Home » চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

দেবিকা চট্টোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা ),সময় কলকাতা:

কিস্তি ৫

পরদিন ভোরবেলা উঠে জানলা খুলে চারিদিক সাদা কুয়াশায় ঢাকা দেখতে পেয়ে হতাশ হয়ে আবার কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। এমনটাই হওয়ার কথা ছিল।কারণ গত কয়েকদিন ধরেই আবহাওয়া একেবারে প্রতিকূল। প্রকৃতির লীলাখেলা না মেনে আমাদের কোনো উপায় নেই,তাই উতলা না হয়ে ধৈর্য্য ধরার চেষ্টা করতে লাগলাম। আবার একটু ঘুমিয়েও পড়লাম।স্বপ্নে কাঞ্চনজঙ্ঘা এল।হিমালয়কে এই প্রথম দেখতে এসেছি,ছবি ছাড়া আর কোনো দিন হিমালয়কে দেখিওনি,তাই কল্পনায় কাঞ্চনজঙ্ঘা কে দেখতে দেখতে হঠাৎ এক ঠেলা খেয়ে ঘুমটা ভেঙে গেল।দেখি উনি সোয়েটার টুপি ইত্যাদি ধড়াচূড়ো পরে আমাকে বাইরে বেরোতে বলছেন তাড়াতাড়ি। লাফিয়ে উঠে চাদর জড়িয়ে ছুটে বাগানে বেরিয়ে দেখি অনেক লোকজন সেখানে উপস্থিত, সবাই ক্যামেরা আর মোবাইল ফোন নিয়ে তাক করে পশ্চিমদিকে তাকিয়ে বসে আছে আর তাদের উচ্ছ্বাসসূচক ছুটকো ছাটকা মন্তব্যও শোনা যাচ্ছে।আমিও হাঁ করে সেদিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম সত্যি কি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে? আমি তো কাঞ্চনজঙ্ঘার আকৃতি নিয়ে কোনো হোম ওয়ার্ক করে আসিনি,ছবিতে দেখেছি বটে পাহাড়ের ডগায় সোনালী চূড়ো,তবে সেটা অন্য পাহাড় ও তো হতে পারে? আমি নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয়ে চুপ করে রইলাম।শেষে উনিই দেখিয়ে দিলেন ঘুমন্ত বুদ্ধদেব কে। নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখলাম,কোনটা স্বপ্ন?আগেরটা না কি এটা? এই চূড়াটা ছিল সাদা রং এর। খাওয়ার ঘরের সেই কর্মচারী বললেন আবহাওয়া পরিস্কার থাকলে ভোর বেলায় ঐ সোনালী চূড়াই দেখা যায় ওখান থেকে। আবহাওয়া মেঘলা হওয়ায় সেটা আমাদের ভাগ্যে দেখা হলোনা। তবুও এই সকালে মেঘলা আকাশে রোদের ছটা দেখা দেওয়ায় আমাদের এই প্রাপ্তি।

