সানি রায়, সময় কলকাতা, ২৭ জুলাই : “অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো/সেই তো তোমার আলো “…জঙ্গলে ঘেরা এক জনপদ যেখানে বছরভর আলোর রোশনাই তবুও এই আলোকোজ্জ্বল উৎসবের মর্মকথা অস্তিত্বের সংগ্রাম। বর্ণাঢ্য আলোকমালার অন্তরে লুকিয়ে রয়েছে আত্মরক্ষার রোজনামচা। জনপদের মানুষ আর জঙ্গলের গজরাজের বলয়ে আশ্চর্য যাপনকথাকে জড়িয়ে ধরেছে দীপাবলির উৎসব। জঙ্গলের রাজকীয় হাতি জনপদে যেন অশুভ বার্তা বয়ে না আনে তার আবাহন চলে দীপাবলির মধ্যে দিয়ে। “সকল দ্বন্দ্ববিরোধ ” সরে যায় আলোকবর্তিতায়…

উত্তরের এক জনপদে এমন এক অদ্ভুত গ্রাম রয়েছে, যেখানে বছরের ৩৬৫ দিনই দীপাবলি পালন করা হয়! শুনে অবাক লাগলেও, এটাই চরম সত্য।দিনের আলোয় আর পাঁচটা সাধারণ গ্রামের মতোই কেটে যায় এখানকার জীবনযাত্রা। নিত্যদিনের কাজ, নিয়মকানুন থেকে ব্যস্ততা সবই থাকে স্বাভাবিক। তবে আসল জাদুটা শুরু হয় সূর্য ডোবার পর। সন্ধ্যে নামতেই পুরো গ্রামের ভোল বদলে যায়। চারপাশ সেজে ওঠে রকমারি আলোর রোশনাইয়ে।আপনি যখনই এই গ্রামের রাস্তায় পা রাখবেন, দু’ধারের রঙিন আলোর ঝলকানি আপনার চোখ জুড়িয়ে দেবে। শুধু বাড়িঘরই নয়, চারিদিকের ফসলি জমিও ঢেকে যায় আলোর চাদরে। সাধারণ মানুষের ঘরে যেমন বছরের নির্দিষ্ট একটা দিনে আলোর উৎসব দীপাবলি উদযাপিত হয়, এই গ্রামে ঠিক সেই চেনা ছবিটাই ধরা পড়ে বছরের প্রতিটি রাতে। তবে এই অবাক করা চোখ ধাঁধানো দৃশ্যের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘ এক জীবন সংগ্রামের ইতিহাস। যা বহন করে চলেছে গোটা গ্রামের মানুষের তীব্র দুঃখ যন্ত্রণা বেদনার ছবি ।যার শেষ যে কোথায় কোন উত্তর হয়তো গ্রামবাসীদের কাছে নেই।
আসুন এই গ্রামের অদ্ভুত জীবনযাত্রার পেছনের আসল সত্যটি জেনে নেওয়া যাক। ১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সুপারস্টার রাজেশ খান্নার জনপ্রিয় সিনেমা ‘হাতি মেরে সাথী’-র কথা নিশ্চয়ই আমাদের সবার মনে আছে। এক বন্যপ্রাণের সঙ্গে মানুষের যে কতটা নিবিড় ও আবেগঘন সম্পর্ক হতে পারে, সেই ছবি তা রূপালি পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছিল। মানুষের সঙ্গে পশুপাখির সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার সেই রূপকথা অবশ্য এই গ্রামে এলে কাঁচের টুকরোর মতো চুরমার হয়ে যাবে। মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক কেন এই বৈপরীত্য? তবে এর উত্তরও জলের মতোই পরিষ্কার, যা এই গ্রামে পা রাখলেই আপনি নিজে অনুধাবন করতে পারবেন।
উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি বন বিভাগের মোরাঘাট রেঞ্জ সংলগ্ন গ্রাম গারখুটা। বনের শুকনো জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ এবং কৃষিকাজই এই গ্রামের বাসিন্দাদের প্রধান জীবিকা। তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে এই গ্রামের চিত্র অনেকটাই বদলেছে। গ্রামের বহু শিক্ষিত যুবক আজ ভারতীয় সেনাবাহিনী, শিক্ষা ক্ষেত্র এবং বিভিন্ন সরকারি উচ্চপদে নিযুক্ত রয়েছেন।আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামটি আজ আর পিছিয়ে নেই। এখানে রয়েছে একটি সুসজ্জিত প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং একটি ঐতিহ্যবাহী ক্লাব। এক কথায়, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও জীবনযাত্রার মানদণ্ডে এই গ্রামটি কোনো শহরের চেয়ে কম নয়।
সন্ধ্যা নামতেই গ্রামটি যেন এক অভিশপ্ত জনপদে পরিণত হয়। বন্য হাতি আর মানুষের লড়াই এখানকার নিত্যদিনের বাস্তব। “এই বুঝি হাতি ঢুকে পড়ল!” স্বাধীনতার পর থেকেই এই এক আতঙ্ক তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে গ্রামবাসীদের।কাছের জঙ্গল থেকে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় হাতির দল লোকালয়ে হানা দেয়। হাতির আক্রমণে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। গ্রামে ঢুকেই তারা প্রথমে বাড়িঘর ভাঙচুর করে এবং ঘরে রাখা খাবার দাবার নষ্ট করে। শুধু তাই নয়, গ্রামবাসীদের উপার্জনের একমাত্র উপায় কৃষিজমি নিমেষের মধ্যে তছনছ করে দেয় এই হাতির দল। অসহায় মানুষগুলোর তখন চিৎকার করা, মশাল জ্বালানো কিংবা ঘরের বেড়া পিটিয়ে আওয়াজ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। এই আপ্রাণ চেষ্টার মাধ্যমেই তারা হাতিকে পুনরায় জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এলাকার বন্যপ্রাণীদের নিরাপদে জঙ্গলে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য বনদপ্তরের মাত্র একটি ওয়াইল্ডলাইফ স্কোয়াড রয়েছে। সমগ্র রেঞ্জের তুলনায় বনকর্মী এবং হাতি তাড়ানোর গাড়ির সংখ্যা বেশ কম হওয়ায়, বনদপ্তরকে বন্যপ্রাণী তাড়াতে চরম বেগ পেতে হয়। এর ফলে লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর হামলায় বারবার মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং বনদপ্তরের বিরুদ্ধে দফায় দফায় বিক্ষোভ-আন্দোলন গড়ে উঠেছে। একদিকে যেমন গ্রামবাসীদের ক্ষোভ রয়েছে, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে বনদপ্তরের কড়া নিয়মকানুন। অনেক জায়গায় হাতি যাতে সহজে গ্রামে ঢুকতে না পারে, সেজন্য গ্রামবাসীরা জিআই (গুনা) তারে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে রাখেন। তবে এতে বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর ঝুঁকি প্রবল থাকায়, বনদপ্তর গ্রামবাসীদের এই পদ্ধতি ব্যবহারের অনুমতি কোনোভাবেই দেয় না।

