পুরন্দর চক্রবর্তী,সময় কলকাতা , ৪ জানুয়ারি : ৪৯ তম বইমেলা সমাপ্ত। বইমেলার শেষদিন মঙ্গলবার ছিল মানুষের ঢল,লোকারণ্য। সমাপ্তি অনুষ্ঠান ছুঁয়ে থাকল মন খারাপ। আরও একবছর অপেক্ষা। ৪৯ তম বইমেলায় প্রাপ্তি -অপ্রাপ্তি কী? এনিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই যে অর্ধশতাব্দী হতে চলা বইমেলায় এবারের বিক্রি রেকর্ড ছুঁয়েছে। গিল্ডের তথ্য অনুযায়ী, গতবারের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি বিক্রি হয়েছে। অর্থাৎ সবভালো তার শেষ ভালো যার। বই বিক্রি হচ্ছে একেই সারমর্ম ধরে নিয়ে তবুও প্রশ্ন,বইমেলায় কি প্রাণের অভাব রয়েছে? ভিড়ের মধ্যেও এই প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে যা ঠোঁট ছুঁয়ে গিয়েছে কিছু লেখক- লেখিকার। প্রচার সর্বস্বতা কি কোথাও গ্রাস করছে মেধাকে? মননশীল বইয়ের পাঠক কি কমছে? লেখিকা ঈশিতা ভাদুড়ী সরাসরি বললেন, ভিড় আছে তবুও যেন প্রাণ নেই। প্রকাশক আবিরলাল মুখোপাধ্যায়ও সিরিয়াস বইয়ের পাঠকদের সান্নিধ্যেও অস্থিরতা খুঁজে পাচ্ছেন নতুন প্রজন্মের পাঠকদের ক্ষেত্রে। তথাপি লেখক অদিতি বসু রায় বা হিমাদ্রি কিশোর দাশগুপ্ত বই বিক্রির মধ্যে যেভাবে বইমেলার সার্থকতা দেখছেন সেই ভাবনাকে খারিজ করছেন না তাঁরা। তবুও প্রশ্ন থাকছে।
Oplus_131072
বইমেলা ঘুরে প্রকাশক, লেখক -লেখিকা -পাঠকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের বিভিন্ন ধরণের ভাবনার প্রকাশের স্পর্শ পাওয়া গেল।কেউ বললেন বইমেলায় প্রাপ্তির কথা, কেউ বললেন প্রাপ্তির মধ্যেও শূন্যতার কথা।
লেখক হিমাদ্রি কিশোর দাশগুপ্ত বললেন বইমেলার বইয়ের সঙ্গে বিভিন্ন স্তরের মানুষরা জড়িয়ে আছেন এবং বইমেলা এক বৃহত্তর বাণিজ্য পরিসর এবং এবারের বইমেলায় বেশি সংখ্যায় বই বেশি সংখ্যক মানুষ কিনছেন। কবি হিসেবে খ্যাতি আছে অদিতি বসু রায়ের, তিনি এবার প্রথম উপন্যাস লিখেছেন, বইমেলায় উপন্যাসের কাটতি ভালো। তিনি বললেন, “হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটি” বা সামাজিক মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় বিষয় থাকলেও প্রচুর বই কিনছেন মানুষ। প্রকাশক আবীরলাল মুখোপাধ্যায় লিটল ম্যাগ স্টল থেকে পুস্তকপ্রেমী পাঠকের সঙ্গে সখ্যতার কথা বললেন, বললেন যাদের গভীর মননের সাথে যোগ তাঁরা যেভাবে লিটল ম্যাগাজিন স্টলে আসতেন আজও আসেন, হয়তো আগের চেয়ে বেশি সংখ্যায় তাঁরা আসছেন। তবুও তাঁর খেদ, নতুন প্রজন্মের মধ্যে যাদের বয়স খুব কম তাঁরা বাংলা ভাষা এমনকি বইয়ের প্রতি তাঁদের উদাসীন। প্রকাশক সুদীপ্তা সর্বজ্ঞ আবার এত বই বিক্রির মধ্যেও মনে করছেন, বইমেলায় এবং সারাবছর বইয়ের ক্ষেত্রে প্রকাশকদের বিভিন্ন দায়বদ্ধতা ও প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে লড়তে হয়। তাঁর মতে, সৎ -একনিষ্ঠভাবে প্রকাশনা চালিয়েও বইয়ে বাড়তি ছাড় দেওয়ার আবদার সহ বেশ কিছু অসুবিধার সামনে তাঁদের পড়তে হয় যা গ্রন্থব্যবসার অস্তিত্ব ছুঁয়ে যায়। বইমেলায় এই লড়াই যেন বেশি ভাবায় প্রকাশকদের!
বই ঘিরে চলতে থাকা মানুষের আবেগে ও বাণিজ্যের মধ্যেও অতীতের জন্য কোথাও মন কেমনের রেশ। অনেকে কাছে স্মৃতির অগোচরে পুরনো দিনের বইমেলার নস্টালজিয়া যেন ভিড়ের মধ্যেও আবেগের অভাব মনে করায়। প্রাণের স্পন্দন না খুঁজে পাওয়া ঈশিতা ভাদুড়ী মনে করেন, পাঠক এখন আগের মত বই নিয়ে চিন্তনশীলতা থেকে দূরে সরছেন। আগের মত আবেগ যেন নেই বইমেলায় তাই ১৯৭৭ সাল থেকে বইমেলায় আসা ঈশিতা ভাদুড়ী বলে ওঠেন, “এই বইমেলা আমার নয়।”
মানুষ বই কিনছেন, বেশি বিক্রি হচ্ছে তবুও কেন প্রাণের স্পর্শ পাচ্ছেন না কিছু বই প্রেমী? এই আশ্চর্য সংঘাতের উত্তর খুঁজলেন তরুণ প্রজন্মের লেখক রূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বললেন সিরিয়াস বা লঘু সাহিত্য – কোনো বিভাগের পাঠকদের দায়বদ্ধতা নেই সুনির্দিষ্ট বই বা আগ্রহের বিষয় খুঁজে নেওয়ার। সব ধরণের বইয়ের মেলবন্ধন কলকাতা বইমেলা, বৃহৎ পরিসরে কম বা সব ধরণের বইয়ের পাঠক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। হয়তো প্রচারের ফাঁকে কোয়ালিটির সঙ্গে কোয়ানটিটির সংঘাত রয়েছে, তবুও অসংখ্য পাঠক আসছেন, বই বিক্রি হচ্ছে, অপ্রাপ্তি ছাপিয়ে বইমেলার প্রভাব এখানেই, প্রাপ্তিও এখানে। বইয়ের মান কমছে কিনা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে লেখক লেখিকারা ভিন্ন মেরুতে। ভালো বইয়ের সংজ্ঞা ইতিহাস স্থির করবে, ৫০ বছর পরে প্রকৃত মূল্যায়ন হয়তো হবে, বললেন হিমাদ্রি কিশোর দাশগুপ্ত। মানুষ আসছেন, বই কিনছেন, বই পড়ছেন এবং এটাই পুস্তকশিল্পের প্রাণভোমরা। সবমিলিয়ে, মন কেমন ছাপিয়ে যাচ্ছে বই বিক্রি। এটাই প্রাপ্তি।।
More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
চলে গেলেন শংকর
প্লে-ব্যাক গানকে বিদায় জানালেন অরিজিৎ