সময় কলকাতা ডেস্ক : মা আসছেন আর মা দুর্গার আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে মর্ত্যলোকে। ছড়িয়ে পড়ছে শারদীয়া উৎসবের সৌরভ।বাঙালি মেতে উঠতে চলেছে দেবী দুর্গার পুজো ও উৎসব উদযাপনে। দুর্গাপুজো প্রাথমিক ভাবে কেবলমাত্র রাজা, জমিদার এবং বাবু তথা ধনী সম্প্রদায়ের বাড়িতে আয়োজন হত । সেই কৌলিন্য আর ইতিহ্য মেনে আজও অনেক রাজা,জমিদার বা ধনী বংশের বংশধরেরা আয়োজন করেন দুর্গাপুজো। এরকম অনেক বনেদি বাড়ির পুজো আজও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বাংলার কোণে কোণে। উত্তর চব্বিশ পরগনার দত্তপুকুরের শিবালয়ে রায়বাড়ির দুর্গাপুজোও রাজ্যের অন্যতম প্রাচীন বনেদি বাড়ির পুজো।
বাংলার প্রাচীন দুর্গাপুজো কোনটি তা নিয়ে তর্ক বিতর্কের অন্ত নেই।তবে দুর্গাপুজো নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাঁদের আধুনিকতম মত,অধুনা রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা বারোভূঁইয়ার অন্যতম রাজা কংসনারায়ণ ৮৮৭ বঙ্গাব্দে বা ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দে দেবীদুর্গার প্রতিমা গড়ে প্রথম দুর্গাপুজো করেন।অর্থাৎ পুরানে যাই বর্ণনা থাকুক না কেন, বাঙালির দুর্গাপুজোর ইতিহাস ৫৪২ বছরের পুরোনো।বারোয়ারি পুজোর ইতিহাস বনেদি বাড়ির পুজোর তুলনায় অনেক কম প্রাচীন। বলা হয় হুগলির গুপ্তিপাড়ায় ১৭৯০ সালের ১২ জন বন্ধু মিলে প্রথম যে দুর্গাপুজো করেন তাকে বারো -ইয়ারি পুজো বলা হত যা থেকে বারোয়ারি পুজোর নামকরণ।তবে তার আগে থেকেই চলে আসছে বহু রাজা বা জমিদার বাড়ির পুজো। এরকম এক বনেদি বাড়ির পুজো হ’ল শিবালয়ের বুড়িমার পুজো বা রায় বাড়ির দুর্গাপুজো।
উত্তর চব্বিশ পরগনার শিবালয়ে বনেদি বাড়ির পুজো :
বহু বছর আগের কথা -তখনও বাংলায় ছিল রাজাদের পরাক্রম ।এমনই এক সময়ে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পুত্র রাজা শিবচন্দ্র দেশভ্রমণ উদ্দেশ্যে নদীপথে যাত্রা করেছিলেন। সুবর্ণবতী বা সূক্ষ্মবতী যা এখন শুঁটি নদী সেই নদী পথে ভেসে চলেছিল রাজার তরী। নদীবক্ষ ধরে চলা রাজার নৌকাবিহার থেমে যায় দুর্যোগপূর্ন আবহাওয়ায় -এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-ঘেরা দুর্গম স্থানে থামতে হয় তাঁকে । নৌকা থেকে নেমে সে স্থানের শোভায় মুগ্ধ হন রাজা শিবচন্দ্র।ঝড়জলের সে রাতে তিনি কাটান নদী তীরবর্তী অরণ্যসম ভুখন্ডে। বর্ষণমন্দ্রিত সেই রাতেই তিনি স্বপ্নে দর্শন পান নৃসিংহের আদলে মা-দুর্গার। দেবী তাঁকে আদেশ দিয়ে বলেন এখানেই তাঁর পুজো করতে। স্বপ্নে যে রূপ দেবীর দর্শন করেছিলেন পর্ণকুটির গড়ে তার আবাহন ও পুজো করেন রাজা শিবচন্দ্র। এখানে কিছুকাল বসবাসও করেছিলেন শিবচন্দ্র আর রাজার সাময়িক নিবাসস্থলকে ঘিরেই গড়ে উঠতে থাকে জনপদ। রাজা শিবচন্দ্রের প্রতিষ্ঠা করা পুজো বুড়িমার পুজো নামে পরিচিত।আজও নিজেদের রাজা শিবচন্দ্রের বংশধর দাবী করে শিবালয়ের রায় পরিবার নিষ্ঠা ভরে আয়োজন করে চলেছেন দূর্গাপুজো।একদা বনেদি পরিবারের সেই গরিমা আজ অস্তমিত হলেও কৌলিন্য কমে নি বুড়িমার পুজোর।

