সানি রায়, সময় কলকাতা : পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং ক্রমবর্ধমান পর্যটন উচ্ছ্বাসের মধ্যেও বন্যপ্রাণ নিয়ে আশঙ্কা। খুলতে চলেছে মূর্তি ব্রিজ, পর্যটনশিল্পে জোয়ার আসার সম্ভাবনা। পর্যটনের নতুন সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েও পরিবেশ কর্মীদের দাবি বন্যকর্মী সংরক্ষণে সেফটি প্ল্যানের। পর্যটনশিল্প ও বন্যপ্রাণ নিরাপত্তা -দুয়ের মেলবন্ধন নিয়ে প্রশ্ন।পর্যটন সম্ভবনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বন্যপ্রাণ। প্রশ্ন পর্যটন বিকাশের ধাক্কায় পরিবেশ ভাবনা আহত হবে না তো? নাকি একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠবে বন্যপ্রাণের রক্ষাকবচে?
মূর্তি নদীর উপর কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সেতু খুলে দেওয়ার অপেক্ষায়। পূজার আগেই পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা ঘিরে ডুয়ার্স জুড়ে বাড়ছে উচ্ছ্বাস। তবে সেতু চালু হলে জঙ্গলের মধ্যে যানবাহনের গতি এবং পর্যটকদের ভিড় বাড়ার আশঙ্কায় পরিবেশ ও পশুপ্রেমীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। ডুয়ার্সের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র মূর্তি। একদিকে ঘন জঙ্গল, অন্যদিকে মূর্তি নদীর স্বচ্ছ জল ও স্রোতের শব্দ প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের টানে সারা বছরই এখানে পর্যটকদের আনাগোনা লেগে থাকে। এবার সেই পর্যটন কেন্দ্রেই যুক্ত হতে চলেছে নতুন আকর্ষণ। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পূর্ত দফতরের উদ্যোগে মূর্তি নদীর উপর নির্মিত হয়েছে আধুনিক নকশার ঝকঝকে নতুন সেতু। সূত্রের খবর, পূজার আগেই সেতুটি সাধারণ পর্যটক ও যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হতে পারে।

বর্তমানে প্রশাসনের তরফে সেতুর রাস্তা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সেতু খুলে গেলে মূর্তিতে পর্যটকদের ভিড় আরও কয়েকগুণ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। কারণ, এই সেতু দিয়ে গরুমারা ও চাপরামারির মতো গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গল এলাকায় যাতায়াতের পথও অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে। প্রায় চার-পাঁচ বছর ধরে মূর্তি নদীর উপর পুরনো লোহার সেতুটি ভেঙে নতুন সেতু নির্মাণের কাজ চলায় এই পথে যান চলাচল বন্ধ ছিল। সেই সময়ে জঙ্গলপথে মানুষের আনাগোনা কমে যাওয়ায় বন্যপ্রাণীদের অবাধ বিচরণও চোখে পড়েছে। হাতি, বাইসন, গন্ডার, চিতাবাঘ, অজগর-সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি এই জঙ্গলপথে নতুন কিছু নয়।
নতুন সেতুটি আগের তুলনায় অনেক বেশি চওড়া ও উঁচু। ফলে বড় গাড়ি চলাচলের পাশাপাশি যানবাহনের গতি বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। আর এখানেই মূল উদ্বেগ পরিবেশপ্রেমীদের। তাঁদের আশঙ্কা, জঙ্গলের মধ্যে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল বাড়লে বন্যপ্রাণীর সঙ্গে গাড়ির সংঘর্ষের সম্ভাবনাও বাড়বে।
স্থানীয় পরিবেশকর্মী সুমন চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে ডুয়ার্সের বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করে আসছেন। তাঁর মতে, নতুন সেতু নির্মাণ অবশ্যই এলাকার যোগাযোগ ও পর্যটনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু সেতু চালু করার আগে বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এই কারণেই মূর্তি ব্রিজে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যেই মেটলি ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের দফতরে ডেপুটেশন দিয়ে সেতু খুলে দেওয়ার আগেই হাইট বার বসানো, পর্যাপ্ত চেকিং পোস্ট তৈরি এবং প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়েছে সুমন বাবুর তরফে।
সুমন বাবুর আরও বক্তব্য, খুনিয়া মোড় হয়ে এই সেতু ব্যবহার করে জঙ্গলপথে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছনোর সুযোগ তৈরি হবে। ফলে পর্যটন মরশুমে গাড়ির সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বেপরোয়া গতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, এই নতুন সেতু শুধু পর্যটনের ক্ষেত্রেই নয়, কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। খুনিয়া মোড় থেকে পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে যাওয়ার পথে এটি একটি শর্টকাট রুট হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বড় আকারের যানবাহন চলাচল এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সব মিলিয়ে নতুন সেতু ঘিরে ডুয়ার্সবাসীর প্রত্যাশা তুঙ্গে। পূজার আগে সেতু খুলে গেলে পর্যটকদের ঢল নামার পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরাঁ, গাড়ি পরিষেবা ও অন্যান্য পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষও লাভবান হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পর্যটনের এই নতুন দরজা যেন ডুয়ার্সের বন্যপ্রাণীদের জন্য বিপদের দরজা না হয়ে ওঠে এখন সেটাই পরিবেশপ্রেমীদের মূল দাবি।
পর্যটনশিল্প ও বন্যপ্রাণ নিরাপত্তা – এই দুয়ের মেলবন্ধন নিয়ে ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। পর্যটন শিল্পের বিকাশের স্বপ্নে সেতু খোলার অপেক্ষায় পর্যটন ব্যবসায়ীরা, আর তার আগেই বন্যপ্রাণী সুরক্ষার ‘সেফটি প্ল্যান’ চাইছেন পরিবেশকর্মীরা। এখন দেখার উভয়ের মেলবন্ধন কতটা বাস্তবমুখী হয়ে ওঠে। সংঘাতহীনভাবে পরিবেশ ও পর্যটন ভাবনা কোন খাতে বয়ে চলে তা সময়-ই বলবে।


More Stories
কেন টিউশন পড়াচ্ছেন? বেকার গৃহশিক্ষককে আইনি নোটিশ
অমিত শাহ এলেন, পাহাড় সমস্যা নিয়ে কী আলোচনা হল,সমাধান কবে?
চা বলয়ে রাস্তা বেহাল, নির্বিকার প্রশাসন