণমূলের চেয়ে তুলনামূলক সাফল্য লাভ করে। এবার আসা যাক ২০২১ সালের সার্বিক ভোটের সমীকরণে যা আভাস দিতে পারে এসআইআরে নতুন তালিকা এলে সত্যি কী উলট-ফের হওয়ার কোনও সম্ভাবনা থাকছে?
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলেরপ্রাপ্ত আসন ২১৫ এবং মোট প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৮৯ লক্ষ ৬৮ হাজার ২৮১। এই সংখ্যা ছিল শতাংশের হিসেবে মোট ভোটের ৪৮. ০২%। বিজেপির ভোট ছিল ২ কোটি ২৯ লক্ষ ৫ হাজার ৪৭৪ এবং শতাংশ গত হিসাবে মোট ভোটের ৩৮. ১৫%। অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ (৯. ৮৭%) এবং ভোটের ফারাক প্রায় ৬১ লক্ষ। সুতরাং ৫০ লক্ষের কাছাকাছি ভোটারের নাম বাদ গেলেও এগিয়ে থাকবে তৃণমূল। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবেই বাদ পড়া ভোটাররা যদি সবাই তৃণমূলের ভোটার হয়ে থাকে তাহলে বিজেপি সম্ভাব্য ভোটে তৃণমূলের অনেকটাই কাছাকাছি পৌঁছবে। কিন্তু এই অঙ্কে বিরাট ত্রুটি রয়েছে। কারণ বঙ্গে এস আই আর প্রক্রিয়া চলছে । কেউ জানে না কত লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাবে! এই তথ্য প্রথমে সামনে আসা দরকার তারপরে বিজেপি বলতে পারে যে তারা তৃণমূলকে ধরে ফেলার পাথেয় পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাতেও অংকে ফাঁক থেকে যাবে। কারণ বিজেপি যতই বলুক- ভোটে কারচুপি করে সব মৃত বা ভুতুড়ে ভোটারের ভোট তৃণমূলের বাক্সে গিয়েছে তা বাস্তবে অসম্ভব। তথ্য কী বলে?
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটকে সামনে রাখলে অংক পরিষ্কার। ৬ লক্ষ ভোটারকে বঙ্গের ১ শতাংশ ভোটার ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু এটাও ঘটনা যে, বঙ্গের ২৯৪ টি কেন্দ্রের ২৯২ টি কেন্দ্রে হওয়া ভোটের নিরিখে ৮২. ৩০ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এই ভোটারদের কমবেশি ৪৮ শতাংশ তৃণমূলের বাক্সে আর ৩৮ শতাংশ বিজেপির বাক্সে গিয়েছিল। ১৮ শতাংশ মানুষ ভোটই দেননি। এবং এই ভোটারদের অনেকটাই যে মৃত ভোটার তা ধরে নেওয়া হয়। এস আই আর এ প্রকৃত বা বৈধ ভোটার চয়ন করতে গিয়ে যাদের নাম বাদ পড়বে তাদের মধ্যে যে এই ১৮ শতাংশ সম্ভাব্য ভোটারের বা অধিকাংশ সম্ভাব্য ভোটারের নাম ছিল না তা বলা একেবারেই সম্ভবপর নয়।
এর বাইরে ও সমীকরণ রয়েছে। গণিতের একটি অধ্যায় হিসেবে সামনে আনা যেতে পারে মতুয়া ভোটারদের কথা। তারা ভোট দিয়েছেন গত বিধানসভা ভোটেও। তারা ভোট দিয়েছেন ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও। তাঁদের সংখ্যা পরিষ্কার জানা না থাকলেও এবং একদা এই সংখ্যা ৩০ লক্ষ বলে মনে করা হলেও শান্তনু ঠাকুর নিজেই বলে থাকেন এই সংখ্যা কয়েক কোটি। এরা উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ লোকসভার চারটি বিধানসভা আসনে নির্ণায়ক ফ্যাক্টর। এরা নদীয়ার অন্তত দুটি লোকসভা কেন্দ্রে, পূর্ব বর্ধমানে, এবং দক্ষিণ ২৪পরগনার একাধিক বিধানসভা আসনে প্রভাব রাখার ক্ষমতা সম্পন্ন। সব মিলিয়ে যদি দেখা যায়, ৩০টির কাছাকাছি বিধানসভা আসনে এদের প্রত্যক্ষ প্রভাব। সুতরাং মতুয়া ভোটারের সংখ্যা খুব একটা কম নয় এবং এই সংখ্যা যে কোনভাবেই ৪৭ লক্ষর কম হবে না বলাই বাহুল্য। এঁদের বিরাট অংশের মানুষ আবার আশঙ্কা করছেন, এস আই আর হলে তাদের দেশ থেকে উৎখাত না হতে হয়! এবং মতুয়া প্রধান অঞ্চলে বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক অনেকটাই তাদের আশীর্বাদপুষ্ট। এরকম আরও অনেক সীমান্ত অঞ্চল রয়েছে যেখানে বিজেপি ভালো ফল করেছে এবং ইতিমধ্যেই স্থানের স্থানে বিজেপির তত্ত্বাবধানে শুরু হয়ে গিয়েছে সিএএ ক্যাম্প। ক্যামেরার সামনে মুখ খুলছেন অনেক ভোটার। বৈধ ভোটার চয়নের ক্ষেত্রে, মতুয়া সমীকরণ ফেলে দেওয়ার নয়।
স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়,ঠগ বাছতে গিয়ে গাঁ উজাড় হয়ে গেলে, সব ভোটারই যে তৃণমূলের ছিল এই দাবি কার্যত অন্তঃসারশূন্য মনে হতেই পারে।তবে তার আগে এসআইআর-এ বঙ্গে বৈধ ভোটারের এবং বাদ যাওয়া ভোটারের তালিকা সামনে আসা দরকার। তবেই বিজেপি না হয় গাণিতিক ভোটের রসায়ন ও সমীকরণের কথা তুলে ধরতে পারে। তবেই না,বিজেপি এসআইআর- এর জোরে বঙ্গ দখলের হুংকার দিতে পারে! শুধুমাত্র বিহার ভোটের তথ্য এবং এসআইআরের সমীকরণ বঙ্গের ভোটের ও রাজনীতির চালচিত্র রাতারাতি পাল্টে দেবে একথা বলার মত যুক্তি ও প্রেক্ষাপট এখনও তৈরি নয়। এসআইআরের জোরে বিজেপির বঙ্গ বিজয়ের স্বপ্ন যে সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত সেগুলো বলার মত অবস্থা এখনও সম্পূর্ণ নয়।
# এসআইআরের জোরে বিজেপির বঙ্গ বিজয়ের স্বপ্ন


More Stories
অভিযুক্তদের পুলিশি হেফাজত :শুভেন্দুর পিএ চন্দ্রনাথ খু*নে কারা গ্রেফতার, কোথায় গ্রেফতার? যোগসূত্র কী?
বন্ধ হচ্ছে না কোনও চালু প্রকল্প, আর কী জানালেন শুভেন্দু
নেপো কিড নই, আবার দেখা হবে – সাসপেন্ড হয়ে আর কী বললেন ঋজু দত্ত