দেবিকা চট্টোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা ), সময় কলকাতা:
কিস্তি ৪
দুটো পাশাপাশি ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। ঘরগুলো বিশাল বড় আর বিছানাটাও বিশাল, চারজনের শোওয়ার মত।বড়বড় কাচের জানলা দিয়ে পাহাড় দেখা যায়। কোনো জানলায় গরাদ নেই,জানলার পাল্লা খুলে দিয়ে খুব সহজেই বাইরে চলে যাওয়া যায়। বোঝা গেল এখানে চুরির ভয় কেউ করেনা।ডুয়ার্সেও দেখেছিলাম মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসের বাতাবরণ। সবার সব জিনিসপত্র দরজার বাইরে পড়ে থাকলেও কেউ নেয়না। এমনকি গাড়িও মানুষ বাইরেই ফেলে রাখে চাবি সহ,যার দরকার হয় সে সেই গাড়ি ব্যবহারও করে। আমি সমতলের মানুষ এ ভাবতেই পারিনা।নানান সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক কারণ এর পিছনে থাকতে পারে,তবু এখানকার মানুষের শুভবুদ্ধির প্রশংসা না করে পারলাম না। দুপুরে চান খাওয়া সেরে জিনিস পত্র গুছিয়ে নিতে ই বিকেল হয়ে এল। সবাই জামাকাপড় পরে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম, আশপাশটা পায়ে হেঁটে ঘুরতে আর এখানের সুপরিচিত আরিটার লেক দেখতে।

হোম স্টে থেকে বেরিয়েই চারিদিকে ফুলের সমাহার। রাস্তার পাশে অযত্নলালিত পাহাড়ি ধুতরো গাছে অসংখ্য বড়বড় ফুল দেখে বীজ খোঁজার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কীমাশ্চর্যম্ বীজ নেই। সামনেই এক বাড়ির চত্বরে বসে কয়েকজন সিকিমিজ মহিলা গল্প করছিল, তাদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম ঐ গাছের ডাল পুঁতে নতুন চারা করা যায়।প্রতিটা বাড়ির আনাচেকানাচে ফুলের মেলা দেখে মন চঞ্চল হয়ে উঠছিল সেগুলো নেওয়ার জন্য। কিন্তু এখন তো বেড়ানো সবে শুরু,আরো তিন জায়গায় আমরা যাবো,এখন থেকে গাছ সংগ্রহ করে ব্যাগবন্দী করে রাখলে যদি না বাঁচে?এই ভেবে বিরত হলাম । উনি সান্ত্বনা দিলেন,এর পরে আরো উঁচু পাহাড়ে উঠলে আরো অনেক গাছ পাবো।

