Home » কলাগাছের ভেলায় স্কুলের পথে পাড়ি, ঘটতে পারে দুর্ঘটনা, নির্বিকার প্রশাসন

কলাগাছের ভেলায় স্কুলের পথে পাড়ি, ঘটতে পারে দুর্ঘটনা, নির্বিকার প্রশাসন

সানি রায় ও পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :উত্তরবঙ্গের ময়নাগুড়ির খুদে পড়ুয়াদের জীবন সংগ্রামের সঙ্গী কলার ভেলা। আশ্চর্যজনকভাবে কলার ভেলায় চেপে জলপথে তারা স্কুলে যায়, স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে।

মনসামঙ্গলের সর্প দংশনে মৃত স্বামী লখিন্দরকে নিয়ে বেহুলা কলা গাছের ভেলায় বা মান্দাসে ভেসেছিলেন জলপদে। মৃত মানুষের অস্তিত্ব সংকট, জীবন নিয়ে ভয় ও তাকে কাটিয়ে ওঠার লড়াইয়ের প্রতীক কলার মান্দাস বা কলা গাছের ভেলা। অদ্বৈত মল্লবর্মনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ বা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’সহ সাহিত্যে বঙ্গজীবনের বাস্তবমুখী ছবিতে বারবার রয়েছে কলার ভেলার কথা। রয়েছে বাঁচার লড়াইয়ের কথা। বেহুলা স্বামীর প্রাণ রক্ষার জন্য কলার ভেলায় পাড়ি দিয়েছিলেন দেব লোকে। উত্তরবঙ্গের বার্নিশ এলাকার খুদে পড়ুয়ারা প্রাণ হাতে করে বিদ্যা অর্জনের চেষ্টায় রত । তাদের অবলম্বন পলকা কলা গাছের ভেলা। স্কুলে যাওয়া-আসা জলপথে কলাগাছের ভেলায় চেপে। যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বড় রকমের দুর্ঘটনা। প্রশাসন উদাসীন,নির্বিকার।

বানের তোড়ে ভেসে গিয়েছে বাঁশের সাঁকো।তিন কিলোমিটার ঘুরে স্কুল যেতে হবে।জলপথে কলার ভেলাই সাহারা। ময়নাগুড়ি অঞ্চলের প্রশাসন শীতঘুমে , তাই বাধ্য হয়ে কিছুদিন আগে নিজেদের পকেটের টাকায় বাঁশের সাঁকো তৈরি করেছিলেন গ্রামের মানুষ। কিন্তু শেষরক্ষা হলো না। বন্যার জলের তোড়ে ভেঙে গেল সেই সাঁকোটিও। ফলে কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ময়নাগুড়ি ব্লকের বার্নিশ অঞ্চলের মাঝারবাড়ি ও বাইসাবাড়ি এলাকার বাসিন্দারা। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে স্থানীয় পুটিমারি হরেন্দ্রনাথ প্রাইমারি স্কুলের খুদে পড়ুয়ারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই এলাকায় যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল একটি স্লুইস গেট। গত বন্যায় সেই গেটের এক প্রান্ত ভেঙে নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। এরপর গ্রামবাসীরা পঞ্চায়েত প্রধানের দ্বারস্থ হলেও কোনো লাভ হয়নি। বাধ্য হয়ে চাঁদা তুলে যাতায়াতের জন্য একটি বাঁশের সাঁকো তৈরি করেন তাঁরা। সাম্প্রতিক বন্যায় সেই সাঁকোটিও ভেসে যাওয়ায় পরিস্থিতি এখন আরও জটিল। মাত্র ৫০০ মিটারের মধ্যে থাকা প্রাথমিক স্কুলে পৌঁছাতে এখন প্রায় ৩০টি পরিবারের ছেলে-মেয়েদের ৩ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। স্কুলের সামনে জল জমে থাকায় খুদে পড়ুয়ারা এখন কলাগাছের ভেলা যা স্থানীয় ভাষায় ঘুরা,বানিয়ে প্রাণহাতে নিয়ে যাতায়াত করছে। ছাত্রদের কথায়, “সামনেই স্কুল, কিন্তু রাস্তা না থাকায় বাধ্য হয়ে কলাগাছের ভেলা চড়ে আসতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো দিন বড়সড় বিপদ ঘটতে পারে। সরকার যেন দ্রুত আমাদের দিকে, আমাদের সন্তানদের দিকে  নজর দেয়।”

প্রশাসনের এই নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভে ফুঁসছেন এলাকার বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দারা স্পষ্ট জানান, “সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, দ্রুত এখানে যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক। প্রশাসন যদি এবারও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দেয়, রাজ্যে নতুন সরকার আসার পরেও এ ধরনের সমস্যা যদি আমাদের সহ্য করতে হয়, তবে আগামী দিনে আমরা বৃহত্তর আন্দোলনে নামতে বাধ্য হব।”

গোটা বিষয় নিয়ে ময়নাগুড়ি বিধায়ক ডালিম চন্দ্র রায় কে ফোন করা হলে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত রয়েছেন বলে, কোনওরকম প্রতিক্রিয়া মেলেনি।অন্যদিকে ময়নাগুড়ি সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক সৌমেন দাসকে গোটা বিষয়ে নিয়ে ফোন করা হলে তিনি আশ্চর্য নীরবতা অবলম্বন করেছেন। জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের আধিকারিকদের সন্তান-সন্ততিরা এই সমস্যা-সংকুল অঞ্চলের বিদ্যালয়ে পড়ে না বা সম্ভবত পড়েও নি। তাঁরা তাই বধির, অন্যদিকে গভীর জলের উপরে কলা গাছের ভেলায় টালমাটাল হয়ে, ট্রাপিসের শিল্পীদের মতো জীবন মৃত্যুর সংগ্রামে ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে বেঁচে থাকার লড়াই পড়ুয়াদের! ঘরের শিশুরা ঘরে না ফেরা পর্যন্ত অভিভাবকরা দিনরাত আশঙ্কায় থাকেন, প্রশাসনের উদাসীনতায় জলে তলিয়ে ভেসে না যায় ভবিষ্যৎ!

About Post Author