গ্রামবাসীদের দাবি,বছরের অন্য সময়ে হাতির উপদ্রব থাকলেও, কয়েক বছর আগে পর্যন্ত দীপাবলির সময়ে গ্রামে হাতির আনাগোনা বেশ কমে যেত। কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, দীপাবলিতে ব্যবহৃত রঙিন টুনি বাল্বের রোশনাইকে হাতিরা ভয় পায়। আলোর এই কার্যকারিতাকে কাজে লাগিয়ে গ্রামবাসীরা বাঁচার নতুন উপায় খুঁজে পান। তাঁরা একজোট হয়ে নিজেদের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট এবং কৃষিজমির চারপাশ রঙিন আলো দিয়ে মুড়ে ফেলতে শুরু করেন, যা এখন হাতি তাড়ানোর একটি স্থায়ী ও সম্মিলিত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।জলপাইগুড়ি জেলার ধুপগুড়ি ব্লকের ঝাড় আলতা ২ নং গ্রাম পঞ্চায়েতের গারখুঁটা গ্রামে হাতি রুখতে এক অভিনব ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। গোটা গ্রামের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে বাঁশ মাটিতে পুঁতে প্রথমে জিআই তার দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। সেই তারে ৫ ইঞ্চি পরপর ধুপগুড়ি শহরের ইলেকট্রনিক্স দোকান থেকে আনা ছোট ছোট টুনি বাল্ব লাগানো হয়েছে। পরিত্যক্ত মোবাইলের ব্যাটারি, ইউপিএস বা সামান্য কম ভোল্টেজের ব্যাটারিকে কাজে লাগিয়ে সন্ধ্যা থেকে পরদিন ভোর পর্যন্ত এই আলো জ্বালিয়ে রাখা হয়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন গোটা গ্রাম আলোর উৎসবে মেতে উঠেছে, যা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। তবে এই আলোর আয়োজন দীপাবলি পালনের জন্য নয়, বরং হাতির সঙ্গে গ্রামবাসীদের নিত্যদিনের খণ্ডযুদ্ধের উপশম খোঁজার এক মরিয়া চেষ্টা।গ্রামবাসীদের মতে, আলোর এই ব্যবস্থায় হাতির উপদ্রব কিছুটা কমলেও আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি। ঝলমলে আলোর রোশনাইয়ের আড়ালে গারখুঁটা গ্রামের অসহায় মানুষগুলোর মূল সমস্যা আজও অন্ধকারেই নিমজ্জিত। এই গ্রামের মানুষগুলোর জীবনের এই অন্ধকারময় সময়টা স্থায়ীভাবে কবে আলোকিত হবে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে সবাই।।


More Stories
মুখ্যমন্ত্রীর আসন্ন জল্পেশ মন্দির সফর ঘিরে চলছে হেলিপ্যাড তৈরির কাজ
ফাঁদে চিতা বাঘ, স্বস্তি চা- বাগানে
গোহত্যা আইন ভেঙে জলপাইগুড়িতে আটক ১