জিমি লাইয়ের সাজা কি হংকং তথা চিনের স্বাধীনতার কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেওয়া? প্রসঙ্গত, সোমবার হংকংয়ের আদালত মিডিয়া টাইকুন ও আপেল ডেইলি-র প্রতিষ্ঠাতা জিমি লাইকে ২০ বছরের সাজা শুনিয়েছে।৭৮ বছর বয়সী জিমি লাইয়ের বার্ধক্য ও স্বাস্থ্যের অবনতির কারণে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং তার পরিবারের সদস্যরা এই সাজাকে কার্যত মৃত্যুদণ্ড হিসেবেই দেখছেন।কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) জানিয়েছে, এই রায় হংকংয়ের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার শামিল। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশ প্রতিবাদে মুখর হয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেত কুপার এই বিচারকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” এবং সাজাকে “অমানবিক” আখ্যা দিয়ে তার অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেছেন।মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে একটি “অন্যায্য ও দুঃখজনক অধ্যায়” বলে বর্ণনা করেছেন। ইউরোপিয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এই সাজাকে হংকংয়ের মৌলিক স্বাধীনতা এবং বিচারবিভাগীয় স্বাধীনতার পতনের একটি প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জিমি লাইয়ের পুত্র সেবাস্তিয়ান লাই এই রায়কে “ভয়াবহ” এবং হংকংয়ের আইনি ব্যবস্থার ধ্বংসের প্রতীক বলে মন্তব্য করেছেন।
চিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে, স্বভাবসিদ্ধভাবে যাবতীয় সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, হংকংয়ের আদালত আইন অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব পালন করেছে এবং জিমি লাই তার “বিদ্বেষপূর্ণ কর্মকাণ্ডের” জন্য কঠোর সাজার যোগ্য।চিন কেন এই মন্তব্য করেছে? অতীতের দিকে তাকানো যাক।
জিমি লাইয়ের সংবাদ মাধ্যম : ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
১৯৮৯ সালের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের বিক্ষোভ ও গণহত্যার কারণে , লাই গণতন্ত্রের একজন সমর্থক এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারের সমালোচক হয়ে ওঠেন। ১৯৯০ সালে, তিনি নেক্সট ম্যাগাজিন প্রকাশ শুরু করেন , যা ট্যাবলয়েড চাঞ্চল্যকরতা এবং কঠোর রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রতিবেদনের সমন্বয় ঘটায়। তিনি অন্যান্য একাধিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন, যার মধ্যে রয়েছে সাডেন উইকলি।
১৯৯৫ সালে, হংকং হস্তান্তরের সময় ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে, লাই অ্যাপল ডেইলি প্রতিষ্ঠা করেন , ১৯৯৭ সালের মধ্যে সংবাদপত্রের প্রচার ৪০০,০০০ কপিতে লাইয়ের মতে, তিনি অ্যাপল ডেইলির মাধ্যমে হংকংয়ে বাকস্বাধীনতা বজায় রাখার আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন । গণতন্ত্র প্রচারের পাশাপাশি, লাইয়ের প্রকাশনাগুলি প্রায়শই সহকর্মী হংকংয়ের প্রশাসনিক দুর্বলতা প্রকাশ করে তাদের ভিত নাড়িয়ে দেয়।
হংকং : পাল্টে যাওয়া দেশ, সময় ও আইন
দ্রুত সময় পাল্টাতে থাকে। ১৯৯৭ সালের ১ জুলাই মধ্যরাতে ১৫৬ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে হংকং-এর সার্বভৌমত্ব গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং এক দেশ দুই ব্যবস্থা চালু হয়। অতীতের হংকং আর বর্তমান হংকং এর মধ্যে আসমান জমিন ফারাক দেখা যেতে শুরু করে। স্বাভাবিকভাবেই চিন তাদের সমালোচনা শুনতে রাজি ছিল না। তাদের শাসনের অধীন হংকংয়ে বসে জনৈক জিমি লাই তাদের গণতন্ত্র ও স্বাধীন অধিকার না থাকার সমালোচনা করবে এরকম বিষয় চিন মানতে রাজি ছিল না। জিমি লাইয়ের প্রতি রুষ্ট চিন সরকার ব্যবস্থা নিতে চাইছিল। জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারি হতেই চিন জিমি লাইয়ের প্রতি তাদের প্রতিহিংসার পূর্ণ রূপায়ণ ঘটায়।
প্রসঙ্গত, ২০২০ সালে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (National Security Law) জারির পর থেকে হংকং পুলিশ প্রশাসন সরাসরি চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি ও নির্দেশনার অধীনে কাজ করতে শুরু করে । যদিও হংকংয়ের নিজস্ব পুলিশ বাহিনী রয়েছে, তবে এখন তা চীনের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় বেইজিংয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। ২০২০ সালের অগাস্ট মাসে গ্রেপ্তার হয়ে যান ব্রিটিশ নাগরিক জিমি লাই।
শিব ঠাকুরের আপন দেশে, আইন কানুন সর্বনেশে
চিন অভিযোগ করে এসেছে যে, জিমি লাই প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের প্ররোচনায় বা তাদের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ করেন বেইজিংয়ের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিদেশি শক্তির “দাবার গুটি” হিসেবে হংকংয়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। জিমি লাইয়ের বিদেশি শক্তির সঙ্গে আঁতাত নিয়ে চিনের অভিযোগ ছিল যে, লাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের (যেমন প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও) সঙ্গে বৈঠক করে চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য প্ররোচিত করেছেন। চিনা সরকার মনে করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিগুলো লাইয়ের মাধ্যমে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। বেইজিংয়ের মতে, লাই তার গণমাধ্যম ‘অ্যাপল ডেইলি’-কে ব্যবহার করে বিদেশি দেশগুলোকে হংকং ও চীনের বিরুদ্ধে বৈরী আচরণ করতে প্ররোচনা দিয়েছেন।উপরোক্ত অভিযোগ গুলির সত্যতা থাকুক বা না থাকুক, প্রমাণ থাকুক না থাকুক, চিন সরকারের দমন নীতি, ১৯৮৯ সালের ৪ জুন তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে আমানবিক গণহত্যার কট্টর সমালোচক ও রাষ্ট্রযন্ত্রের দমন -পীড়ন এবং চিনে গণতন্ত্র না থাকার অভিযোগে মুখর জিমি লাইয়ের শাস্তি অবধারিত ছিল। শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা ছিল। ফলে পাঁচ বছরের বেশি কারাবন্দি থাকা জিমি লাইয়ের কুড়ি বছরের কারাদণ্ড কার্যত মৃত্যুদণ্ড হয়ে দেখা দেয়।।
More Stories
কেন ব্রিকস সম্মেলনে ডিনার ঘিরে চর্চা ও বিতর্ক?
নিজের ওজনের চেয়ে তিনগুন ওজন তুলে রেকর্ড জলপাইগুড়ির কেয়ার
নেপালে হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে