Home » চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

দেবিকা চট্টোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা), সময় কলকাতা:

কিস্তি ৩

জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকতে খুব ভালো লাগছিল,যতক্ষণ পারলাম পাহাড়ের গায়ে জঙ্গলের গাছপালাগুলোর উপর বড় বড় ফোঁটায় ঝরে পড়া বৃষ্টি দেখলাম। গাছগুলোর ঝকঝকে সবুজ রং এর আন্দোলিত ডালপালাগুলোর আনন্দোচ্ছ্বাস আমার মনকেও উদ্বেলিত করে তুললো।কি এক অনির্বচনীয় আনন্দ,সেই ছোটবেলার বাধাবন্ধনহীন মনটাকে যেন ফিরে পেলাম।এ কাউকে বলে বোঝানোর নয়। নির্জনতা,সজীব প্রকৃতি আর একটা খোলা মন ই পারে জীবনের সমস্ত সমস্যাকে দূরে সরিয়ে রাখতে—এটা আমার বিশ্বাস। এ আমার জীবন দিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি। জীবনের নানা সমস্যার নিরসন করার জন্য তাই শহরের কর্মময় জীবন থেকে সরে গিয়ে নির্জনতায় কিছু সময় কাটিয়ে এলে নতুন প্রাণ ফিরে পাই আমি। ছোটবেলাটা এক অপরিসীম নির্জনতার মধ্যে কাটিয়েছি ছোটনাগপুরের মালভূমি অঞ্চলের এক আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায়। পিচ রাস্তা থেকে দূরে, বনের ধারে এবং এক বিশাল দিগন্তবিস্তৃত মাঠের ধারে ছিল আমাদের ছোট্ট কোয়ার্টার। নিস্তব্ধতা ছিল আমার জীবনের অঙ্গ। তাই বলি—-
“স্তব্ধতার গান শোনো”

বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছিল সমানে। নীচে এসে একজনের কাছে ছাতা ধার করে আমরা গাড়িতে উঠলাম,ছাতা জোগাড় করার কাজটাও দোরজিই করল অবশ্য।গাড়ি আবার রাস্তা ধরল। বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ি পথে ভ্রমণ বিপদজনক হলেও কিই যে রোমাঞ্চ তাতে,অনুভব করে মুগ্ধতা ছেয়ে যাচ্ছিল মনে।আগে যতবারই পাহাড়ে গেছি, ভয়ঙ্কর বমি করতে করতে গেছি, এবারও সেই ভয় ছিল প্রবলভাবে। বস্তুত সিকিম বা দার্জিলিং কোনো দিন যেতে পারব–একটা সময় এই আশাই ত্যাগ করেছিলাম পুরোপুরি। যখন পরিকল্পনা করা হল এই যাত্রার,’যা হবে হোক,যাবই’–এই ভেবে কপাল ঠুকে বেরিয়ে পড়েছিলাম। সঙ্গে অবশ্য নানা টোটকা, যেমন কর্পূর, লবঙ্গ,জোয়ান আর অসংখ্য প্যাকেট ভরে নিয়েছিলাম ব্যাগে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যাত্রায় ঐ পাকদন্ডী রাস্তায় ক্রমাগত বাঁক ওয়ালা ও কোথাও কোথাও বেশ খাড়া উচ্চতায় উঠতেও কোনো অসুবিধেই হলো না।এ এক অদ্ভুত ও অভিনব ব্যাপার। কিভাবে এই অসম্ভব সম্ভব হলো তা বোধগম্য হচ্ছিল না।যাই হোক,প্যাকেটে বমি করতে করতে যেতে হলে চারপাশের এই অপরূপ শোভা দেখতে পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতাম,সেটা হলো না বলে সেই পরম শক্তিমান কে মনে মনে প্রণতি নিবেদন করলাম। দুপাশের প্রকৃতি দেখে ও বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ি পথে এই যাত্রা যেন চলতেই থাকে এমনটাই মনে হচ্ছিল।দোরজি অসাধারণ দক্ষতায় একটার পর একটা বাঁক কাটিয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলছিল।আর আমরা অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত শোভা দেখতে দেখতে চলছিলাম। দুপাশের পাহাড়ের গায়ে গায়ে সাদা ধোঁয়ার মত মেঘ ছেয়ে গেল কিছুক্ষনের মধ্যেই।মাঝে মাঝে মেঘ সরে যাওয়ায় পাহাড়ের সারি দৃশ্যমান হচ্ছিল। মেঘের আড়ালে থাকা পাহাড়কে অদ্ভুত রহস্যময় ও ভয়ঙ্কর মনে হচ্ছিল। অসংখ্য পাহাড়ের সারির মাঝে মাঝে উপত্যকা, একদিকে খাড়া ও অন্যদিকে অতল খাদ আর এই পাহাড়ি বৃষ্টি সিক্ত জনশূন্য পথে আমাদের এই একলা গাড়িটা বিশালতার মাঝে এক তুচ্ছ নগণ্য উপস্থিতি বোধ হচ্ছিল। একপাশের খাড়া উঁচু পাহাড়ের উপর কোথাও কোথাও বৃহৎ পাথরখন্ড রাস্তার উপর ঝুঁকে আছে দেখে ভয় লাগছিল।বৃষ্টি ক্রমশ ঘন হয়ে এলে চোখের সামনের রাস্তা কুয়াশায় ভরে উঠল।দোরজি বলল ওগুলো মেঘ।আমরা তো অভিভূত।মেঘ আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই ভেসে চলেছে।

 


একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গেল,আমরাও আমাদের গন্তব্য গাড্ডিগাঁও পৌঁছে গেলাম।গাড়ি থেকে নেমে চারিদিকে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। রাস্তা থেকে সামান্য খাড়াই উঠে একটা বড় চাতাল,তার চতুর্দিকে অসংখ্য গাছপালার ছোটবড় টব, তাতে নাম না জানা ফুলের,পাতাবাহারের ও ক্যাকটাস জাতীয় গাছের সমারোহ। একটা বারান্দা পেরিয়ে আমাদের থাকার জায়গা।সেটা না দেখেই আমি এইসব গাছপালার ছবি তুলতে শুরু করলাম। একপাশে বিরাট এক ক্যাকটাসের গায়ে জড়িয়ে আছে অর্কিডের ফুল।মনে হচ্ছিল সব গাছের কাটিং বা চারা এখনই জোগাড় করে ফেলি। সবাই তাড়া দিয়ে আমায় বিরত করায় স্নান খাওয়ার উদ্যোগ নিতে বাধ্য হলাম। খাওয়ার ঘরের কর্মীরা বাঙালি হওয়ায় অনেক কিছু জানতে পারলাম তাদের কাছে। পিছনের দিকেও বিশাল জায়গা জুড়ে বাগান। বাগানের একপাশে বসার জায়গা করা আছে, তার মাথায় টিনের ছাদ।এর পরেই অতল খাদ। সেই খাদের গায়ে উপর থেকে নীচ পর্যন্ত নানান গাছপালা।খাদের পরে পাহাড়ের সারি চলে গেছে দূর থেকে আরো দূরে। খাওয়ার ঘরের সেই লোকটি বলল ঐ বসার জায়গা থেকে সামনে তাকিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়,যদি আবহাওয়া ভালো থাকে। একবুক আশা নিয়ে আগামীকাল ভোরের জন্য অপেক্ষায় রইলাম।

(চলবে, আগামীকাল পরবর্তী পর্ব )

About Post Author