রাজা শিবচন্দ্রকে নিয়ে অজস্র জনশ্রুতি আজও ফেরে দত্তপুকুরের শিবালয়ের লোকমুখে।বলা হয়ে থাকে – রাজা শিবচন্দ্রের নাম অনুসারে এই রাজপাটের নাম হয় শিবালয়।বারাসাত থেকে চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে আমডাঙ্গার দিকে একটু এগোলেই পড়বে সন্তোষপুরের মোড়, জাতীয় সড়ক ছেড়ে আপনাকে ডান দিকে দত্তপুকুরের দিকে এগোতে হবে।দু কিলোমিটার গেলেই শিবালয়ের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে রাস্তার ওপরেই দেখতে পাবেন বুড়িমার মন্দির। এখানেই এতদঞ্চলের অন্যতম জাগ্রত দূর্গাপুজো হয়ে আসছে যুগযুগ ধরে। পুজোর প্রাচীনত্ব নিয়ে ইতিহাস আর জনশ্রুতির ব্যবধান মধ্যে অনেকটাই। অনেকে অতিরঞ্জন করেন। বর্তমান বংশধররাও তার ব্যতিক্রম নন।তবুও শিবচন্দ্র প্রতিষ্ঠিত পুজোকে ঘিরে ইতিহাস আর গল্পকথার মিশেল পুজোর প্রাচীনত্বকে খর্ব করে না কোনোভাবেই। ঐতিহ্য এবং প্রাচীনত্বের বিচারে নদীয়ার রাজ পরিবারের সাথে সম্পর্কযুক্ত রায় পরিবারের বুড়িমার পুজো প্রকৃত অর্থেই অন্যমাত্রাবাহী।তবুও গরমিল রয়েছে ইতিহাস আর জনশ্রুতির। বুড়িমার মন্দির যা কিনা হালে তৈরি হয়েছে তার প্রাকারগাত্রে লেখা আছে – ১৭১০ সালে প্রতিষ্ঠিত পুজো ।অর্থাৎ ৩১২ বছর আগের পুজো। ফলে অনেকেরই ধারণা এই পুজো নবাবি আমলের গোড়ার দিকে। পরিবারের দাবি এই পুজো সপ্তদশ শতকের এবং অন্তত সাড়ে তিনশো বছরের পুরোনো।আর এখানেই ইতিহাসের সাথে সংঘাত পরিবারের দাবী বা জনশ্রুতির। ইতিহাস বলছে মাত্র ছ বছর রাজা ছিলেন শিবচন্দ্র। তাঁর রাজপাটের সময়কাল ১৭৮২-৮৮…অর্থাৎ জনশ্রুতি আর ইতিহাস যদি যোগফল ধরা যায় তাহলে বলতে হয় এই পুজো অন্তত ২৩৪ বছরের প্রাচীন। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজ্যকাল (১৭২৮ -১৭৮২) ও শিবচন্দ্রের আনুমানিক জন্মসাল মাথায় রেখে শিবচন্দ্রের নৌকাবিহার কালকে তাঁর যুবরাজকালীন নদীযাত্রা ধরলেও তা কোনোমতেই ১৭৫০ সালের আগের হতে পারে না।পুজো অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগের হলেও পুজোর প্রাচীনত্ব দুশো চৌত্রিশ থেকে বড়জোড় দুশো সত্তর বছরের। ভারতের স্বাধীনতার আগের সময়কালের মানুষ এখনও বেঁচে আছেন – তাঁরাই বলেন পিতামহ, প্রপিতামহদের কাছে তাঁরা শুনেছেন রাজা শিবচন্দ্রের শুরু করা পুজোর ধারক ও বাহক রায় পরিবার যাদের শিরায় ধমনীতে নদীয়াধিপতি শিবচন্দ্রের রক্ত প্রবাহিত। পুজোর সময়কাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও পুজোর প্রাচীনত্ব নিয়ে মতানৈক্য নেই।

