Home » আমার দুর্গা : টোটোচালিকা ময়নাগুড়ির ঋতু

আমার দুর্গা : টোটোচালিকা ময়নাগুড়ির ঋতু

সানি রায়, সময় কলকাতা, ১৯ জুলাই : কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত লিখেছিলেন, “আমার দুর্গা ত্রিশূল ধরেছে স্বর্গে এবং মর্ত্যে/ আমার দুর্গা বাঁচতে শিখেছে নিজেই নিজের শর্তে।” দুর্গা ছড়িয়ে আছে বঙ্গের গ্রামে-শহরে,নগরে-প্রান্তরে। উত্তরবঙ্গের ঋতু এরকমই এক দুর্গা।  হয়তো হতে পারত সে পাইলট, সেই স্বপ্ন বিসর্জন দিলেও  আকাশে  টোটোচালিকা ময়নাগুড়ির ঋতু রায়ের উড়ান সংসারের পাইলট হয়ে। বইয়ের ব্যাগ ছেড়ে টোটোর স্টিয়ারিংয়ে মাধ্যমিক পড়ুয়া ঋতু, বাবার অসুস্থতায় কাঁধে সাতজনের সংসার। উত্তরবঙ্গের অনন্যা টোটোচালিকা ময়নাগুড়ির ঋতু  সাধারণ মেয়ে হয়েও মর্তের দুর্গা।

বই-খাতার পাতায় যেখানে সোনালী স্বপ্নের গল্প লেখার কথা ছিল, ভাগ্য সেখানে জুড়ে দিয়েছে এক নিষ্ঠুর লড়াইয়ের নির্মম অধ্যায়। ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস, যে কোমল হাত দুটিতে থাকার কথা ছিল কেবলই স্কুলের বই, সেই অবোধ হাত দুটি আজ এক বুক কান্না আর চরম অভাবের তাড়নায় চেপে ধরেছে টোটোর স্টিয়ারিং। সদ্য মাধ্যমিক দেওয়া কিশোরী ঋতু রায়ের জীবন আজ এক চরম ট্র্যাজেডি।প্যারালাইসিসের নিষ্ঠুর থাবায় বাবা রবিন রায়ের একটি হাত আজ অসাড়, নিথর। যে বাবা একসময় পুরো সংসারের মুখে অন্ন জোগাতেন, আজ তিনি অসহায়, পঙ্গু হয়ে বিছানায় ছটফট করছেন। বাবার এই করুণ দশা দেখে চোখের জল মুছে, নিজের সমস্ত শৈশব-কৈশোরকে বিসর্জন দিয়ে রাস্তায় নেমেছে এই একরত্তি মেয়েটি। ভোর হওয়ার আগেই, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ থাকে, তখন থেকেই শুরু হয় ঋতুর অন্তহীন বেঁচে থাকার সংগ্রাম। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি আর অপলক ক্লান্তিতে টোটো চালিয়ে যা সামান্য উপার্জন হয়, তা দিয়েই কোনোমতে টিকে আছে সাত-সাতটি প্রাণ।দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল ফুরিয়ে রাত ক্লান্ত শরীরে যখন বিশ্রামের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই, তখনও ফুরিয়ে যায় না তার লড়াই। রাতে বাড়ি ফিরে চোখের পাতা যখন ঘুমে ঢুলে আসে, তখন প্রদীপের আবছা আলোয় বই খুলে বসে সে। চোখের জল আর কালির অক্ষরে একাকার হয়ে যায় তার পড়াশোনা। এই বয়সেই এক বুক হাহাকার আর নিয়তির চরম নির্মমতাকে সঙ্গী করে এক বুক কান্না চেপে টোটোর চাকার সাথে ঘুরছে ঋতুর জীবনের করুণ চাকা। জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি ব্লকের ঝাবরা মানি এলাকার এই ঋতুর জীবন যুদ্ধ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার। প্রতিদিন তার যুদ্ধ, যুদ্ধজয় তার রোজনামচা।

About Post Author