সানি রায়, সময় কলকাতা : অসম ভাসছে, মানুষ বড় কাঁদছে। মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে দরকার মানবিক সাহায্য আর ভালোবাসা জড়ানো হাত।সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে মানবতার হাত, অসমের বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়ালেন উত্তরবঙ্গের দম্পতি।
একদিকে ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত অসম। চারদিকে জল, ভেসে গিয়েছে ঘরবাড়ি, নষ্ট হয়েছে রান্নাঘর। ত্রাণের তালিকায় খাবার, পোশাক, পানীয় জল কিংবা ওষুধ থাকলেও বন্যাকবলিত বহু পরিবারের কাছে রান্না করার জ্বালানিটুকুও ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে অসমের বন্যা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার অনন্য নজির গড়লেন উত্তরবঙ্গের এক দম্পতি। অসম রাইফেলসের এক জওয়ান এবং তাঁর স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রী একটি শিলিগুড়ি ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁদের বার্তা একটাই দুর্যোগের সময়ে মানবতার কোনও সীমানা হয় না। ত্রাণের প্রথম পর্যায়ে ওই দম্পতি বন্যা কবলিত মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিলেন খাদ্যসামগ্রী, পোশাক, পানীয় জল, ওষুধ-সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সামগ্রী। কিন্তু পরে তাঁরা বুঝতে পারেন, বহু পরিবারের কাছে চাল-ডাল থাকলেও রান্না করার কোনও ব্যবস্থা নেই। বন্যার জলে ভেসে গিয়েছে রান্নাঘর, নষ্ট হয়েছে চুলা এবং দেখা দিয়েছে রান্নার জ্বালানির তীব্র সংকট।
সমস্যার গুরুত্ব বুঝে দ্বিতীয় দফায় ফের ত্রাণ নিয়ে অসমে পৌঁছন তাঁরা। এবার তাঁদের সঙ্গে ছিল ৯০টি এলপিজি সিলিন্ডার ও রান্নার বার্নার। শিবসাগর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের নিমাজান, নাজিরা এবং লিগিরিপুখুরি এলাকার বন্যাদুর্গত পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় সেগুলি। পাশাপাশি বিতরণ করা হয় রান্নার বাসনপত্র, চটি এবং নতুন পোশাক।
অসম রাইফেলসের ওই জওয়ানের কাছে এই উদ্যোগ শুধুমাত্র ত্রাণ বা দান নয়। যে রাজ্যের মানুষের সুরক্ষায় তিনি দায়িত্ব পালন করছেন, বিপদের দিনে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো তাঁর কাছে কর্তব্যেরই অংশ। আর তাঁর শিক্ষিকা স্ত্রী মনে করেন, মানবিকতার শিক্ষা শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমেই সবচেয়ে ভালোভাবে দেওয়া যায়।এই দম্পতির উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষও তাঁদের পাশে দাঁড়ান। অনেকে ত্রাণ সামগ্রী, আবার কেউ আর্থিক সাহায্য দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। ফলে একটি পরিবারের ব্যক্তিগত উদ্যোগ ধীরে ধীরে পরিণত হয় বৃহত্তর মানবিক প্রয়াসে।এদিকে অসমের বন্যা পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। শুক্রবার পর্যন্ত রাজ্য জুড়ে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০-তে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখনও ১৫টি জেলার প্রায় ১ লক্ষ ৬৮ হাজারেরও বেশি মানুষ বন্যার কবলে রয়েছেন। গোলাঘাট ও উদালগুড়ি জেলায় নতুন করে দু’জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামতির পর প্রায় দু’সপ্তাহ বন্ধ থাকার পরে শিবসাগর জেলার রেল পরিষেবাও ফের চালু হয়েছে বলে জানিয়েছে নর্থইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ে।
তবে বিপর্যয় কাটিয়ে অসমের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই এখনও দীর্ঘ। আর সেই কঠিন সময়ে উত্তরবঙ্গের এই দম্পতির উদ্যোগ যেন আরও একবার মনে করিয়ে দিল । বিপর্যয়ের কোনও সীমানা নেই, তাই মানবতারও কোনও সীমারেখা থাকা উচিত নয়। কখনও কখনও খাবার, ওষুধ কিংবা আশ্রয়ের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ত্রাণ হয়ে ওঠে এই বিশ্বাস কেউ একজন এখনও পাশে আছে। ভালোবাসার পরশে বিপদে অসম্ভবকে জয় করার আশা ক্রমেই শক্তি পাচ্ছে।।


More Stories
মহানায়ক উত্তম কুমার : জন্মদিনের চেয়ে মৃত্যুর দিনটি মানুষ মনে রেখেছেন, কিন্তু কেন?
সারিন্দার পাখি মঙ্গলাকান্ত গান ভুলেছেন অসুস্থতায়
রবীন্দ্রনাথের পরলোক চেতনা ও প্রেতচৰ্চা