Home » রোহিঙ্গারা মায়ানমার থেকে উৎখাত হল কেন? ভারতে তারা নিরাপত্তার সংকট কেন? সুপ্রিম কোর্ট তাদের নিয়ে কি বলছে?

রোহিঙ্গারা মায়ানমার থেকে উৎখাত হল কেন? ভারতে তারা নিরাপত্তার সংকট কেন? সুপ্রিম কোর্ট তাদের নিয়ে কি বলছে?

Oplus_131072

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা, ৭ নভেম্বর : বঙ্গে এসআইআর (SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন চলাকালীন প্রাসঙ্গিকভাবেই  রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রোহিঙ্গা তত্ত্ব। উল্লেখ্য, সঠিক ভোটার চয়ন করার ক্ষেত্রে   রাজ্যে নভেম্বর মাসের চার তারিখে শুরু হয়েছে এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন। আর এই প্রসঙ্গে ঘুরেফিরে আসছে রোহিঙ্গাদের কথা।

  বঙ্গ বিজেপির দাবি রোহিঙ্গা সহ অনুপ্রবেশকারীদের বিরাট একটি অংশ ভোটে তৃণমূলের প্রধান অক্সিজেন সিলিন্ডার। এবার SIR হওয়ায় রোহিঙ্গাদের দেশ ছাড়তে হবে – তৃণমূল বুঝবে কত ধানে কত চাল। এমনই দাবি শুভেন্দু অধিকারী সহ বিজেপির নেতাদের। তৃণমূল সহ বিজেপি বিরোধী বঙ্গের একাধিক দল বারবার বলে আসছে,  বিজেপি বঙ্গে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে সুকৌশলে বিভাজনের রাজনীতি করার চেষ্টা করছে বিজেপি।  শাসকদল বরাবর বলে আসছে, রাজ্যে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের তত্ত্ব মনগড়া এবং হাস্যকর। বাংলায় মায়ানমারের সীমান্তই পড়ে না। ফলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের প্রশ্নই নেই। বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, বিহারে নিবিড় সংশোধনের ফলে রোহিঙ্গা সে অর্থে ধরা পড়ে নি আর সেই তথ্য দিতে পারছে না নির্বাচন কমিশন। বৃথা রোহিঙ্গাদের আওয়াজ তুলে বৈধ ভোটারদের বাদ দেওয়া চলবে না জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

    বঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যতটা না সমস্যা তার চেয়ে হাজার গুণ সমস্যা বেশি বাংলাদেশে। কেন রোহিঙ্গাদের ঘিরে ভারত-বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে? আগের কিস্তিতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে,আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে  বিভিন্ন জায়গায় শরণার্থী প্রসঙ্গে তৈরি হচ্ছে সংকট । আর এখানেই জড়িয়ে রয়েছে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ, বারবার উঠে আসছে রোহিঙ্গাদের কথা এবং রোহিঙ্গা সমস্যা।রোহিঙ্গাদের সমস্যা ছাপিয়ে দেখা দিয়েছে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সমস্যা। মায়ানমার  থেকে আগত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় এবং মানবিক সংকট নিয়ে তত্ত্বকথায় ভয়ংকর ভাবে বিতর্ক দানা বেঁধেছে ।এবারের পর্বে আলোচনা কেন রোহিঙ্গারা মায়ানমার থেকে উৎখাত হল? আর কীভাবে তারা অন্য দেশগুলির ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ভয় হিসেবে চিহ্নিত হল?