বুড়িমার পুজোর সাথে প্রথাগত পুজোর অনেক ক্ষেত্রেই অমিল। দেবীমূর্তি থেকে পূজা পালনের রীতি অনেকক্ষেত্রেই গতানুগতিকতার সংজ্ঞা ভেঙেছে প্রাচীন এই পুজো। কথিত আছে দেবীকে নৃসিংহ রূপে স্বপ্নে দেখেছিলেন মহারাজা শিবচন্দ্র রায় আর সেই নৃসিংহ রূপেই পূজিতা হতেন দেবী.. দেবী দশভুজা হলেও দুটি হাতই শুধু দৃশ্যমান অন্য আটটি হাতের অবস্থান গুপ্ত যা লুকোনো থাকে চুলের মধ্যে। শিবালয়ে সিংহবাহিনী দেবী মূর্তি নন, দেবীর অশ্বে অধিষ্টিতা। এরকম প্রথা চলে আসছে যুগ যুগান্ত ধরে। কিংবদন্তী অনুসারী শিবচন্দ্রে নৃসিংহ রূপে দেবীকে যেমন দেখেছিলেন সেভাবেই তাঁকে আজও পুজো করা হয় …
ঐতিহ্য মেনে বংশানুক্রমে পুজো হয়ে আসছে সম্প্রতি গড়ে ওঠা দেবীদালানে। পর্ণকুটিরে পুজোর সূচনা করেছিলেন রাজা শিবচন্দ্র রায়, এমনই কথিত । এরপরে বহু যুগ পার করে আসা একচালার পুজো আজ দেবী দালানে হওয়ায় কিছু নতুনত্ব এসেছে। শুরু হয়েছে নিত্যপুজো। দূর্গাপুজোতে পরিবর্তন কার্যত একটাই ছাগবলি বন্ধ হয়ে নিরামিষ বলি শুরু হয়েছে কয়েক দশক আগেই। কিন্তু সাবেকি প্রথা প্রায় সকলই বহমান। আজও জন্মাষ্টমীর পরে দেবী কাঠামো গড়ে প্রতিমা নির্মাণ শুরু হয়। মহানবমীর এক পক্ষ কাল আগেই শুরু হয় চন্ডী পুজোর মধ্যে দিয়ে আরতি দিয়ে শুরু হয় দেবী আরাধনা।

বুড়িমার পুজোর যে দিক উল্লেখের দাবী রাখে তা হল দন্ডিকাটা। এখানে দন্ডি কাটেন শতাধিক মানুষ।বুড়িমার দেবী খুব জাগ্রত -এই বোধ থেকে দন্ডিকাটার প্রথাও কালে কালে বহু মানুষের মধ্যে প্রসার লাভ করেছে। এই পরিবারের সদস্যরা জানান যে মনস্কামনা পূর্ন করতে বুক থেকে রক্ত দেবীকে উৎসর্গ করে থাকেন মানুষ।সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক বড় উদাহরণ বুড়িমার পুজো। আজও এলাকার সংখ্যালঘুদের অবারিত দ্বার দেবীর পুজোয় যে সম্প্রীতির কারণ খুঁজতে ঢুকতে হবে আরেকটি লোকশ্রুতিতে। একদা জনৈক রহমত আলী অসুস্থ অবস্থায় দেবী দর্শন পেয়েছিলেন।সুস্থ হয়ে পরবর্তীতে তিনি তার পুত্রদের নাম হিন্দু বা অন্য ধর্মমত অনুসারে রেখেছিলেন।রহমত আলীর প্রত্যক্ষ দেবীজ্ঞানে ঘটেছিল ধর্মীয় মেলবন্ধন।তিনি আজ নেই তথাপি তার বাড়ির সামনে একবার থেমে যায় নিরঞ্জনের আগে বিসর্জনের শোভাযাত্রা।
বুড়িমা দূর্গাপুজোর সার্বজনীন সুপ্রাচীন ঐতিহ্যর প্রমাণ রয়েছে নিরঞ্জনেও।দত্তপুকুর এলাকায় দত্তবাড়ির দূর্গাপুজো সহ একাধিক প্রাচীন দূর্গাপুজো হয়। প্রায় তিন শতাব্দী প্রাচীন পুজো বলে দাবী করা হয় দত্তবাড়ির পুজো। তথাপি পরম্পরা মেনে দত্তপুকুর অঞ্চলে বুড়িমার পুজোর ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে এসেছে। আজও রাজা শিবচন্দ্রর সূচনা করার পুজোর প্রতিমা নিরঞ্জন না হলে কোনো প্রতিমা বিসর্জনের রেওয়াজ নেই দত্তপুকুরে। আজ সুক্ষবতী/ সুবর্ণবতী নদী মজে এক খালের আকার নিয়েছে। বর্তমানকালে শুঁটি নদী নামে পরিচিত মৃতপ্রায় নদীতে বিসর্জন হয় দেবী।

বনেদি বাড়ির পুজো – বুড়িমার দূর্গাপুজোয় দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। হাজারে হাজারে মানুষ আসেন। গত দুবছর করোনা আবহে দূর্গাপুজো নিয়মনিষ্ঠা মেনে হলেও মুল দালানে জনতার প্রবেশ ছিল সীমাবদ্ধ। এবার আবার পুরোনো ছন্দে ফিরবে পুজো,আশাবাদী রায় পরিবার।।


More Stories
দুর্গা-অঙ্গনের শিলান্যাস করলেন মুখ্যমন্ত্রী, মন্দির তৈরির দায়িত্ব কাদের?
বুমরা-র পাঁচ উইকেট , ৪৬ রানে এগিয়ে গেল ভারত
Indian Premier League 2025: আইপিএলের মেগা নিলামে অংশ নেবেন বিশ্বজয়ী পেসার, নিলামের তালিকায় যোগ হল সৌরভ-হার্দিকের নামও