পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ১৩ ডিসেম্বর : মেসি ঝড় আর পাগল হাওয়া কলকাতা কেই যেন এলোমেলো করে দিয়েছে শনিবার। কলকাতার সঙ্গে আর্জেন্টিনার যোগাযোগ আজকের নয়। অবসর নেওয়ার পরে মারাদোনা এসেছিলেন, তখনও ঝড় উঠেছিল। তথাপি সংস্কৃতিমনস্ক কলকাতা এবং বাঙালি আর্জেন্টিনাকে চিনেছিল যার সুবাদে তাঁর নাম ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অত্যন্ত কাছের বলে পরিচিত ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো ছিলেন স্প্যানিশ ভাষার সাহিত্যিক। আর্জেন্টিনার বয়েনাস এয়ার্সের বাসিন্দা সাহিত্যিক ছিলেন নারীবাদী আন্দোলনের মুখ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অসুস্থতার সময় সান ইসিদ্র -তে তাঁর বাড়িতে প্রায় দু মাস ছিলেন, সে সময় অন্তত ৩০ টি কবিতা ও একাধিক রচনা সেখানে বসেই লিখেছিলেন। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে দিয়ে আর্জেন্টিনা ও আর্জেন্টিনার সাহিত্যকে চিনেছিল বাঙালি। এবার কলকাতা বইমেলার সঙ্গেও জড়িয়ে থাকছে আর্জেন্টিনা। ফুটবলার লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার সাহিত্য সংস্কৃতি কি আবার স্পর্শ করবে বাঙালিকে?
ফুটবলের বর্তমান প্রজন্মের রাজপুত্র বলা হয় লিওনেল মেসিকে আর ফুটবলের রাজপুত্রর নাম দিয়েগো মারাদোনা। দুজনই তো আর্জেন্টিনার। ফুটবল পাগল বাঙালির রক্তে জড়িয়ে ছিল ব্রাজিল আর সাম্বা ঝড়। মারাদোনার উত্থানের পর থেকেই বাঙালি ভালবাসতে শিখেছে আর্জেন্টিনাকে। মেসি সেই ভালোবাসাকে আরও প্রগাঢ় করেছেন। সেই ভালোবাসা এতটাই তীব্র যে মানুষ এলোমেলো করে দেয় যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনকেও আনন্দ ও আবেগে। সেই আর্জেন্টিনা এবার কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার থিম। ২২ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করুণাময়ীতে ৪৯ তম বইমেলা চলবে। যারা জানেন মেসির সঙ্গে তাঁর বর্তমান ফুটবল ক্লাব মিয়ামি সতীর্থ লুইস সুয়ারেজ কলকাতায় এসেছেন তাঁরা উরুগুয়ের এডুয়ার্দো গালেয়ানো কে হয়তো জানেন না। জানা প্রত্যাশিত নয় ও। এডুয়ার্দো গালেয়ানো একজন উরুগুয়ে তথা লাতিন আমেরিকার প্রখ্যাত সাহিত্যিক। কিন্তু বাঙালি পুস্তকপ্রেমী বলে একদা যে গুঞ্জন ও জনরব ছিল সেই বাঙালি বইপাগলরা যখন করুণাময়ী বইমেলা প্রাঙ্গণে ঢুকবেন তখন তাঁরা আর্জেন্টিনার ও লাতিন আমেরিকার যে সমৃদ্ধ সাহিত্য ঘরানা তাঁর সৌরভ নেবেন তো। যারা আর্জেন্টিনার সাহিত্যিক ও সাহিত্যের পরিমণ্ডলের সুবাস নেবেন বা এ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হবেন তাঁদের জন্য আর্জেন্টিনার সাহিত্য নিয়ে কিছু তথ্য।
আজ থেকে পঞ্চাশ বছর বা তার সামান্য আগে আর্জেন্টিনা ও লাতিন সাহিত্য জগতে ঝড় উঠেছিল যা বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য আন্দোলন ল্যাতিন আমেরিকান বুম বলা হয় , যেখানে আর্জেন্টিনার লেখকরা জাদু বাস্তবতা (magic realism) এবং পরীক্ষামূলক লেখার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন। এই প্রসঙ্গে চার জনের নাম না বললেই নয়।
- হোর্হে লুইস বোর্হেস (Jorge Luis Borges): সর্বকালের সেরা লেখকদের একজন হিসেবে বিবেচিত। তিনি ছোটগল্প, প্রবন্ধ এবং কবিতার জন্য বিখ্যাত। তার কাজের মধ্যে রয়েছে কল্পনা, দর্শন এবং মেটাফিজিক্সের মিশ্রণ। তার বিখ্যাত কাজগুলির মধ্যে রয়েছে “ফিকসিওনেস” (Ficciones) এবং “এল আলেফ” (El Aleph) [1, 2]।
- হুলিও কোর্তাজার (Julio Cortázar): “ল্যাটিন আমেরিকান বুম”-এর একজন প্রধান ব্যক্তি। তিনি তার উদ্ভাবনী এবং বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ করে এমন বর্ণনার জন্য পরিচিত। তার বিখ্যাত উপন্যাস “রায়ুয়েলা” (Rayuela – Hopscotch) এবং ছোটগল্প সংগ্রহ “বেস্টিয়ারিও” (Bestiario) উল্লেখযোগ্য [1, 2]।
- আদোলফো বিওয় কাসারেস (Adolfo Bioy Casares): বোর্হেসের বন্ধু এবং সহযোগী, যিনি কল্পবিজ্ঞান এবং ফ্যান্টাসির উপাদান মিশ্রিত সাহিত্য রচনা করেছেন। তার বিখ্যাত উপন্যাস “লা ইনভেনসিওন দে মোরেল” (La invención de Morel) [1]।
- এস্তেবান এচেভেরিয়া (Esteban Echeverría): গাউচো সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ পথিকৃৎ। তার ছোটগল্প “এল মাটাদেরো” (El matadero) – কে একটি বাস্তববাদী কাজ বলেই ধরা হয়।
এই প্রসঙ্গে গাউচো সাহিত্যের কথা উঠে আসে যা কিনা এটি উনবিংশ শতাব্দীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা যদিও তার প্রভাব বিংশ শতকের শুরুতেও ছিল , যা গাউচো বা রাখালদের (পাম্পাসের কাউবয়/রাখাল) জীবন, ঐতিহ্য এবং সংগ্রামের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এজভেরিয়ার রচনাকল উনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়। তবে বোর্হেস ছিলেন বিংশ শতকের লেখক (১৮৯৯-১৯৮৬) মূলত তাঁর ছোটগল্পের জন্য বেশি বিখ্যাত হলেও একাধারে কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও সাহিত্য সমালোচনা লিখে গেছেন। বোর্হেসকে জানলে আর্জেন্টিনার সাহিত্যের গভীরতা বোঝা যায় যদিও এই সাহিত্যের গভীরতা অতলস্পর্শী। আর্জেন্টিনার সাহিত্য বিকাশ লাভ করেছিল অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতকে, মেসি- মারাদোনার জন্মের বহু আগে কলম দিয়ে ফুল ফুটিয়েছেন আর্জেন্টিনার সাহিত্যের রাজপুত্ররা।।


More Stories
“ইতিহাসের পাতা থেকে” কালজয়ী : সাহিত্যের মণিমুক্তো
এলিয়েন তত্ত্বের আদি প্রবক্তা দানিকেন প্রয়াত
পাখির সংখ্যা কমছে জেলায়