Home » বিহারে গেরুয়া ঝড় ও বিজেপি হুঙ্কার এবার বাংলার পালা,তখতের উলট-ফের সম্ভব কিভাবে বঙ্গে?

বিহারে গেরুয়া ঝড় ও বিজেপি হুঙ্কার এবার বাংলার পালা,তখতের উলট-ফের সম্ভব কিভাবে বঙ্গে?

পুরন্দর চক্রবর্তী সময় কলকাতা, ১৪ নভেম্বর : মহাজোট বা মহাগঠবন্ধন কে দুরমুশ করে মোদী – নীতিশের এনডিএ বিহারের মসনদে বসতে না বসতেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং হুঙ্কার দিয়েছেন –  ” এবার বাংলার পালা। ” কী বলছে তৃণমূল? গিরিরাজ বিহারের পর এবার বাংলার পালা বললেও এরকম বক্তব্যকে গুরুত্ব দিতেই নারাজ তৃণমূল।তৃণমূলের তরফে কার্যত ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিজেপির স্বপ্নকে। গিরিরাজ সিং বা বিহার ভোটের ফলের পরে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে সঞ্জীবনী সুধা পাওয়া বিজেপি নেতাও কর্মীরা বলছেন আসন্ন ভোটে বাংলা দখল সময়ের অপেক্ষা বিজেপির।  তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ অবশ্য  বিজেপির বাংলা দখলের ঘোষণাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বলেছেন   , “বাংলায় শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভরসা।”

কী এমন বলেছেন গিরিরাজ সিং যে কুনাল ঘোষ কে ছাতার তুলনা টানতে হচ্ছে!কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং বলেছেন, “আমরা বাংলাতেও জিতব। ওখানকার বর্তমান সরকার বাইরের শক্তির মদতে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। কিন্তু বাংলার মানুষ এবার সত্যটা বুঝতে পারবেন।”

বঙ্গে ভোটের এখনো ছ মাস বাকি।  স্বাভাবিকভাবেই হুংকার ও পাল্টা হুংকার চলবেই। প্রশ্ন সেখানে নয়। ২৪৩ আসন বিশিষ্ট  বিহারে ৮৫ শতাংশ আসন নিজেদের দখল করা এনডিএ-র অন্যতম প্রধান দল বিজেপি কোন মন্ত্র বলে বাংলা দখল করবে তার নির্যাস থেকে প্রশ্ন একটাই -যা তুলছেন বা তুলে চলেছে বঙ্গ বিজেপি। প্রশ্ন হল, এসআইআরের পরে প্রথম রাজ্য বিহারের ভোটে বিজেপি জয়ের পতাকা উড়িয়েছে। এসআইআর কি ছাপ ফেলবে বঙ্গের ভোটে? নইলে রাতারাতি তখতের উলটফের সম্ভব কিভাবে বঙ্গে?

কারণ এই মুহূর্তে বঙ্গে বিজেপি বিধায়কদের চেয়ে তিনগুণ বিধায়ক বেশি তৃণমূলের। গত বিধানসভা ভোটের নিরিখে প্রতি চারটি আসনে তিনটি  আসন তৃণমূলের। বঙ্গের বিজেপি নেতারা বলছেন, এসআইআর হওয়ায় বাংলা দখল করা কোনও ব্যাপারই নয়। তাঁদের মতে,  মৃত বা ভুতুড়ে ভোটার থাকবে না। থাকছে না বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গারা। আর এঁদের ভোটেই নাকি জিতে এসেছে তৃণমূল। তৃণমূলের ঢাক ছিল অবৈধ এবং ভুতুড়ে ভোটার যাকে এস আই আর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনে খুঁজে বার করে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এবার ঢাকসহ ঢাকিকে বিসর্জনের পালা। এমনটাই মনে করছে বিজেপি, তাঁদের হুঙ্কার সেখানেই। তাঁরা মনে করছেন এসআইআরের জোরেই তখতের উলটফের সম্ভব বঙ্গে।

অর্জুন সিং বলছেন, ভুতুড়ে ভোটার দিয়েই বঙ্গে জয় পেয়েছে তৃণমূল। তিনি বলেন,”বিহারের  ভোটের পরে নিশ্চিত যে বঙ্গে ক্ষমতায়  আসছে ভারতীয় জনতা পার্টি। “। বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি রাহুল সিনহা বিহারের ভোটের পর  তৃণমূলকে খোঁচা দিয়ে বলেছেন  ওদের চিন্তা বাংলাদেশি, রোহিঙ্গাদের নিয়ে। ওরা জানে এদের নাম বাদ গেলে ওরা খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে।” সত্যি কী তাই? সমীকরণ কী বলে?