 প্রথম পর্বে রোহিঙ্গার উৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আরাকান প্রদেশের রোহিঙ্গাদের নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে এই জাতিগোষ্ঠির উদ্ভব সম্পর্কে মতভেদ সত্ত্বেও নির্ভরযোগ্য মত হলো, চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আরাকান রাজ্যে বসতিস্থাপনকারী চট্টগ্রামি পিতার ঔরসজাত ও আরাকানি মাতার গর্ভজাত বর্ণসংকর জনগোষ্ঠীই রোয়াইঙ্গা বা রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের বসবাস প্রধানত উত্তর আরাকানে কেন্দ্রীভূত। রোহিঙ্গারা বিভিন্ন সময় মায়ানমারে অত্যাচারিত হয়ে ঢুকে পড়েছে বিভিন্ন দেশে। রোহিঙ্গাদের উপরে অত্যাচার এবং রোহিঙ্গাদের নিধনযোগ্যদের কাহিনী অত্যন্ত সুপ্রাচীন। ২০২৫ সালের কয়েক বছর আগে, বিগত ৮ থেকে ১০ বছরের ইতিহাসের ছবি যদি তুলে ধরা যায় তাহলে দেখা যাবে  ২০১৭ সালে বার্মিজরা একটি ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশনের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা নিধন যজ্ঞ শুরু করে। এছাড়াও রোহিঙ্গাদের বার্মার মাটি থেকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে বার্মিজদের অনুসৃত কৌশলের সাথে নাৎজি জার্মান চ্যান্সেলর হিটলারের ইহুদী নিধন পরিকল্পনা ‘হলোকাস্ট’ এরও বিস্ময়কর মিল আছে!
আরাকান বা রাখাইনের রোহিঙ্গাদের উপর বার্মিজ সামরিক জান্তার নির্যাতন, নিপীড়ন ও নিধনযজ্ঞ প্রশমনে গঠিত কোফি আন্নান কমিশন (The Advisory Commission on Rakhine State) ২৪ আগস্ট ২০১৭ সালে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে। তেষট্টি পৃষ্ঠার সেই রিপোর্টে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করা হলেও ‘বিশ্বের একক বৃহত্তম রাস্ট্রহীন মুসলিম সম্প্রদায়’ হিসেবে রোহিঙ্গাদের অভিহিত করা হয় এবং ১৯৮২ সালের বার্মিজ নাগরিকত্ব আইন পুনর্বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে ৮৮টি সুপারিশ করা হয়।
কোফি আন্নান কমিশনের সুপারিশ কী হতে যাচ্ছে তা আগে থেকেই আন্দাজ করে আগস্ট মাসের শুরু থেকেই মায়ানমার সরকার রাখাইনে সেনা মোতায়েন শুরু করে (ক্লিয়ারেন্স অপারেশন) এবং স্থানীয় উগ্রবাদী বৌদ্ধ ভিক্ষু, মগ ও রাখাইন যুবকদের আসন্ন ‘এথনিক ক্লিঞ্জিং’ অপারেশনের জন্য সংঘবদ্ধ করতে শুরু করে। বলে রাখা ভালো মায়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীকে  ততমদো বলা হয় যাদের সহায়তায় পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন স্তরের রোহিঙ্গা নেতানেত্রীসহ ১৫ থেকে ৪০ বছর বয়েসি সকল রোহিঙ্গা পুরুষদের গ্রেপ্তার করে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে ব্যাপক আতংক ছড়ানো শুরু করা হয়। ২০১৭ সালেই কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের ঠিক পরদিন রাতেই (২৫ আগস্ট ২০১৭) রাখাইন রাজ্যের ২৪টি পুলিশ ফাঁড়ি এবং রাখাইনে অবস্থিত ৫৫২ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নের ৭টি ক্যাম্পে একযোগে হামলার সংবাদ পাওয়া যায়। এ হামলায় অস্ত্র-গোলাবারুদ লুটের পাশাপাশি ৫৯ জন রোহিঙ্গা, ১০ জন পুলিশ, ১ জন ইমিগ্রেশন অফিসার ও ১ জন সৈন্য মারা যায় এবং আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিকে (ARSA/আরসা) এজন্য দায়ী করা হয়। যদিও অনেকে মনে করে এটা মায়ানমারেরই ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন ছিল, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে প্রেক্ষাপট গড়ে ওঠে, শুরু হয় রোহিঙ্গাদের নিধনযজ্ঞ। আর মূল অপারেশনটি ছিল তিন ধাপে। ১ম ধাপে নির্বিচার হত্যা-ধর্ষণের মাধ্যমে সীমাহীন ত্রাস সৃষ্টি (অপারেশন কিলিং), ২য় ধাপে পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে রসদ সরবরাহ বন্ধ করে আর প্রাণভয় দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের রাখাইনের বাইরে বের করে দেয়া (অপারেশন এথনিক ক্লিঞ্জিং), এবং ৩য় ধাপে রোহিঙ্গাদের বসতভিটা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন করা যেন তারা আর ফিরে আসার কথা ভাবতেও না পারে  যাকে বলা হয় স্কর্চড-আর্থ ক্যাম্পেইন।২০১৭  সালের ২৬ আগস্ট থেকে শুরু হয় এই ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন।’ অভিযানের শুরুতেই একযোগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্বিচারে রোহিঙ্গা পুরুষদের হত্যা আর নারীদের ধর্ষণ শুরু হয়। একইসাথে বসতভিটা পুড়িয়ে রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ভিটে হারা করা হচ্ছিল। রোহিঙ্গারা জন্মাবধিই বার্মিজ বৌদ্ধদের হাতে নির্যাতিত হয়ে অভ্যস্ত বলা চলে। কিন্তু এই নির্যাতনের মাত্রা অতীতের নৃশংসতার সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে  যায়। অভিযানের ১ম সপ্তাহেই মেরে ফেলা হয় ১৩০ জন রোহিঙ্গাকে, ২য় সপ্তাহের ভেতর এ সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং পরে জানা যায় যে ক্লিয়ারেন্স অপারেশন শুরুর পর সাকুল্যে ২৪ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে গুলি করে বা জবাই করে কিংবা পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।মায়ানমার সরকারের এই নিষ্ঠুর ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের ফলে অসহায় রোহিঙ্গারা প্রাণভয়ে যে যেদিকে পারে পালিয়েছে। বা মায়ানমার সরকারের এই নিষ্ঠুর ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের ফলে অসহায় রোহিঙ্গারা প্রাণভয়ে যে যেদিকে পারে পালিয়েছে। প্রথমে ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র তথা মায়ানমারের নিকটতম প্রতিবেশী  বাংলাদেশের ছবি তুলে ধরা যাক  ।বাংলাদেশের সাথে মায়ানমারের প্রায় ১৩৪ কি.মি. সীমান্তজুড়ে স্থলসীমান্তে ২০৮টি এবং জলসীমান্তে ৬৩টি পারাপারের পয়েন্ট রয়েছে। বান্দরবানের জিরো পয়েন্ট দিয়ে রাখাইনে যাতায়াত সবচেয়ে সোজা হলেও বার্মিজরা সে পথে প্রায় পনেরশো স্থল মাইন পুতে রাখায় রোহিঙ্গা শরণার্থীরা নৌপথে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধ্য হয়। রাখাইনের মংডু থেকে বাংলাদেশের টেকনাফের দূরত্ব নৌপথে প্রায় ১২ কি.মি.; সময় লাগে ৬ ঘন্টা।  যে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল তারা  প্রথমে কক্সবাজারের দক্ষিণে শাহপরীর দ্বীপে এসে ওঠে। সেখান থেকে একাধিক জায়গায় তারা ছড়িয়ে পড়ে ও একাধিক ক্যাম্পে আশ্রয় লাভ করে । এরপর দালালদের  জুন ২০১৮ সালেই পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৮ লক্ষ ৮৭ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়।  বিগত কয়েক বছরে তারা বাংলাদেশ থেকে ভারতেও চলে আসে। ভারতে শুরু হতে থাকে রোহিঙ্গা ধর পাকড়া পাশাপাশি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক ময়দান বারবার সরগরম হতে থাকে

রোহিঙ্গাদের ভারত থেকে পুশব্যাক করা হয়েছে এরকম একাধিক অভিযোগ করা হয়েছে। রোহিঙ্গারা বারবার দাবি করেছে তাদের মৃত্যুর জন্য ফেরত পাঠানো বা এমন পুস্ ব্যাক করা উচিত নয় যা থেকে তাদের মৃত্যু হতে পারে । কিন্তু ভারতের সর্বোচ্চ আদালত তাদের কথা শুনতে নারাজ। কেন্দ্রীয় সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের অবস্থান কার্যত সুস্পষ্ট করে দিয়েছে।  যদিও মতামতের পালটা মতামতও উঠে এসেছে।

   অথচ বাস্তবে খতিয়ে দেখলে রোহিঙ্গারা চরমভাবে অত্যাচারিত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। এবং মায়ানমার বর্তমানে তাদের নাগরিকের মর্যাদা দেয় না তাদের বাংলাদেশী তকমা দিতেও তারা ছাড়ে না। পুরনো কোলাজ তুলে ধরলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে আরেকটি রোহিঙ্গাদের বর্তমান সমস্যার অন্তর্নিহিত   বিষয়।
মায়ানমারে  রোহিঙ্গা  অত্যাচারের চরম অবস্থা বিগত ১০ বছরে বেড়ে যাওয়ার ফলে বেশি সংখ্যায় রোহিঙ্গাকে  মায়ানমার ছাড়তে বাধ্য করলেও  রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞের শুরু সেই ১৭৮৪ সাল থেকে বা তারও কয়েক যুগ আগে। যদিও এর মধ্যবর্তী অবস্থায় আজ থেকে ৭৫ বছর আগে  নিজেদের বিপদ নিজেরাই আরও গভীর ভাবে ডেকে এনেছে রোহিঙ্গারা । এনিয়ে মতভেদ নেই,দীর্ঘ সময় ধরেই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ১৭৮৪ সালে বার্মিজ রাজা বোদাপায়া আরাকান জয় করলে শরণার্থী রোহিঙ্গারা দক্ষিণ চট্টগ্রামে আশ্রয় নেয়। সেই সময় রোহিঙ্গা শরণার্থী পুরুষদের একাংশ ব্রিটিশদের প্ররোচনায় আরাকানের বার্মিজ সেনাদের উপর চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে শুরু করে। ১৮১১ সাল নাগাদ এই রোহিঙ্গা ইন্সার্জেন্টরা আরাকানের সিংহভাগ দখলে নিয়ে নেয়।  বার্মিজদের প্রবল প্রতি-আক্রমণে তারা শরণার্থীসহ পিছু হটে কক্সবাজার- চট্টগ্রামে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এদের অধিকাংশই আর কখনো আরাকানে ফিরে যায়নি। কিন্তু রোহিঙ্গা দের বিপর্যয় তখনও শুরু হয়নি।তবে ১৮২৪ সাল থেকে শুরু হওয়া অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের সময় থেকে ব্রিটিশরা নিজেদের স্বার্থেই আরাকানসহ বার্মায় প্রচুর ভারতীয় শ্রমিক ও সৈন্য নিয়ে আসে। সে সময় বাংলায় ঠাই নেয়া কিছু রোহিঙ্গা আবার আরাকানে ফিরে আসে এবং ব্রিটিশদের অনুগত হিসেবে বিশেষ সুবিধা লাভ করেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পর জাপানীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্থানীয়দের সমর্থন নিশ্চিত করতে ব্রিটিশরা আরাকানি রোহিঙ্গাদের অঙ্গীকার করেছিল যে, যুদ্ধ শেষে আরাকানকে স্বাধীন মুসলিম রাস্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। কিন্তু ১৯৪২ সালে বার্মিজদের সহায়তায় জাপানীদের অগ্রাভিযানের মুখে ব্রিটিশরা পিছু হটলে রোহিঙ্গাদের মাথায় বাজ ভেঙে পড়ে এবং আরাকানজুড়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এতদিন ব্রিটিশদের আনুকূল্য-ধন্য রোহিঙ্গারা এবার দখলদার জাপানী সৈন্য এবং উগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নির্মম আক্রমণের শিকার হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এর ফলে প্রায় ২২ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। রোহিঙ্গারা সবচেয়ে বড় বিপদ ডেকে নিয়ে আসে নিজেদের স্বাধীনতা লাভের প্রাক মুহুর্তে যা কিনা ভারতের স্বাধীনতা লাভ এবং ভারতের  দ্বিখণ্ডিত হওয়ার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
বার্মা স্বাধীনতা লাভের পূর্বক্ষণে রোহিঙ্গারা মংদ ও বুথিদং জেলাসহ পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে যোগ দেবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে ব্যর্থ হয় এবং এখানেই রোহিঙ্গারা নিজেদের ভাগ্য লিখন আরও সুনির্দিষ্ট করে ফেলে। বার্মা সরকারের কাছে রোহিঙ্গাদের তকমা জোটে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে ।১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হবার পরপরই ক্ষুব্ধ বার্মিজ সরকার রোহিঙ্গাদের বহিরাগত বলে আখ্যা দিয়ে তাদের উপর চড়াও হয়। এছাড়াও ১৯৪২ সালে দেশ ত্যাগ করা রোহিঙ্গাদের ফিরে আসার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় এবং তাদের স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি বায়েজাপ্ত করা হয়। পাশাপাশি সকল সরকারি চাকুরিতে রোহিঙ্গাদের যোগদানও নিষিদ্ধ করা হয়। এমন নিষ্পেষণের ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা আবারো প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এই নির্মম অত্যাচারের  ইতিহাস চলতে থাকে ৬৯ বছর ধরে। তারপরই শুরু হয় ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশন। যার ফলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায় বহু রোহিঙ্গা। জন্ম নেয় বৃহত্তম রাষ্ট্রহীন মুসলিম সম্প্রদায়। এরা প্রচুর সংখ্যায় ঢুকে পড়ে বাংলাদেশে, ঢুকে পড়ে ভারতে। জুনটা বা জান্তা অত্যাচারে তারা আশ্রয় নেই থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার শরণার্থী শিবিরে। বিগত কয়েক দশকে রোহিঙ্গারা ভারতে থিতু  হওয়ার ও অধিকতর নিরাপদ জীবন যাপন করার  চেষ্টা করলেও বাস্তবে ভারতে তারা কখনোই নাগরিক স্বীকৃতি লাভ করে নি। ভারতে তাদেরকে  বিপদ হিসেবেই দেখা হয়েছে। যদিও তাদের রাজনৈতিক মুখ্যলাভ বা ভোটের  ময়দানে ইস্যু করা হয়েছে

