সানি রায়, আর্থিকা দত্ত ও বিশ্বজিৎ হীরা : দ্যা এলিফ্যান্ট হুইসপারার্স ছবিটি দেখেছেন অনেকেই। ২০২৩ সালে অস্কারজয়ী ভারতের তামিলনাড়ুর থাপ্পাকাদু হাতি ক্যাম্পের এক সত্যি ঘটনার অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ছবিটি । রঘু নামের এক অনাথ, আহত বাচ্চা হাতিকে উদ্ধার করেছিলেন আদিবাসী দম্পতি বোম্মান এবং বেল্লি। তারপরে হাতিটির সঙ্গে তারা অবিচ্ছেদ্য আত্মিক বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন। তিস্তার খরস্রোতা নদীতে প্রায় একই মানবিক কাহিনীর পুনর্নির্মাণ হয়েছে। অস্কার না জিতুক, এই কাহিনী ছুঁয়ে যাবে প্রতিটি মানুষের মন।
এই মানবতার কাহিনীর শুরু তিস্তা নদীতে। তিস্তার বুক চিরে বয়ে যাওয়া এক ভয়াল স্রোত আর নৌকায় করে সেই ভয়াল স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করা কার্যত জীবনকে হাতে নিয়ে মৃত্যুর মুখে ঝাপ দেওয়া।সেই উত্তাল তরঙ্গের মাঝে প্রাণপণে বেঁচে থাকার এক আকুল আকুতি।একটি ছোট্ট ঐরাবতের জীবন—যে কিনা বারবার ডুবে যাচ্ছে জলের নিচে, আবার ভেসে উঠছে তার পুচকে শুঁড়টি। অসহায় চোখে চারদিকে তাকিয়ে যেন বলতে চাইছে, “আমাকে কেউ বাঁচাও…” তিস্তার প্রবল জলস্রোত সেই আকুতি শুনে যেন কিছুটা হলেও থমকে গিয়েছিল। ছোট্ট শিশুটির বাঁচার করুন প্রচেষ্টা সত্বেও ছোট্ট শিশুটির জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার উপক্রম তৈরি হয়েছিল।কিন্তু মাঝনদীতে ভেসে চলা সেই আশার প্রদীপ নিভে যেতে দেননি জলপাইগুড়ির গজোলডোবার কিছু সহজ-সরল হৃদয়বান মৎস্যজীবীরা।
নিজেদের জীবনের ঝুঁকি তুচ্ছ করে, নদীর গর্জন সামলে তারা ভাসিয়ে দিলেন নৌকা। আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন মৎস্যজীবীরা, যত দ্রুত সম্ভব ওই ছোট্ট শিশুটির কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়। একদিকে প্রবল জলস্রোত চার বিরুদ্ধে লড়াই করা নিদারুণ কঠিন, আর অপরদিকে ছোট্ট শিশুটির বাঁচার আকুতি, মৎস্যজীবীদের সহজ সরল মন বারবার কেঁদে উঠছিল, তারা বারবার সহযাত্রীদের বলে উঠছিলেন আরো জোরে হাল টানো। অবশেষে মৎস্যজীবীরা জল আর জীবনের সেই লড়াই শেষে পরম মমতায় বুকে তুলে আনলেন ভেজা, ক্লান্ত ছোট্ট হস্তিশাবকটিকে। স্রোতের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে তখন ওই হস্তি শাবক প্রায় মৃতপ্রায়।বৈকুণ্ঠপুরের সরস্বতীপুর ফরেস্টের নদীর তীর তখন এক অদ্ভুত অপেক্ষায় নিস্তব্ধ। হস্তি শাবককে নিয়ে মৎস্যজীবীরা পৌঁছায় নদীর পাড়ে জঙ্গলের ধারে। সেই দৃশ্য দেখে যেন গাছের পাতারাও আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছিল, হালকা হাওয়ায় তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল তাদের অনুভূতি। হস্তি শাবকটি জীবন ফিরে পেয়েও অবসর হয়ে দাঁড়িয়েছিল নদীর পাড়ে, কারণ তখনও সে অসহায়। হঠাৎ নদীর পাড়ে জঙ্গলের ধারে এক অপার্থিব দৃশ্য দেখা যায়।
হঠাৎই বনের আড়াল থেকে ছুটে এল মা হাতিটি। নিজের সন্তানকে ফিরে পেয়ে পরম মমতায় জড়িয়ে নিল বুকে, আদরে-সোহাগে ভরিয়ে দিল তার শরীর। কতক্ষণ পর যেন নিশ্চিন্ত হলো দুটি আকুল প্রাণ! মায়ের দুধ খেয়ে, মায়ের ছায়ায় আবার জঙ্গলপানে হেঁটে চলল ছোট্ট ছানাটি… ফিরে পেল নিজের ঘর, নিজের পরিবার।
তিস্তার ভয়াল স্রোত আজ হেরে গেছে মানুষের ভালোবাসার কাছে।
এই গল্প কেবল একটি হাতিকে বাঁচানো বা উদ্ধারের নয়, এই গল্প মমতার এবং শান্তির। এই গল্প প্রমাণ করে, মানুষের একটুখানি মানবিকতাই পারে একটি অসহায় প্রাণকে ফিরিয়ে দিতে তার আপন ঠিকানায়। নোবেলজয়ী দার্শনিক আলবার্ট সোয়াইতজার সাধে কী বলেছিলেন,”যতক্ষণ না মানুষ সমস্ত জীবন্ত প্রাণীকে তার ভালোবাসার আওতায় নিয়ে আসছে, ততক্ষণ সে নিজে প্রকৃত শান্তি খুঁজে পাবে না।”


More Stories
অজগরে চাঞ্চল্য
আবার নায়কের ভূমিকায় লোকো পাইলট
শাবকহারা উদ্বিগ্ন-উন্মত্ত মা গন্ডারের মৃত্যু ফালাকাটায়