সময় কলকাতা ডেস্ক : চাকরিতে ছাঁটাই হওয়া ঘটায় ইতিহাসের এক বিরলতম অপরাধ। আমেরিকার একটি পরিবারের রোজগেরে মানুষটির হাতে বাকি পাঁচজনের মানুষের ভবলীলা সাঙ্গ হওয়ার কারণ হয়ে উঠেছিল ঘাতকের চাকরিতে বরখাস্ত হওয়া । চাকরিতে বরখাস্ত হয়ে নিউজার্সির জন এমিল লিস্ট হয়ে ওঠেন এক নৃশংস খুনী। যদিও এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে লিস্টের পরলোকবাদে ও অতীন্দ্রীয় ধারণায় বিশ্বাসের কথা উড়িয়ে দেওয়া হয় না।লিস্ট নিজের বৃদ্ধা মা, স্ত্রী, দুই কিশোর পুত্র আর তরুণী কন্যাকে খুন করে আঠেরো বছরের জন্য কার্যত হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিলেন।সামান্যতম ক্লু না রেখে তিনি উধাও হয়ে যান। ১৯৭১ থেকে ৮৯ সাল পর্যন্ত আমেরিকার পুলিশ তাঁর টিকি ছুঁতে পারা দূরে থাক, তাঁর খোঁজ পায় নি।
নিউজার্সির ওয়েস্টফিল্ডের জন লিষ্ট ও তাঁর পরিবার এলাকায় সুনামের অধিকারী ছিল। তাঁরা ছিলেন সম্ভ্রান্ত। জন লিষ্ট ছিলেন ব্যাঙ্কের হিসাবরক্ষক। ছেলে মেয়েরা স্কুলের মেধাবী ছাত্র ছাত্রী হিসেবে পরিচিত ছিল। ধর্মপ্রাণ পরিবারের সব সদস্য নিয়ম করে গির্জায় যেতেন। রবিবার দিনে স্কুলের শিশুদের পড়াতেন লিষ্ট। তিনি তাঁর মা, স্ত্রী আর দুই পুত্র, এক কন্যাকে নিয়ে প্রাসাদোপম অট্টালিকায় বাস করতেন। বাড়িতে উনিশটি ঘর ছিল, ছিল বলরুম, ছিল মার্বেল ফায়ারপ্লেস। বাইরে থেকে দেখে লিষ্ট পরিবারকে এক বিত্তশালী সুখী পরিবার বলেই মনে হত।
আচমকা লিষ্ট পরিবারে নেমে আসে বিপর্যয় ও দুর্যোগের ঘনঘটা।১৯৭১ সালে জন লিস্ট ৪৬ বছর বয়সে ব্যাঙ্কে তার চাকরি খুইয়ে বসেন। তাঁর ও পরিবারের বিলাসবহুল জীবনযাত্রায় বড় ধাক্কা দেখা দিলেও জন আয় হারানোর কথা পরিবারকে জানাতে পারেননি।
তিনি কাউকে না জানিয়ে গোপনে স্টেশন লাগোয়া এলাকায় সময় কাটিয়েছেন স্রেফ খবরের কাগজ পড়ে। তাঁর প্রচুর ধার দেনা ছিল যা বাড়তে থাকে। বন্ধকী পরিশোধের জন্য তার মায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে গোপনে টাকা শোধ করতে থাকেন। সেই টাকাও শেষ হয়ে আসতে থাকে।
চরম আর্থিক সংকটে ভুগতে থাকা জন লিস্ট পরে জানিয়েছিলেন, সেসময় তার কাছে একমাত্র বিকল্প বলে মনে হয়েছিল তার মা, স্ত্রী এবং সন্তানদের হত্যা করা। বাস্তবে মনে করা হয়, আর্থিক সংকট চূড়ান্ত হতেই লিস্ট স্থির করেন যে তাঁর পুরোনো বিলাসবহুল জীবন ত্যাগ করে অন্য পরিচয় নিয়ে নিজেকে নিজের মত করে বাঁচতে হবে। সংসারের বাকি পাঁচজনের দায়বদ্ধতা দূর করে সব পারিবারিক অর্থ ও সম্পত্তির বিনিময়ে অন্যত্র জীবন যাপন করতে হবে। কিন্তু এর সাথে যোগ হয়েছিল খুনের পেছনে থাকা পারলৌকিক তত্ব।
১৯৭১ সালের ৯ নভেম্বর জন লিস্ট চরম পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে একে একে বাড়ির সবাইকে খুন করেন।ছেলে মেয়েরা স্কুলে বেরিয়ে যেতেই প্রথমেই জন রান্নাঘরে তার স্ত্রী ৪৬ বছর বয়সী হেলেনকে গুলি করে হত্যা করেন। স্বামীর গুলি তাঁর মাথার পেছনে এসে বিদ্ধ হওয়ার আগে হেলেন চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন ।তিনি তৃতীয় তলায় উঠে তার ৮৪ বছর বয়সী মা আলমাকে বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় বাঁ চোখের তলায় গুলি করে হত্যা করেন।
