সময় কলকাতা, ২৩ জুন : তৃণমূলের আর পাঁচজনের মতো নন ,অনেকের থেকে স্বতন্ত্র তিনি। তিনি শিবির এবং অবস্থান পাল্টান নি । ভেঙে টুকরো-টুকরো হওয়া একটি দলে হতোদ্যম না হয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়া একজন রাজনৈতিক নেতাকে দমিয়ে রাখতে হিমশিম খাওয়ার জোগাড় বিরোধীদের । তবুও তিনি বিরোধীদের কাছেই প্রশংসিত। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁকে, সেই একক বলে বলীয়ান কুণাল ঘোষকে বলার সময় করে দিচ্ছেন। বিধানসভার বাইরেও বিজেপি নেতারা তাঁর প্রশংসায় মুখর।
গণতন্ত্রে যে বিরোধী রাজনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলাবাহুল্য। অথচ রাজ্যে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি চুরমার । কয়েকদিন আগেও যে তৃণমূল বঙ্গে ক্ষমতায় ছিল তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে এখন ভেঙে খানখান। মমতাপন্থী শিবিরের বিধায়ক ও সাংসদের সংখ্যা হাতেগোনা। দেশ ও রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে খণ্ড-খণ্ড হওয়া তৃণমূলের নেতা নেত্রীরা টিমটিম করে জ্বলছেন তথাপি এঁদের মধ্যে গুটিকয়েক নেতা-নেত্রী রাজনীতির ময়দানে সুচাগ্র মেদিনী ছাড়তে নারাজ। রাজ্য রাজনীতিতে এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মুখ কুণাল ঘোষ। রাজ্যে এবং সংসদে যখন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মহুয়া মৈত্র লড়াই করছেন তখন রাজ্যে একা কুম্ভ হয়ে লড়ছেন তিনি। বিধানসভা তেও পাশে নামেমাত্র দু-একজনকে নিয়ে একাই লড়ছেন কুণাল । তিনি নিজে এই লড়াইকে মহাভারতের পঞ্চপান্ডবের যুদ্ধ বলেই অভিহিত করেছেন। মঙ্গলবার বিধানসভা অধিবেশনে বেলেঘাটার বিধায়ক আরও একবার বুঝিয়ে দিলেন, তিনি একাই লড়তে জানেন ও পারেন।
মঙ্গলবার (২৩ জুন, ২০২৬) ছিল বিধানসভা অধিবেশনের ষষ্ঠতম দিন। বাজেট মহুয়া মৈত্র অধিবেশনের পরে এই দিনটিতে রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি এবং বাজেট বরাদ্দ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলে।এরমধ্যে কুণাল একাই ঝোড়ো ব্যাটিং করে আসর মাত করে রাখেন। তিনি মমতা পন্থী বিধায়কদের হয়ে বলেন পান্ডবরা পাঁচজন ছিল, কৌরবরা একশো জন ছিল তবুও কৌরবরা বাঁচেনি। তিনি এও বলেছেন, ২৭০ জন বিজেপি এবং বিজেপির স্পনসর্ড বিধায়ক রয়েছেন তবুও পঞ্চপাণ্ডবের লড়াই তিনি চালিয়ে যাবেন। তাঁকে তার নির্ধারিত কুড়ি মিনিটের বক্তব্য দিতে প্রথম থেকেই বাধা দেওয়া হয় এবং চোর, চোর ধ্বনি ওঠে। অকুতোভয় কুণাল প্রায় সাথে সাথে নারদা কাণ্ডের তালিকা তুলে ধরার হুঙ্কার ছাড়েন অর্থাৎ পরোক্ষে শুভেন্দু অধিকারী কে আক্রমণ করতে তিনি ছাড়েন নি। বাধাদানকারী বিজেপি বিধায়কদের থামাতে মেসি কন্ডে মাঠে দেখতে পাওয়া অশোক দিন্দাকে তিনি নিশানা করেন। তাঁর যাবতীয় আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিলেন বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। ঋতব্রতকে তিনি ধর্ষন কাণ্ডে অভিযুক্ত বলে আখ্যা দিয়ে বিরোধী দলনেতার মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। শুভেন্দু অধিকারীকে তিনি এই প্রসঙ্গে বলেন, যাদের বিরুদ্ধে যে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তাঁকে তাঁর স্বাগত জানাতে বাধা নেই কিন্তু তৃণমূল থেকে বিজেপি শিবিরে পা বাড়িয়ে থাকা একজন বিধায়ক কেও যেন না ছাড়া হয়। তার চাঁদমারি ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা তৃণমূল বিধায়কদের বিরুদ্ধে। কুণাল আগেও বলেছেন, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই তো হবেই, কিন্তু প্রথমে লড়তে হবে দলের মধ্যে থাকা সেই বিধায়কদের বিরুদ্ধে যারা সুযোগ পেলে মাকে ছুরি মারতে ছাড়বেনা। তাই এদিন পরিষদীয় অধিবেশনে তিনি বিদ্রোহী তৃণমূলের প্রসঙ্গে বলেছেন, “একটাকেও যেন না ছাড়া হয়!” আশ্চর্যজনকভাবে বিজেপি ও বিদ্রোহী তৃণমূলদের একযোগে নিশানা করছেন , তবুও বিরোধীদের প্রশংসা পাচ্ছেন কুণাল ঘোষ। কিন্তু কেন?
বিধানসভা অধিবেশনের এই দিনটিতে তৃণমূলের একাধিক বিধায়ক বক্তব্য রাখতে উঠেও বিজেপিকে বেঁধেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সুজাপুরের তৃণমূল বিধায়ক সাবিনা ইয়াসিমিন। তিনি সোরাবর্দি সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে বিভ্রান্ত বিজেপিকে আক্রমণ করে বলেন, একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের হওয়ার জন্য একটি রাস্তার নাম পাল্টে ফেলা হল। ঋতব্রত-ব্লক বিজেপির বিরুদ্ধে কিছুক্ষেত্রে বক্তব্য রাখলেও মমতাপন্থী কুণাল, আলিফাদের অবস্থান ছিল চোখে পড়ার মত। ঋতব্রত যখন বিধানসভায় থেকেও অভিষেককে বিঁধছেন তখন তৃণমূলের অধিকাংশ বিধায়ক নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেননি বা চাননি। দেগঙ্গার তৃণমূল বিধায়ক আনিসুর রহমান বিদেশ এদিন সজল ঘোষের টিপ্পনির উত্তরে জানিয়েছেন তিনি জোড়া ফুলের তৃণমূল। আনিসুর রহমান বিদেশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উচ্চারণ করেননি। আর এখানেই স্বতন্ত্র কুণাল ঘোষ। তিনি বারবার বলছেন দলনেত্রীর হয়ে তিনি লড়াই চালাবেন।
একদা দলে মর্যাদা না পাওয়া কুণাল ঘোষ যে এভাবে লড়তে পারছেন তার প্রেক্ষাপট খুঁজতে হবে পিছিয়ে যেতে হবে এক যুগ আগে। উল্লেখযোগ্যভাবে কুণাল ঘোষকে গ্রেফতার করেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি। জেল থেকে বেরিয়ে এসে তৃণমূলের মধ্যে থেকেও তৃণমূলের বিরুদ্ধে সংশোধনপন্থী কথা বলেছেন এবং একাই লড়ে গিয়েছেন রাজীব কুমারের বিরুদ্ধে। তিনি চ্যালেঞ্জ করেছিলেন রাজীব কুমার কে তার সঙ্গে এক টেবিলে বসানো হোক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, কুণাল ঘোষ লড়তে জানেন, একাই লড়তে জানেন, যে লড়াই তার মজ্জাগত। সারদা কাণ্ড তাঁকে আরও স্থিতধী করেছে বলেই ব্যাখ্যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। হাজার কটুক্তি বা আক্রমণেও তাকে দমানো যাবে না তা তিনি প্রমাণ করেছেন। সারা বঙ্গে ডিমথেরাপিতে যখন তৃণমূল নেতাদের মধ্যে ত্রাহিত্রাহি রব, তখন কুণাল ঘোষ ডিম নিক্ষেপকারীদের আইনের আশ্রয় নিয়ে জেলে পাঠিয়েছেন।
সর্বোপরি,এখন তিনি নিঃসঙ্গ নন তা তিনি জানেন, তাঁর সঙ্গে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের কিছু বিধায়ক ও তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা আর তাতেই ভরসা করে সংসদে কল্যাণ -মহুয়াদের মতো তিনিও বিধানসভায় লড়ছেন। সাধে কি শুভেন্দু ঘনিষ্ঠ নন্দীগ্রামের বিজেপি নেতা প্রলয় পাল কল্যান বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি কুণাল ঘোষকেও তাঁর বিরোধী কণ্ঠস্বরের জন্য শ্রদ্ধা জানিয়েছেন! তার বিরুদ্ধে বিতর্ক থাকলেও পূর্ব মেদিনীপুরের বিজেপি নেতা প্রলয় পাল বলেছেন, গণতন্ত্রে বিরোধিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর এজন্যই তৃণমূলের দুঃসময়ে সাধুবাদপ্রাপ্য কল্যাণের মতো কুণাল ঘোষের।


More Stories
চমকে দিয়ে ভারতীয় ফুটবলাররা আটকে দিল বিশ্বকাপ খেলে আসা পানামাকে
বিশ্বকাপের দল পানামার বিরুদ্ধে এগিয়ে ভারত
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল কেস এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দাবি অধীরের