এখানে উল্লেখ করা ভালো, ২৪৩ টি আসন বিশিষ্ট বিহারের ভোটে এনডিএ জোট ২০২ টি আসন পেলেও বঙ্গে এমুহূর্তে ২৯৪ জন বিধায়কের মধ্যে বিজেপি বিধায়ক সংখ্যা ৬৯। চার বছর আগে ভোটে বিজেপি ৭৭ আসন পেলেও তাদের মধ্যে অনেকেই দল পরিবর্তন করেছেন বা মারা গিয়েছেন। ফলে বেশ কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে বিজেপি। লোকসভা ভোটেও বিজেপির ফল বঙ্গে খুব আশাপ্রদ হয় নি।তারপরে কি এই পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব?

এবার আসা যাক গণিতে, আসা যাক ভোটের রসায়নে। এসআইআর এবং বিহারের ভোটের প্রেক্ষিতে আসা যাক বঙ্গের ভোটার তুলনায়। বিহারে এসআইয়ের হওয়ার পরে বিহারের ভোটার থেকে নাম কাটা গেছে ৪৭ লক্ষ। ৫১ টি বেশি বিধানসভা আসন বিশিষ্ট বঙ্গে ভোটার ও স্বাভাবিকভাবে বেশি। শুভেন্দু অধিকারীদের হুংকারের পরে  যদি তর্কের খাতিরে ধরে  নেওয়া যায় বঙ্গে বিহারের চেয়ে ভুতুড়ে ভোটারের সংখ্যা বেশি যা এস আই আর এরপরে বাদ যাবে এবং সেই সংখ্যা ৪৭ লক্ষের চেয়েও বেশি  তাহলে কী হতে পারে? ধরে নেওয়া যাক এই ৪৭ লক্ষ বা তার চেয়ে সামান্য বেশি যা এসআইআরে বাদ যেতে পারে তার সবই তৃণমূলের। কিন্তু এই ভোটারের সবই তৃণমূলের পক্ষে ছিল মেনে নিয়ে অঙ্ক করা যাক যদিও তা বাস্তবে হওয়া কার্যত অসম্ভব।

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূলেরপ্রাপ্ত আসন ২১৫ এবং মোট প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৮৯ লক্ষ ৬৮ হাজার ২৮১। এই সংখ্যা ছিল শতাংশের হিসেবে মোট ভোটের ৪৮. ০২%। বিজেপির ভোট ছিল ২ কোটি ২৯ লক্ষ ৫ হাজার ৪৭৪ এবং শতাংশ গত হিসাবে মোট ভোটের ৩৮. ১৫%। অর্থাৎ প্রায় ১০ শতাংশ (৯. ৮৭%) এবং ভোটের ফারাক প্রায় ৬১ লক্ষ। সুতরাং ৫০ লক্ষের কাছাকাছি ভোটারের নাম বাদ গেলেও এগিয়ে থাকবে তৃণমূল। তবে তাৎপর্যপূর্ণভাবেই বাদ পড়া ভোটাররা যদি সবাই তৃণমূলের ভোটার হয়ে থাকে তাহলে বিজেপি সম্ভাব্য ভোটে তৃণমূলের অনেকটাই কাছাকাছি পৌঁছবে। কিন্তু এই অঙ্কে বিরাট ত্রুটি রয়েছে। কারণ বঙ্গে এস আই আর প্রক্রিয়া চলছে । কেউ জানে না কত লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাবে! এই তথ্য প্রথমে সামনে আসা দরকার  তারপরে বিজেপি বলতে পারে যে তারা তৃণমূলকে ধরে ফেলার পাথেয় পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু তাতেও অংকে ফাঁক থেকে যাবে। কারণ বিজেপি যতই বলুক- ভোটে কারচুপি করে  সব মৃত বা ভুতুড়ে ভোটারের ভোট তৃণমূলের বাক্সে গিয়েছে তা বাস্তবে অসম্ভব। তথ্য কী বলে?