লিস্টের ১৬ বছরের মেয়ে প্যাট্রিসিয়া এবং ছোট ছেলে ১৩ বছরের ফ্রেডরিক স্কুল থেকে বাড়িতে পৌঁছাতেই তাদের এক এক করে মাথার পিছনে গুলি করে খুন করেন তিনি ।দুপুরের খাওয়া শেষ হতেই জন লিস্ট তার এবং তার মায়ের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার জন্য ব্যাঙ্কে যান।অতঃপর তার বড় ছেলে ১৫ বছরের জন ফ্রেডরিককে আনতে ওয়েস্টফিল্ড হাই স্কুলে যান। জন ফ্রেডরিককে বাড়ি নিয়ে ফেরার পরে জন তাঁকে নির্বিচারে বারংবার গুলি করে কারণ তার ছেলে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল ও একাধিক গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল। প্রাণে বাঁচে নি জন ফ্রেডরিক। তার নিজের আধা-স্বয়ংক্রিয় হ্যান্ডগান এবং তার বাবার কোল্ট পয়েন্ট টোয়েন্টিটু ক্যালিবার রিভলভার ব্যবহার করে তার পুরো পরিবারকে হত্যা করেছিল জন লিস্ট।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, লিস্ট তার স্ত্রী এবং সন্তানদের মৃতদেহ ম্যানশনের বলরুমে স্লিপিং ব্যাগের উপর রেখেছিলেন। তিনি তার মায়ের দেহ অ্যাপার্টমেন্টে রাখেন। এরপরে দেহগুলি সরিয়ে ফেলার কাজ শুরু করেন । তাঁর যাজকের কাছে একটি পাঁচ পাতার চিঠিতে তিনি তাঁর দোষ স্বীকার করে জানান যে তিনি পৃথিবীতে অনেক মন্দ দেখেছেন এবং তিনি তার পরিবারকে অশুভ থেকে বাঁচাতে হত্যা করেছেন। তিনি একএক করে বিভিন্ন অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলেন এবং একমাস অব্দি কেউ জানতেও পারেন নি হত্যার কথা। জানাও যায় নি লিস্ট পরিবার আছে কোথায়! যখন হত্যার কথা জানাজানি হয় তখন কর্পূরের মত উবে গেছেন জন লিস্ট।
১৯৮৯ সালে লিস্টের অপরাধটি ফক্স টেলিভিশনের প্রোগ্রাম আমেরিকা’স মোস্ট ওয়ান্টেড অনুষ্ঠানে সম্প্রচার করা হয়।অনুষ্ঠানে বয়সের সাথে সাথে লিস্টের চেহারা কেমন হতে পারে সেদিকে তাকিয়ে কাদামাটির মূর্তি এবং ফরেনসিক শিল্পী ফ্রাঙ্ক বেন্ডার দ্বারা ভাস্কর্য গড়ে তোলা হয় যা লিস্টের প্রকৃত চেহারার সাথে ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য বহন করে।অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে তাকে ভার্জিনিয়ার একটি অ্যাকাউন্টিং ফার্ম থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। সব প্রমাণ খতিয়ে দেখে লিস্টকে নিয়ে পুলিশ জেরা শুরু করে। নতুন পরিচয়ে, নতুন কাজে যুক্ত হয়ে নতুন সংসার পাতা লিস্ট মানতেই রাজি ছিলেন না তিনি আদতে নিউজার্সির হত্যাকারী জন লিস্ট। অবশ্য দফায় দফায় জেরা,আঙ্গুলের ছাপে মিল, অপরাধের পুনর্গঠন করে দৃশ্যে পাওয়া সংগতি ও প্রমাণ পাওয়ার পরে পুলিশ নিশ্চিত হয়ে যায় লিস্টের অপরাধ সম্পর্কে।পুলিশের কাছে ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারীর ১৬ তারিখে দোষ স্বীকার করে নেন লিস্ট।
ভার্জিনিয়া থেকে নিউ জার্সিতে ফিরিয়ে এনে লিস্টকে পরিবারের পাঁচজনের হত্যায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং প্যারোল ছাড়াই তাকে পরপর পাঁচ মেয়াদে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
লিস্ট বারবার জানিয়েছিলেন,আর্থিক সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় তাঁকে এরকম নৃশংস সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পাশাপাশি তিনি তদন্তে জানান তার উপলব্ধির কথা, তার পরিবারের সদস্যরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হয়েছিল।তিনি বিশ্বাস করতেন যে তাদের হত্যা করায় তাদের আত্মা স্বর্গে একটি নিশ্চিত স্থান পাবে। মৃত্যুর পরে তাদের সাথে যোগ হবে সে আশাও নাকি তিনি পোষণ করেন বলে জানিয়েছিলেন।লিস্ট ২০০৮ সালে ৮২ বছর বয়সে কারাগারে মারা যান। আর্থিক সংকট নাকি পরলোকে পরিবারের সাথে দেখা করার অতীন্দ্রীয় বাসনা কি তাঁর হত্যালীলার প্রেক্ষাপট ছিল তা নিয়ে লিস্ট এক ধোঁয়াশা তৈরী করেছিলেন। তবে মনে করা হয়,শুধুমাত্র আর্থিক কারণ লিস্ট পরিবারের সকলকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেন নি । ফলে জন লিস্টের কিছু কথা রয়ে গেছে আজও অজানা।।


More Stories
ডিএ এবং বেতনবৃদ্ধি, সরকারি কর্মীদের নিয়ে রাজ্য কী বলছে?
জামাইষষ্ঠীর নতুন অতিথি,গাছ থেকে আম পেড়ে খেল হাতি
বিয়ের গাড়ি সাজিয়ে গরুপাচারের ধুরন্ধর কায়দা ব্যর্থ