Home » পাহাড়ি নদী ও অভয়ারণ্যের পাশ দিয়ে সুন্দরী ডুয়ার্সের বুক চিরে ছুটবে ট্রেন

পাহাড়ি নদী ও অভয়ারণ্যের পাশ দিয়ে সুন্দরী ডুয়ার্সের বুক চিরে ছুটবে ট্রেন

সানি রায় ও সম্পিতা কর্মকার , সময় কলকাতা : মনে আছে শাহরুখ খান অভিনীত চেন্নাই এক্সপ্রেস’ (Chennai Express) চলচ্চিত্রে জঙ্গলের ভেতর ও বিশাল জলপ্রপাতের সামনে ট্রেন ছুটে চলার নয়নাভিরাম দৃশ্যটি? গোয়া ও কর্ণাটক সীমান্তের কাছে অবস্থিত বিখ্যাত দুধসাগর জলপ্রপাত (Dudhsagar Falls) এলাকার এই দৃশ্যই যেন এবার ধরা পড়বে বঙ্গের সুন্দরী ডুয়ার্সে। পাহাড়ি নদী ও অভয়ারণ্যের পাশ দিয়ে ডুয়ার্সে ছুটে চলবে ট্রেন।

ডুয়ার্সের সবুজ অরণ্য, পাহাড়ি নদী আর মেঘে মোড়া প্রকৃতির বুক চিরে এবার ছুটবে ট্রেন। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের অধীনে চালসার খুনিয়া মোড় থেকে জলঢাকা পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণে প্রায় ২৭২ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে রেল মন্ত্রক। সম্প্রতি এই প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন দার্জিলিংয়ের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তা। প্রস্তাবিত রেলপথ যাবে জলপাইগুড়ি ও কালিম্পং বন বিভাগের সংবেদনশীল এলাকা এবং চাপড়ামারি বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্যের পাশ দিয়ে। ফলে একদিকে যেমন সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হবে, তেমনই বাড়বে সামরিক প্রস্তুতির সক্ষমতা। একই সঙ্গে খুলে যাবে ডুয়ার্সের পর্যটনের নতুন দিগন্ত। এতদিন জলঢাকা, ঝালং, বিন্দু, টোডে কিংবা টাংটার মতো মনোরম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছতে ভরসা ছিল শুধুই সড়কপথ। দীর্ঘ পথ, অনিশ্চিত আবহাওয়া এবং পাহাড়ি রাস্তার কারণে ভোগান্তি ছিল নিত্যসঙ্গী। সেই সমস্যারই স্থায়ী সমাধান হতে পারে এই নতুন রেললাইন।

এই পথ ধরেই প্রতিদিন যাতায়াত করেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটকরা। স্থানীয়দের দাবি, রেল চালু হলে জলঢাকা-ঝালং-বিন্দু সার্কিটে পর্যটকের সংখ্যা অনেকটাই বাড়বে। উপকৃত হবে হোমস্টে ব্যবসা, ছোট দোকান, কৃষিজ ও বনজ পণ্য পরিবহণ। কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও তৈরি হবে বলে আশা স্থানীয়দের।

এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু পর্যটনে সীমাবদ্ধ নয়। কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই রেলপথ। জলঢাকা নদীর উৎস সিকিমের কুপুপ এলাকায়, যা ডোকলাম ও ভারত-চীন-ভুটান ত্রিদেশীয় সীমান্তের খুব কাছেই। ২০১৭ সালের ৭৩ দিনের ডোকলাম অচলাবস্থার অভিজ্ঞতার পর সীমান্তে দ্রুত সেনা, রসদ ও ভারী সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে এমন রেল যোগাযোগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই অনুমান। চীন ইতিমধ্যেই তিব্বত পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণ করেছে। অন্যদিকে ভারতও সেবক-রংপো রেল প্রকল্প দ্রুত শেষ করার পথে। আগামী বছর সেই রেলপথ চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। এবার খুনিয়া মোড় থেকে জলঢাকা হয়ে ভবিষ্যতে সীমান্তমুখী রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা ভারতের কৌশলগত পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, এই রেলপথ শুধু সীমান্তের নিরাপত্তাই বাড়াবে না, দীর্ঘদিন পিছিয়ে থাকা এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নেও বড় ভূমিকা নেবে। একই সঙ্গে পর্যটনের প্রসার ঘটবে গোটা ডুয়ার্স জুড়ে।

তবে এই প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়েছেন ডুয়ার্সের তৃণমূল নেতা সঞ্জয় কুজুরও। তাঁর মতে, রেলপথ তৈরি হলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ব্যবসা ও পর্যটন শিল্পেরও বড় লাভ হবে। অন্যদিকে আলিপুরদুয়ারের সাংসদ মনোজ টিজ্ঞাও প্রকল্পের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকার উন্নয়নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা, সীমান্তে আরও শক্তিশালী যোগাযোগ, আর উত্তরবঙ্গের আর্থিক বিকাশ, সব মিলিয়ে খুনিয়া মোড় থেকে জলঢাকা পর্যন্ত এই রেলপথ শুধু একটি নতুন ট্র্যাক নয়, এটি উত্তরবঙ্গের ভবিষ্যতের নতুন দিশা। এখন নজর একটাই, কবে শুরু হবে নির্মাণকাজ, আর কবে বাস্তবে ছুটবে ডুয়ার্সের নতুন ট্রেন। সীমান্ত নিরাপত্তা থেকে পর্যটন, অর্থনীতি থেকে কৌশলগত পরিকাঠামো, সবটাই ঘিরে তৈরী হয়েছে বহু প্রত্যাশা। এখন দেখার, ঘোষণার পর কত দ্রুত বাস্তবের রূপ পায় এই প্রতীক্ষিত রেললাইন।।

 

About Post Author