” যাহা দেখিলাম জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিবনা”।
কে আমি? ক্ষুদ্র তুচ্ছ নগণ্য এক অজ্ঞ মানুষ বৈ তো নই।তাকেও দেখা দিয়েছেন জগৎ সংসারের আরাধ্য ঐ পরমপুরুষ,আর কি চাই?আমার মত সাধারণস্য সাধারণের এর বেশী কিছু আশা করাই তো অন্যায়। ঘুমন্ত বুদ্ধের পায়ে শতকোটি প্রণাম জানালাম নতমস্তকে। সাধারণ মানুষ থেকে তাঁর দেবত্বে উত্তরণকে স্মরণ করে আজও বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ি। নিজেদের সৌভাগ্যেও বিস্মিত হলাম।অনেক বেলা পর্যন্ত সবাই ঐদিকে তাকিয়েই দাঁড়িয়ে রইলাম। অনেক ছবি তোলা হলো।দোরজি তখন থেকেই আমাদের তাড়া দিচ্ছিল।চা খেয়ে একে একে স্নান করে আমরা জলখাবার খেয়ে ব্যাগ গুছিয়ে রেডি হলাম যখন, তখন সাড়ে দশটা বাজে।এর পরে চেয়েচিন্তে গাছ নেওয়ার পালা।হোম স্টের মালকিন বাগানে বসে গাছপালার ই পরিচর্যা করছিলেন,হাতে গ্লাভস পরে। আমি বলায় খুশি হয়েই দিলেন কিছু গাছের চারা ও কাটিং।দোরজি হাত লাগিয়ে তাড়াতাড়ি প্যাকেট ও মাটি জোগাড় করে দিল, গাছের ডাল ও ভেঙে দিল।মনে হয় দেরি হয়ে যাওয়ার জন্যেই ও তাড়াহুড়ো করে আমাকে সাহায্য করছিল।পরে রাস্তায় বেরিয়ে একটু ক্ষুণ্ণ স্বরেই বলল,”আপলোগনে ইতনা দের কিয়া ,লৌটনে মে দের হো যায়েগা, মুশকিল হোগা, ইতনা বারিষ মে রাস্তা বহোত খারাপ হ্যায়।” এর উত্তরে ওকে আমি বললাম,”হামলোগ ঘুমনেসে আয়া,ফ্রিলি ঘুমেগা,ছুটনা নেহি চাহিয়ে।” দোরজি ভাবলেশহীন মুখে চুপচাপ শুনলো, কিন্তু বাকিরা হাসতে লাগলো। আমি ও খানিকটা হেসে নিলাম ওদের সঙ্গে। সবার মন মুগ্ধতায় ভরা, ঠাট্টা করলেও কারো গায়েই লাগছে না।গাড্ডিগাঁও ছেড়ে গাড়ি বেরিয়ে আরিটার লেকের রাস্তায় পড়ল।ক্রমশ চড়াই পথে উঠতে শুরু করল গাড়ি,রাস্তায় দু একজন মাত্র মানুষের দেখা পাওয়া গেল।সেই পাকদন্ডী পথে পাহাড়ের অন্য দিকটা দেখতে পেলাম এবার।আমার উৎসুক চোখ নানান গাছপালা ও ফুলের দিকেই চলে যাচ্ছিল আর সেই গাছ নেবার জন্য ইচ্ছে প্রকাশ করায় সবাই নিরস্ত করল।এভাবে গাছ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সত্যিই অসম্ভব, কিন্তু মন মানেনা আমার। খানিকটা গিয়ে মানখিম ভিউ পয়েন্ট এর কাছে দোরজি আমাদের নামিয়ে দিল। অনেক গুলো সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের উপর উঠতে হলো সেখানে যেতে। সিঁড়ির দুপাশের পাহাড়ের ঢাল দেখতে দেখতে উঠলাম।

খানিকটা ওঠার পর এক হোম স্টে ,তার সামনে একটা বড়সড় গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুর আর একটা বাচ্চা বেড়ালছানা ঘুরে বেড়াচ্ছে,খেলছে দেখে পুলকিত আমরা। বেড়াল ছানা টা আমাদের সঙ্গ ধরে সিঁড়ি বেয়ে ভিউ পয়েন্ট অবধি পৌঁছে গিয়ে প্রবল স্বরে মিউ মিউ করে ডাকতে থাকায় আমি বেড়ালমনস্ক হয়ে পড়লাম।ছানাটা ওর মাকে খুজছে ভেবে আমার মন উতলা হয়ে উঠল।শেষে জঙ্গলের মধ্যে ওর মাকে খুঁজে পেয়ে চলে গেলে পরে আমি ভিউ পয়েন্ট থেকে নীচে তাকিয়ে চলৎশক্তিহীন হয়ে গেলাম।এখানের অবস্থানের কারণেই প্রায় ২৭০° কৌণিক অঞ্চল দৃষ্টিগোচর হওয়ায় এক অপূর্ব দৃশ্যের মুখোমুখি আমরা সকলে খানিকক্ষণ মূক হয়ে রইলাম। ওখান থেকে আরিটার লেকটাও দেখা যাচ্ছিল, আমাদের ছেড়ে আসা হোম স্টে টাও দেখতে পেলাম। আসলে একই পাহাড়ের পাকদন্ডী ঘুরে আমরা অনেকটা উঁচুতে উঠে এসেছি বলেই এমনটা সম্ভব হলো।এরপর আবার গাড়িতে উঠে আমরা পথ চলা শুরু করলাম।রাস্তায় লিঙথাম নদী দেখলাম, অনেক গুলো ওয়াটার ফলস্ দেখলাম,রাস্তায় চলা কর্মযজ্ঞ দেখতে দেখতে পদমচেন পৌঁছে গেলাম বিকেলবেলা। পাহাড়ের চূড়ায় আমাদের হোম স্টে।সামনে উন্মুক্ত অনন্ত শূণ্য।

চলবে ( আগামী কাল পরবর্তী অংশ )

 

About Post Author