২০২১ সালের বিধানসভা ভোটকে সামনে রাখলে অংক পরিষ্কার। ৬ লক্ষ ভোটারকে বঙ্গের ১ শতাংশ ভোটার ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু এটাও ঘটনা যে, বঙ্গের ২৯৪ টি কেন্দ্রের ২৯২ টি কেন্দ্রে হওয়া ভোটের নিরিখে ৮২. ৩০ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এই ভোটারদের কমবেশি ৪৮ শতাংশ তৃণমূলের বাক্সে আর ৩৮ শতাংশ বিজেপির বাক্সে গিয়েছিল। ১৮ শতাংশ মানুষ ভোটই দেননি। এবং এই ভোটারদের অনেকটাই যে মৃত ভোটার তা ধরে নেওয়া হয়। এস আই আর এ প্রকৃত বা বৈধ ভোটার চয়ন করতে গিয়ে  যাদের নাম বাদ পড়বে তাদের মধ্যে যে এই ১৮ শতাংশ সম্ভাব্য ভোটারের বা অধিকাংশ সম্ভাব্য ভোটারের নাম ছিল না তা বলা একেবারেই সম্ভবপর নয়।

এর বাইরে ও সমীকরণ রয়েছে। গণিতের একটি অধ্যায়  হিসেবে সামনে আনা যেতে পারে মতুয়া ভোটারদের কথা। তারা ভোট দিয়েছেন গত বিধানসভা ভোটেও। তারা ভোট দিয়েছেন ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটেও। তাঁদের সংখ্যা পরিষ্কার জানা না থাকলেও এবং একদা এই সংখ্যা ৩০ লক্ষ বলে মনে করা হলেও শান্তনু ঠাকুর নিজেই বলে থাকেন এই সংখ্যা কয়েক কোটি। এরা উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ লোকসভার চারটি বিধানসভা আসনে নির্ণায়ক ফ্যাক্টর। এরা নদীয়ার অন্তত দুটি লোকসভা কেন্দ্রে, পূর্ব বর্ধমানে, এবং দক্ষিণ ২৪পরগনার একাধিক বিধানসভা আসনে প্রভাব রাখার ক্ষমতা সম্পন্ন। সব মিলিয়ে যদি দেখা যায়, ৩০টির কাছাকাছি বিধানসভা আসনে এদের প্রত্যক্ষ প্রভাব। সুতরাং মতুয়া ভোটারের সংখ্যা খুব একটা কম নয় এবং এই সংখ্যা যে কোনভাবেই ৪৭ লক্ষর কম হবে না বলাই বাহুল্য। এঁদের বিরাট অংশের মানুষ আবার আশঙ্কা করছেন, এস আই আর হলে তাদের দেশ থেকে উৎখাত না হতে হয়! ইতিমধ্যেই স্থানের স্থানে বিজেপির তত্ত্বাবধানে শুরু হয়ে গিয়েছে সিএএ ক্যাম্প। ক্যামেরার সামনে মুখ খুলছেন অনেক ভোটার। বৈধ ভোটার চয়নের ক্ষেত্রে, মতুয়া সমীকরণ ফেলে দেওয়ার নয়। ঠগ বাছতে গিয়ে গাঁ উজাড় হয়ে গেলে, সব ভোটারই যে তৃণমূলের ছিল এই দাবি কার্যত অন্তঃসারশূন্য  মনে হতেই পারে।তবে তার আগে  এসআইআর-এ বঙ্গে বৈধ ভোটারের এবং বাদ যাওয়া ভোটারের তালিকা সামনে আসা দরকার। তবেই বিজেপি না হয় গাণিতিক ভোটের রসায়ন ও সমীকরণের কথা তুলে ধরতে পারে। তবেই না,বিজেপি এসআইআর- এর জোরে বঙ্গ দখলের হুংকার দিতে পারে!

 

About Post Author