Home » চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

চোগ্যালের দেশে : পায়ে পায়ে সিকিম

দেবিকা চট্টোপাধ্যায় (অতিথি লেখিকা) সময় কলকাতা:

কিস্তি ৬

গাড্ডিগাঁও থেকে পদমচেন পর্যন্ত পৌঁছতে যে রাস্তা আমরা পেরোলাম তার দু পাশে অপূর্ব সুন্দরী সিকিমের নানান উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে।দু চোখ ভরে দেখতে দেখতে দুপুরের কিছু পরে আমরা পৌঁছলাম।পদমচেন এক ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ। পুরো জনপদটাই পাহাড়ের গায়ের উপর।যেখানে আমাদের গাড়ি এসে থামল , সেখানেই রাস্তার শেষ।এই পাহাড়ের উপর এখানেই যাত্রা শেষ,এর পর যেতে হলে পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়া গতি নেই।আমাদের আজকের থাকার জায়গায় পৌঁছাতেও খানিকটা খাড়াই পথ হেঁটে উঠতে হল। সেখানে চাতালের মত একটা জায়গা,কয়েকপা হেঁটে আবার দুটো উঁচু সিড়ি বেয়ে হোম স্টের বারান্দায় উঠলাম।সারা বারান্দা জুড়ে ফুল গাছের সম্ভার দেখে যাত্রাপথের ক্লান্তি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। বারান্দা পেরিয়ে প্রথমেই বড় একটা লিভিং রুম,তার দু পাশে কয়েকটা বড় ঘর,তার ই দুটোয় আমাদের থাকার ব্যাবস্থা।একটু বেলা হয়ে গেলেও এখানে আমাদের জন্য রান্না করে রাখা ভাত খেলাম, হাতমুখ ধুয়ে। ঠান্ডার জন্য প্রত্যেকটা খাবার গরম করে ক্যাসারোলের মধ্যে দেওয়া,ঠান্ডার মধ্যে গরম খাবার খেয়ে আমাদের শরীর মন শান্ত হলো।বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা আর হিমেল হাওয়া বইছিল। গরম জলে হাতমুখ ধুয়ে আমরা বাইরে বেরিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে দাঁড়ালাম।

চারিদিকের দৃশ্য দেখে দেখে ফুরোয়না, দৃশ্যপটের বদল ঘটছিল অনবরত,এই মেঘ,এই বৃষ্টি,এই আবার পাহাড়ের একটা অংশে রোদ ঝলমলে। কোনো ক্যামেরার সাধ্য নেই এই সমস্ত দৃশ্যকে তুলে রাখার। একমাত্র চোখে দেখে অনুভব করা ও হৃদয়ের মণিকোঠায় সংরক্ষণ করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। আমাদের হোম স্টের মালিক বেশ মিশুকে বলে বোধ হল। অনেক স্থানীয় মানুষ জনকে এ বাড়িতে আসাযাওয়া করতে দেখলাম।স্বামী স্ত্রী মিলে হোম স্টে চালায় এরা। দুজনেই প্রচন্ড কর্মঠ, সংসারের সমস্ত কাজ দুজনে মিলেই করছিল আর গান গাইছিল দেখে খুব ভালো লাগলো। দোতলায় খাবার ঘরে আমাদের খেতে দিয়েছিল এখানে আসার পর।খোলা ছাদের একপাশে মুখ ধোওয়ার বেসিন।ছাদের এক দিক থেকে বহু দূর পর্যন্ত ফাঁকা,তারপর শুরু পাহাড়ের সারি। সকালে বেরোনোর পর রাস্তায় বৃষ্টি পেলেও এখানে বিকেলবেলা রোদ ওঠায় চারিপাশের দৃশ্য দেখতে পেলাম স্পষ্টভাবে।এই বাড়িটার একদম পিছনের দিকে এবাড়ির গা বেয়েই উঠে গেছে পাহাড়, আমাদের ঘরের জানালার পাশ দিয়েই পায়ে চলা পথ উঠে গেছে ঐ পাহাড়ের উপরে থাকা বাড়ি পর্যন্ত। আমাদের ঘরের জানালা দিয়েই মানুষের সেদিক দিয়ে যাওয়া আসা দেখা গেল। আমাদের হোম স্টের সামনের চাতালটুকু পেরিয়েই পাহাড়ের ঢাল, সেখানে একটা নতুন কনস্ট্রাকশন চলছে,তার পরেই অতল শূন্যতার শুরু। ছেলেমেয়েরা ঐ চাতালে পা ঝুলিয়ে বসে রইল সন্ধ্যের আগে পর্যন্ত।গানও গাইল ওরা এই উন্মুক্ত প্রকৃতির সামনে।সেই গানের সুর আর পাখিদের কলকাকলি মিশে গিয়ে তৈরি হল এক অপরূপ মোহমায়া।সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলে পাহাড়গুলো ক্রমশ কালো বিভীষিকাময় হয়ে উঠল ।

