Home » সমকামিতা ও বাংলা চলচ্চিত্র

সমকামিতা ও বাংলা চলচ্চিত্র

সময় কলকাতা, তথাগত সরকার: শোনা যায় হাঁসুলি বাঁকের উপকথা চলচ্চিত্রে নারী নসুবলাকে দেখে পরিচালক তপন সিনহার উপর বেজায় চটে গিয়েছিলেন সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় । পরিচালককে সটান প্রশ্ন করেছিলেন নসুবালার চরিত্রে মেয়ে কেন ? হাঁসুলি বাঁকের উপকথা উপন্যাসে যে নসুকে আমরা দেখতে পাই আদতে আসল নসুকেই কোথায় গিয়ে ব্রাত্য করে রেখে দেন পরিচালক তপন সিনহা। ১৯৬২ সালে তপন সিনহা যখন “হাঁসুলি বাঁকের উপকথা ” ছবিটি বানালেন তখন অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তীকে নসুর চরিত্রে অভিনয় করালেন। কিন্তু উপন্যাসে নসুবালা আসলে মেয়ে নন সে আদতে একজন পুরুষ। তারপরেই তারাশংকরের গ্রামে গিয়ে নসুবালাকে নিজের চোখে দেখে আসেন পরিচালক তপন সিনহা। ৬০ দশকে সমাজের চাপে পরেই হয়ত একজন সমকামীর পূর্নাবয়ব ফোটাতে পারেন নি তপন সিনহা। “হাঁসুলি বাঁকের উপকথা ” ছবিটি তৈরি করে পরিচালক হয়ত দর্শক মহলে কদর পেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু সমাজের কাছে সমকামিতার প্রকৃত চিত্র ফুটিয়ে তুলতে অক্ষম হন তিনি। দেশকাল ভেদ করে আজকের সমাজে সমকামিতাকে নিয়ে দ্বিধাহীন ভাবে আলোচনা করলেও বাংলা চলচ্চিত্রে সমকামিতা আদেও কতটা গ্রহনযোগ্য হল পরবর্তী আলোচনায় সেই নিয়ে,কথা বলা যাক।

সমকামিতাকে মূল ধারার ছবি হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্রে যিনি নিয়ে এসেছিলেন তিনি হলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তার আগেও বেশ কিছু বাংলায় ছবি সমকামিতা ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। যেমন নীল নির্জনে। ছবিটির পরিচালনা করেছিলেন সুব্রত সেন। দুটি অপরিচিত মেয়ে একে অপরের খুব কাছের হয়ে উঠেছিল। আর সেখান থেকে দুজনের গভীর প্রেম। সমকামিতাকে একটু অন্যভাবে তুলে আনা হল দর্শকদের সামনে । দর্শকদের কাছে একটি ছেলে বা একটি মেয়ের মধ্যেকার প্রেমটাই শুধু সমাজে বিশেষ ট্যাগমার হয়ে রয়ে গিয়েছিল এতদিন। পরিচালক সুব্রত সেন দেখালেন ভিন্ন মানের প্রেম। যেখানে প্রেম শুধু ছেলে মেয়ের মধ্যেই গড়ে ওঠে না। আসলে প্রেম হয় সমমনের। জেন্ডার বা লিঙ্গ ভেদ করেও দুজনের মধ্যেকার ভালোবাসাতে কোথাও গিয়ে মনের জয় হয়। কোনো শরীরের অবয়ব দেখে নয়।

পরবর্তীকালে একটি টিভি চ্যানেলে কৌশিক গাঙ্গুলির পরিচালনায় মুক্তি পায় “একটু উষ্নতার জন্ম”। যেখানে অভিনয় করেছিলেন চূর্নি গাঙ্গুলি ও রুপা গাঙ্গুলি। কিন্তু ঋতুপর্ন দেখালেন এক অন্য ধারার ছবি। “আরেকটি প্রেমের গল্প” ছবিতে সমকামিতাকে দেখানো হল একটু অন্যভাবে। পরবর্তী কালে চিত্রাঙ্গদা, মেমরিস ইন মার্চ ছবিগুলির মধ্যে দিয়ে ঋতুপর্ন সমকামিতারই জয়গান গাইলেন বাস্তবের গল্পের মোড়কে।

এতদিন সমকামিতাকে দর্শক যেভাবে দেখছিলেন সেখানে থেকে সরে এসে ঋতুপর্ণ দেখাতে চাইলেন সমকামিতা শুধু হাস্যরস হিসেবে নয় তা আসলে বাস্তবের আয়না। এক শ্রেনীর মানুষের কাছে যেন নতুন কোনো দিগন্ত খুলে গেল। এরপর কৌশিক গাঙ্গুলির” নগর কীর্ত্তন” ছবিটি দর্শক মহলে এক বিশেষ সাড়া ফেলে দিয়েছিল । ছবিতে অভিনয় করে ঋদ্ধি সেনগুপ্ত পেলেন ঝুলিতে তখন বিশেষ পুরস্কার। যারপর থেকে সাবলিল ভাবে সমকামিতাকে নিয়ে বাংলা ছবির দৃশ্যে গল্প বলা শুরু করলেন পরিচালকেরা। সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত দ্বিতীয় পুরুষ ছবিতে দুই অভিনেতার লিপলক যেন সমকামিতার ট্যাবু ভেঙে নতুন বার্তা দিলেন।

আর এখান থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে সমকামিতাকে নিয়ে এক অন্য গল্প বলা শুরু করলেন পরিচালকেরা । কোথাও গিয়ে প্রেম শব্দটা যেন একটি ছেলে আর মেয়ের মধ্যেই স্থান পেয়ে আসছিল। কিন্তু চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে সমকামিতার রুপ নিল একটু অন্যভাবেই। সমমন আর সমলিঙ্গের মধ্যেও যে ভালোবাসা নিহিত থাকতে পারে তার প্রমাণ এই ছবিগুলি।

About Post Author