সানি রায়,সময় কলকাতা, ৫ অগাস্ট : বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান ও পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে বাস্তব জীবনের নানা সমস্যা সমাধান এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজ করার কৌশল বা মাধ্যম হলো প্রযুক্তি। প্রযুক্তিবিদ্যকে কাজে লাগানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক নয়। প্রথাগত তালিম বাধ্যতামূলক নয়। মাইকেল ফ্যারাডের সে অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা ছিল না। তিনি বইয়ের দোকানে কাজ করার সময় বিজ্ঞান পড়ে নিজের চেষ্টায় তড়িৎ-চৌম্বকত্ব আবিষ্কার করেন।মেরি অ্যান অ্যানিং কোনো উচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই জীবাশ্মবিদ্যায় বড় অবদান রাখেন। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও একই কথা। সোনম ওয়াংচুক পেশায় প্রথাগত অর্থে কোনো বিজ্ঞানী নন তিনি একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার তবুও উদ্ভাবক এবং পরিবেশকর্মী। তিনি জল সংরক্ষণের জন্য ‘আইস স্তূপা’ (Ice Stupa) কৃত্রিম হিমবাহ এবং সৌরশক্তি-চালিত ভবন তৈরির মতো নানা ব্যবহারিক উদ্ভাবন করেছেন, যা তাঁকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি এনে দিয়েছে। একই সঙ্গে বিজ্ঞানী উদ্ভাবক ও পরিবেশবিদের মর্যাদা পেয়ে থাকেন সোনম ওয়াংচুক। তবে ডুয়ার্সের কৃপা হাঁসদা এঁদের চেয়েও যেন এক কদম এগিয়ে। বিজ্ঞান সম্পর্কে তিনি কতটাই বা জানেন। ডুয়ার্সে অখ্যাত গ্রামের অখ্যাত এক মহিলা যিনি একজন সামান্য চা শ্রমিক, তিনি জীবনযাত্রা সহজতর করার প্রযুক্তি করায়ত্ব করেছেন নিজের বুদ্ধি ও কৌশলে। ডুয়ার্সের সোনম ওয়াংচুক কৃপা হাঁসদা এক অপার বিস্ময়।
উত্তরের জনপদ ডুয়ার্স মানেই এক সবুজ রূপকথা, যেখানে দিগন্ত বিস্তৃত চা বাগানের বুক চিরে চলে গেছে ঝা-চকচকে পিচ রাস্তা। এই পথ দিয়েই পর্যটকদের গাড়ি ছুটে চলে, আর জানালার বাইরে ভেসে ওঠে প্রকৃতির এক জাদুকরী রূপ। কিন্তু এই মায়াবী রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক রুঢ় বাস্তব। এখানকার চা শ্রমিকদের জীবন এক অন্তহীন সংগ্রামের গল্প। কেন্দ্র ও রাজ্যের অধীনে থাকা একের পর এক চা বাগানের অবস্থা আজ শোচনীয়। অভাব রয়েছে সঠিক পারিশ্রমিক, কর্মসংস্থান ও নূন্যতম বাসস্থানের। পেটের তাগিদে পুরুষেরা যখন ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের খাতায় নাম লেখাচ্ছেন, তখন হাল ধরেছেন বাগানের অদম্য নারীরা। প্রতিকূলতাকে জয় করে তাঁরা আজ সমাজের মূল স্রোতে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন। কৃপা হাঁসদা এমনই এক সাহসী ও জেদি নারী চা শ্রমিক যিনি আকাশছোঁয়া বাজারমূল্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, ২০২৬ সালের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজের ভাগ্য বদলে দিয়েছেন। গবাদিপশুর গোবর থেকেই তৈরি হচ্ছে জ্বালানি, আর সেই জ্বালানির মিথেন গ্যাসে বিনা খরচে রান্না করছেন এই চা-শ্রমিক পরিবার। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সে এমনই এক অনন্য নজির গড়েছেন জলপাইগুড়ি জেলার মেটেলি ব্লকের আইভিল চা বাগানের বাসিন্দা কৃপা হাঁসদা।
প্রত্যন্ত মথুরা লাইনে অবস্থিত কৃপার বাড়ির চারপাশ জুড়েই শুধুই চা বাগান। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় সবকিছু সংগ্রহ করতে যেতে হয় প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের চালসা বা মালবাজারে। চা বাগানে কর্মরত শ্রমিকদের দিনের শুরু হয় ভোরে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পরিবারের সকলের জন্য রান্নার ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু এলাকায় পর্যাপ্ত জ্বালানি কাঠের অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। ফলে একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে এলপিজি গ্যাস। অথচ বর্তমানে একটি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম প্রায় হাজার টাকা যা স্বল্প আয়ের চা-শ্রমিক পরিবারের কাছে অত্যন্ত বড় বোঝা। দিন আনি দিন খাই সংসারে এত ব্যয়বহুল জ্বালানি কেনা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কিনলেও তার জন্য রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। আর সেই কঠিন বাস্তবতার মাঝেই গবাদিপশুর গোবর থেকে উৎপাদিত মিথেন গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে বিনা খরচে রান্নার ব্যবস্থা করে অন্যদের কাছেও এক অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কৃপা হাজদা।
কৃপার হেঁশেলে এখন জ্বলছে গোবর গ্যাস থেকে তৈরি মিথেন গ্যাসের চুলা। এই জলজ্যান্ত সমস্যার সমাধান হয়েছিল গত ২০২৫ সালে। প্রসারী নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গত বছর উদ্যোগ নিয়েছিল এই আইভিল চা বাগানে মোট চারটি বায়ো গ্যাস প্লান্ট স্থাপন করার। ২০২৬ অর্থাৎ এবছর যার বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রসারী সংস্থার এই প্লান্টের সাহায্যে এখন প্রতিদিন বিনা খরচে সকাল দুপুর ও রাতে রান্না হচ্ছে বাড়িতে। প্রত্যেকদিন সকালবেলা ৩০ কেজি গোবরের সঙ্গে ৪০ লিটার জল মিশিয়ে বায়ো গ্যাস এই প্ল্যানটে দেওয়া হয় আর তাতেই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সেখান থেকে উৎপন্ন হয় মিথেন গ্যাস আর সেই মিথেন গ্যাসকে ব্যবহার করি জ্বলে উঠছে রান্নার উনুন । একদিকে গোটা প্রকল্পটি পরিবেশ বান্ধব অন্যদিকে অনেকটাই কমে গিয়েছে এলপিজি সিলিন্ডারের প্রয়োজন। প্রত্যন্ত চা বাগানের শ্রমিক কৃপা হাজদারের এই অনন্য উদ্যোগ সৃষ্টি দৃষ্টান্ত কেবলমাত্র তার পরিবারের খরচ কমিয়েছে তা নয় বরং তার এই অনুপ্রেরণা চা বাগানের বহু শ্রমিকদের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
চা বাগান গ্রাম এলাকায় হওয়ায় গবাদি পশুর গোবরের মত সহজলভ্য উপাদান থেকেই আধুনিক ও টেকসই জ্বালানির ব্যবস্থা করা যে একটা কঠিন বিষয় নয় তা দেখিয়ে দিয়েছেন ডুয়ার্সের আইভিল চা বাগানের মথুরা লাইনের কৃপা হাঁসদা। সোনম ওয়াংচুক সমতলপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে মানুষের জীবনযাত্রাকে যেরকম সহজ করে তুলেছেন, কৃপা হাঁসদা চা বাগানের মানুষকে দিয়েছেন প্রায় বিনা খরচে জ্বালানির দিশা। চা বাগানের হেঁশেল কৃপার কৃপায় আলোকিত।।
ডুয়ার্সের সোনম ওয়াংচুক কৃপা #কৃপাহাঁসদা #ডুয়ার্স


More Stories
মাটির বুকে স্বর্গ, সাজুর ‘হেভেন’ বাঁচিয়ে রাখার প্রতিশ্রুতি পুলিশ প্রশাসনের
মদের ঠেকে ভাঙচুর প্রমীলা বাহিনীর
পাহাড়ি নদী ও অভয়ারণ্যের পাশ দিয়ে সুন্দরী ডুয়ার্সের বুক চিরে ছুটবে ট্রেন