দিনের আলোয় যে পাহাড়গুলো সবুজ গাছে মোড়া, ভাসমান মেঘের আড়ালে দেখা যাচ্ছিল রাতের অন্ধকারে সেই পাহাড়ের রূপ একেবারে অন্যভাবে ধরা পড়ল আমাদের চোখে। এই স্তব্ধতা ও বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা বিস্ময়ে নীরব হয়ে গেলাম।অসামান্য সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে বসে থাকা যায় অনন্তকাল, কিন্তু বৃষ্টি শুরু হওয়ায় আর সঙ্গে হিমেল হাওয়া বইতে থাকায় উঠতেই হল। এই পাহাড়ের ওপারেই ভুটান,তাই এই পাহাড়ের গায়ে জনবসতি নেই বললেই চলে।ঘরে ফিরে সবাই হাতমুখ ধুয়ে সারাদিনের তোলা ছবিগুলো দেখলাম।সন্ধ্যের পর ঠান্ডা আরো বাড়লে আমরা জড়সড় হয়ে লিভিং রুমে বসলাম।এখানেও তিনটে ছোট বিছানা আর টেবিল পাতা রয়েছে। আমাদের সন্ধ্যেয় চা পকোড়া দিয়ে গেল সুদৃশ্য ঢাকনা দেওয়া চিনেমাটির কাপে।তার ওপরের কারুকার্যে স্থানীয় লোকশিল্পের ছোঁওয়া দেখে আমাদের খুবই ভালো লাগলো,হোম স্টের মালকিনকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলাম এগুলো কোথায় পাওয়া যায়, আমারও সংগ্রহে রাখার ইচ্ছে। রাতে এই লিভিং রুমেই আমাদের রাতের খাবার দিয়ে গেল।বিরাট বড় লিভিং রুমটাও আমাদের ব্যবহারের জন্য পেয়ে আমরা যারপরনাই খুশি।সন্ধ্যের পরে কনকনে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছিল,রাত বাড়লে ঘন কুয়াশায় চারপাশ সাদা হয়ে গেল,দরজা খুললেই এক এক টুকরো মেঘ ঘরে ঢুকে পড়ছিল। তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে আমরা শুয়ে পড়লাম।দোরজি আগামীকাল সকাল সকাল বেরোবো বলেছে, আগামীকাল অনেক দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের।যাওয়া এবং ফেরার জন্য যথেষ্ট সময় হাতে রাখা দরকার। বৃষ্টি ভেজা কুয়াশামোড়া বিপদসংকুল পাহাড়ি পথে সাবধানে চলতে হলে হাতে যথেষ্ট সময় রেখে গাড়ি চালাতে হবে।দোরজির এই কথা আমরা মেনে নিয়েই কালকের যাত্রা শুরু করতে চাই,তাই রাত বেশি না করে আমরা তাড়াতাড়ি বিছানাবাসী হলাম।

About Post Author