Home » অভিনেত্রী মীনা কুমারী কে ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ?

অভিনেত্রী মীনা কুমারী কে ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ?

পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা : পাকিজা, সাহেব বিবি অউর গুলাম, দিল এক মন্দির, গজল, বৈজু বাওরা,দিল আপনা অউর প্রীত পরায়ে- একের পর এক সাড়া জাগানো সিনেমার নায়িকা তিনি। সিনেমায় আগমনের পরে দ্রুত দর্শকদের মন জয় করে দ্রুত প্রস্থান তাঁর। ট্র্যাজেডি কুইন মীনা কুমারীর প্রয়াণের আজ পঞ্চাশ বছর। সংবেদনশীল সব চরিত্র তাঁর জন্য মানানসই হয়ে উঠত। মন ছুঁয়ে যাওয়া অভিনয়ে আজও তিনি দর্শকদের অভিভূত করলেও অকালে প্রয়াত তারকার জীবন সম্পর্কে অনেক তথ্য মানুষের অজানা। অনেকেই জানেন না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশের সঙ্গে নাড়ির যোগ ছিল মীনাকুমারীর।

ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে মীনা কুমারী পা রাখার আগে তাঁর নাম ছিল মেহজবিন বানো।তাঁর অভিনীত সিনেমা দেখে আমরা আজও মুগ্ধ হই অথচ আমরা ক’জনই বা জানি বহুমুখী প্রতিভার মীনা কুমারী দক্ষ ছিলেন শায়েরি বা উর্দু কবিতা রচনায়।চমৎকার গান গাইতে পারতেন তিনি।আমরা অনেকেই এও জানি না যে তাঁর কবিদক্ষতার পেছনে রয়েছে তাঁর রক্তের সঙ্গে কবিতার গভীর যোগ । মীনা কুমারীর মা ও বাবা দুজনের সাথেই যোগ ছিল কবিতা ও গানের জগতের। মীনা কুমারীর বংশপরম্পরা ধরে আরও গভীরে গেলে পাওয়া যাবে আরও বিস্ময়কর তথ্য। যতদূর জানা যায় ,মীনা কুমারীর সঙ্গে রক্তের সম্পর্কে যোগসূত্র ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির।কী সেই যোগসূত্র?

মীনা কুমারী পিতৃপরিচয়ে ছিলেন পাঞ্জাবী মুসলিম । অথচ তাঁকে বাঙালি গৃহবধূ হিসেবে বিমল মিত্রের লেখা বাংলা উপন্যাসের হিন্দী চিত্ররূপ সাহেব বিবি অউর গুলামের ‘ছোটি বহু’র অভিনয়ে চমৎকার মানিয়েছিল ।প্রশ্ন অন্যত্র।বলা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মীয়া ছিলেন মীনা কুমারী। ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের বনিয়াদ তাহ’লে কোথায়? আর এখানেই উত্তর মিলবে যে জিনের তত্বে তাঁর মাতৃকুল অনেকটাই বাঙালিয়ানায় আচ্ছন্ন।

আশ্চর্য হলেও এটাই বাস্তব যে মীনা কুমারীর মা প্রভাবতী ছিলেন জন্মসূত্রে খ্রিস্টান।আবার, মীনাকুমারীর মাতামহী হেমসুন্দরী ছিলেন ব্রাহ্ম। মীনা কুমারীর সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের যোগসূত্র ছিলেন হেমসুন্দরী দেবী । প্রচলিত তথ্য বলে , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্কিত এক জ্ঞাতি ভ্রাতার  কন্যা ছিলেন তিনি।তবে হেমসুন্দরী দেবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্ঞাতি ভ্রাতার  কন্যা ছিলেন কিনা তা নিয়ে মতপার্থক্য আছে । তথাপি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচকরা বলেন,রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি ছিলেন হেমসুন্দরী । তিনি ছিলেন বালবিধবা। হেমসুন্দরী বিধবা হওয়ার কয়েক বছর পরে মিরাটে চলে যান ও নার্সের পেশা গ্রহণ করেন। সেখানেই তিনি পুনরায় বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন জনৈক লাল সাকির মিরুতির সঙ্গে যিনি ছিলেন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এক উর্দু সাংবাদিক। হেমসুন্দরীর দুই কন্যার অন্যতম ছিলেন মীনা কুমারীর মা প্রভাবতী। এই তত্বমতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝির নাতনি ছিলেন মীনা কুমারী। মীনা কুমারীর মা প্রভাবতী আবার মুসলিম ধর্মাবলম্বী আলী বক্সকে বিয়ে করার আগে মঞ্চ অভিনেত্রী ও গায়িকা হিসেবে সফল ছিলেন। কামিনী নামে মঞ্চে পরিচিত প্রভাবতী পাঞ্জাব থেকে মুম্বাই আসা আলী বক্সকে বিয়ের সময় মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেন।এই সময়ে প্রভাবতী ইকবাল বেগম নাম গ্রহণ করেন।মীনা কুমারীর বাবা আলী বক্স পাকিস্তানের পাঞ্জাব থেকে মুম্বাই আসার পরেও উর্দু ভাষায় লেখালেখি করতেন। উর্দু কবিতা রচনায় দক্ষতা ছিল তাঁর। এছাড়াও গানের শিক্ষক ছিলেন আলী বক্স।

ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে যোগসূত্র,বংশ পরম্পরায় গান ও সংগীতের এত প্রভাব সুপ্ত থাকতে পারে না। আর তাই অভিনেত্রী মীনা কুমারী তাঁর নায়িকাজীবনের ব্যস্ত সময়ের ফাঁকে গান লেখার সময় খুঁজে নিতেন। তাঁর দরদীয়া গলায় বেশ কিছু গজল বিখ্যাত হয়েছিল একসময় । ‘পুছতে হো তো শুনো’ বা ‘চাঁদ তনহা’ তাঁর অসাধারণ শিল্প প্রতিভার প্রমাণ।তাঁর লেখা শায়রী ও প্রথম সারির সাহিত্য রূপে স্বীকৃত হতে বাধ্য।লেখিকা হিসেবে তাঁর ছদ্মনাম ছিল নাজ।

১৯৩৩ সালে জন্ম হয়েছিল মেহজবিন বানো বা মীনা কুমারীর।সারাজীবন ধরে শিল্পী হিসেবে তিনি যা দিয়েছেন তার তুলনায় যোগ্য মর্যাদা পান নি বলেই মনে করেন চলচ্চিত্র সমালোচকরা। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল ঝড়-ঝাপটায় ভরা।তাঁর অভিনয় ও কবিতায়-গানে যেন তাঁর অপ্রাপ্তির অভিব্যক্তি লক্ষ্য করা যায়।বিষাদ নায়িকা বেশি দিনের আয়ু নিয়ে আসেন নি।মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মার্চ মাসের শেষ দিনে অসময়ে প্রয়াণ হয় মীনা কুমারীর।।

About Post Author