দুপাশের গাছপালা জঙ্গল দেখতে দেখতে চড়াই পথে এগিয়ে চললাম।এ পর্যন্ত যতটুকু দেখেছি তাতে মনে হল এই পাহাড়ে বাঁশের বেশ বাড়বাড়ন্ত।বড় বড় বাঁশের অজস্র ঝাড় এখানে সেখানে হয়ে আছে।আর এক ধরনের বাঁশ গাছ ও আছে, আকৃতিতে ছোট,এই বাঁশ গাছ নিজের ছাদ বাগানে পোঁতা যায়। খুব ইচ্ছে করছিল নিয়ে যেতে , কিন্তু বাঁশ নিয়ে যেতে কে আর সায় দেয়।তাই বিফল মনোরথ হয়ে লেকের দিকেই পা বাড়ালাম। আমাদের মত সমতলের বাসিন্দাদের চড়াই পথে হাঁটতে বেশ হাঁফ ধরে যাচ্ছিল, কিন্তু লেকে ধারে টিকিট কেটে পৌঁছতে ই মন ভালো হয়ে গেল।লেকটা কিছু টা ইংরেজি ‘সি’ আকৃতির চারিদিক বেড় দিয়ে রেলিং ও রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে চারিদিকে পাক দিলাম।এর প্রায় দুই পাশে পাহাড়ি জঙ্গল আর একপাশে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ঘরবাড়ি আর দুই একটা হোম স্টে। বোটিং এর ব্যবস্থা ও আছে এখানে। যাবার পথে কয়েকটি কুকুর আমাদের সঙ্গ নিয়েছিল।লেকের পাশেও অনেক বেড়াল ও কুকুরের আস্তানা দেখতে পেলাম।দুই এরই লোম ঝুমঝুম গা ও লেজ।কিই মিশুকে এরা, আমাদের পিছুই ছাড়ছিল না। পুরো রাস্তায় দুই পাশে নানান ফুল গাছ।একটা থোকা ফুলের নাম শুলাম লক্ষ্মীকমল।যত্রতত্র ফুটে আছে,পথের ধারে, পাহাড়ের গায়ে,নীল সাদা আর হৃলুদ রং এর। ধুতুরা আর নানা রং এর লিলি তো ছিলই।পাহাড়ের উপরে এই লেক, সেখানে ঢোকার আগে একটা গেট ও আছে, সেখানে টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশের ছাড়পত্র মেলে।এই গেটের সামনে দিয়ে পাকা রাস্তা চলে গেছে কিউখাম ভিউ পয়েন্ট এর দিকে। সেখানে দোরজি আগামীকাল নিয়ে যাবে আমাদের।আরিটার লেক দেখে আমরা আশেপাশে ঘুরে দেখার জন্য বেরিয়ে এলাম। চারিদিকে অপরূপা প্রকৃতির রূপ দেখে সবার চোখে মুগ্ধতা।এত্ত সুন্দর দৃশ্য,যে চোখ ফেরানো অসম্ভব।এবার রাস্তা উৎরাই, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অনেক নীচে নেমে গেছে জঙ্গল।তার পর আবার এক পাহাড়, দুটো পাহাড়ের মধ্যে অতল গিরিখাত। হয়তো সে সব জায়গা মানুষের অগম্য, হয়তো সেখানে বাসকরে কিছু বন্য প্রাণী। সেদিকে তাকিয়ে পৃথিবীর মধ্যে থেকেও পৃথিবীর বাইরে অবস্থান করা সেইসব রহস্যময় অঞ্চলকে নিয়ে নানান কল্পনায় মন বুঁদ হয়ে রইল খানিকক্ষণ।সন্ধ্যে হয়ে আসছিল দেখে আমরা ফিরতি পথ ধরলাম। কয়েকটা লোম ঝুমঝুম কুকুর আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলল।
নিজেদের মধ্যে খেলা করতে করতে একটু পরেই তারা হারিয়ে গেল জঙ্গুলে পথের বাঁকে।ফিরে এসে নিজেদের ডেরায় ঢুকে পড়লাম।ঘরে বসে সারাদিনে ক্যামেরায় ও মোবাইল ক্যামেরায় তোলা ছবিগুলো চারজনে মিলে দেখলাম।মেয়ের ছবি তোলার নেশা,ছেলেও এবার অনেক ছবি তুলেছে,তবে আমাদের ছবি একদম যত্ন নিয়ে তোলেনা ছেলে।ওর পছন্দ প্রকৃতি, অন্য দিকে মেয়ে সবই তোলে খুব যত্ন করে। আমার তো ধারণা তৈরি হয়েছে যে মেয়ে ছবি না তুলে দিলে আমার ছবি ভালো হয়না।এ ধারণা যে একদম সত্যি তার প্রমাণ ও বারে বারে পাই। এবার দুজনের তোলা ছবিগুলো ই ভীষন ভালো হয়েছে দেখে ভালো লাগলো।রাত সাড়ে আটটায় রাতের খাবার খাওয়ার আগে পর্যন্ত তোলা০ সমস্ত ছবি দেখা হল ও ফেলে আসা সেই পথের স্মৃতি আবার একবার রোমন্থন করে সুখ অনুভব করার চেষ্টা করলাম। রাতে তাড়াতাড়ি কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম, ভোরবেলা উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবো এই আশা নিয়ে।


More Stories
মরিচা ঝিল, বর্তির বিল : প্রশাসনিক উদ্যোগে পর্যটন শিল্পে আমডাঙার স্বপ্নপূরণ
মূর্তি পর্যটন কেন্দ্র পর্যটকশূন্য, মূর্তির মনখারাপ
সুনতালেখোলা : কমলালেবুর স্রোত,ঈশ্বরের পবিত্র বাসভূমি