Byte ভোটকেন্দ্রিক

এই অবকাশে ভারতে তাদের অবস্থান বুঝতে    সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় তুলে ধরা প্রয়োজন। যে রায়ের ফলে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অ-শরণার্থী মর্যাদা এবং ভারতের আইনি বাধ্যবাধকতা একটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে এ বছর মে মাসে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনযাত্রার অবস্থা এবং নির্বাসন সম্পর্কিত একটি মামলায়, *ভারত সরকার সুপ্রিম কোর্টকে বলেছিল যে তারা UNHCR-এর জারি করা শরণার্থী কার্ড বা রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না*  প্রসঙ্গত  UNHCR হল শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন।  United Nations High Commissioner for Refugees  একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার প্রধান কাজ হল শরণার্থীদের সুরক্ষা ও তাদের অধিকার রক্ষা করা। তবে   ভারত সরকার সুপ্রিম কোর্টের এর বিরুদ্ধে প্রস্তাব এনে বলেছিল  **ভারত ১৯৫১ সালের জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী নয় এবং তাই কোনও শরণার্থী সুরক্ষা প্রদান করে না।* এই বিষয়ে *ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে যে শুধুমাত্র ভারতীয় নাগরিকদেরই দেশে বসবাসের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।* *অতএব, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের পরিস্থিতি বিদেশী আইনের আওতাধীন হওয়া উচিত যা জোরপূর্বক নির্বাসনের অনুমতি দেয়।**ভারতে রোহিঙ্গা সমস্যা মূলত মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় এবং মানবিক সংকটকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত হয়েছে। *ভারতে প্রায় ৪০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থী* রয়েছে সংখ্যাটি অনেক বেশি বলেও বিভিন্ন স্তরে আশঙ্কা রয়েছে।ভারতে রোহিঙ্গা সমস্যার অন্যতম দিক হল শরণার্থীর মর্যাদা। ভারতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আইনি মর্যাদা একটি বিতর্কিত বিষয় হয়ে থেকে গিয়েছে এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায় মনে করে ভারত রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে অপরাধী মতো করে আচরণ  । সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে  রোহিঙ্গাদের
পুনর্বাসন ও প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে তথ্য সামনে এসেছে সেখানে রোহিঙ্গাদের পক্ষে বলা হয়েছে
কিছু রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে ইচ্ছুক, কিন্তু তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে যদিও কেন্দ্র এবং সুপ্রিম কোর্ট একযোগে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তাদের অবস্থান প্রকট করে দিয়েছে।কিছু মানবাধিকার সংস্থা ভারতে রোহিঙ্গা বন্দীদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে, যার মধ্যে আটক এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বৃহৎ আকার নিয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা ভারত সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিতর্ক ও ভিন্ন মত সৃষ্টি করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে
জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিভেদও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কিছু ক্ষেত্রে, রোহিঙ্গাদের আগমন স্থানীয় জনগণের মধ্যে জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বিভেদ তৈরি করতে পারে। তাছাড়া, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে
রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাসস্থান, খাদ্য, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য পর্যাপ্ত সংস্থান না থাকায়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি করেছে।নিরাপত্তার উদ্বেগ একটি বিষয়। কারণ সুশৃংখল এবং নীতিপরায়ণ বলে কোনো অভিধানেই রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে উল্লেখ নেই। অপরাধের ক্ষেত্রেও তাদের ট্রাক রেকর্ড মোটেই উজ্জ্বল নয়। বাংলাদেশে নেশার দ্রব্য, মাদক পাচার, চুরি এবং যৌন অপরাধে  রোহিঙ্গাদের পরিসংখ্যান খুবই খারাপ। ভারতে ও এই বিষয়ে রোহিঙ্গাদের মোটেই সুনাম নেই। কিছু মহল থেকে তাই রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবেও দেখা হয়। সব মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সমস্যা গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানের পথ কী – তা খোঁজার চেষ্টা করা হবে তৃতীয় কিস্তিতে।

About Post Author