পুরন্দর চক্রবর্তী ও পাপ্পু সাঁতরা,সময় কলকাতা :
“মন্দিরের শোভিছে মাতা শ্রী রাজবল্লভী / শরৎ জ্যোৎস্না প্রভা বিশাল ভৈরবী ” দেব দেবী প্রধান বাঙালির দেবদেউল ও পূজার সংস্কৃতি সুপ্রাচীন আর দেবী রাজবল্লভীর মাহাত্ম্য বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডী কাব্যে উল্লেখ রয়েছে দেবী রাজবল্লভীর। শরৎ জ্যোৎস্না প্রভা যে দেবীর মধ্যে বিরাজমান তিনি মা চন্ডীর রূপান্তর হলেও শরৎকালে দেবী রাজবল্লভী দেবী দুর্গা রূপে পূজিতা হন হুগলির রাজবলহাটের রাজবল্লভী মন্দিরে। ইতিহাস, জনশ্রুতি আর বর্তমান দুর্গোৎসবের জাঁকজমক রাজবলহাটের দেবী মন্দিরের দুর্গা পুজোকে দিয়েছে অন্য মাত্রা। বঙ্গ সংস্কৃতির এক অনন্য ঐতিহ্য নিয়ে বয়ে চলা রাজবলহাটের দেবী রাজবল্লভীর দেবী দুর্গা রূপে আরাধনা ও শারদকালীন উৎসব উদযাপনের মধ্যে রয়েছে কিছু স্বকীয়তা।
রাজবল্লভী মন্দিরের দেবী ত্রিনেত্রা রাজবল্লভীর মধ্যে দুর্গা কালী ও সরস্বতীর রূপ যেন মিশে আছে। রাজবল্লভী মন্দির ও দেবী রাজবল্লভীকে ঘিরে ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে আছে লোককথা ও জনশ্রুতি।বর্তমানে সারা বছর রাজমল্লভী রূপে পূজিতা দেবী দুর্গোৎসবের চার দিন দেবী দুর্গা রূপে পূজিত হন । তবে আদিতে মন্দিরের প্রতিষ্ঠালগ্নে দেবী রাজবল্লভী পূজিতা হতেন । ঐতিহাসিকরা মনে করেন এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে।ষোড়শ শতকে ভুরিরাজ রাজা রুদ্র নারায়ণ রায়মুখুটি এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন।

তবে জনশ্রুতি বা অন্য একটি প্রচলিত মতে আদি মন্দিরটি ৭৮০ বছর আগে,১২৪২ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন রাঢ় অঞ্চলের ভুরি শ্রেষ্ঠী দের নিয়ে গড়ে ওঠা ভুরশুট রাজ্যের জনপদ রাজপুর বা বর্তমানের রাজবলহাটে রাজা সদানন্দ রায় রাজবল্লভী মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শোনা যায় মোহাম্মদ ঘোরীর আমলে দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে রাজা শনিভাঙ্গর কে পরাস্ত করে ভুরশুট রাজ্যের রাজপদে অধিষ্ঠিত হন চতুরানন।রাজা চতুরাননের জামাতা রাজা সদানন্দ রায় কে মন্দির নির্মাণ করতে সহযোগিতা করেছিলেন বণিক গুরু দাস। দামোদর ও রন নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে রাজত্ব করেছেন রাজা চতুরানন ও রাজা সদানন্দ।বলা হয়ে থাকে, দামোদরের তীরে জঙ্গলে পড়ন্ত বিকেলে ধ্যানে রাজা সদানন্দ যখন রাজবল্লভী মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা করার জন্য মায়ের স্বপ্নাদেশ পান তখন রাজার কাছে সুবৃহৎ মন্দির প্রতিষ্ঠার পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। কিছুকালের মধ্যেই মনস্কামনা পূর্ণ হয় তার। জনশ্রুতি, বণিক গুরু দাস নদীপথে সাতটি বজ্রা নিয়ে বাণিজ্যে বেরিয়ে রাজবলহাটে নোঙ্গর করেন। এক কিশোরীকে নদী তীরে দেখে তিনি অসৎ উদ্দেশ্যে বজ্রাতে ডেকে নেন বণিক গুরু দাস কিন্তু এরপর নদীর পাড়ে তাঁর ছটি বজ্রা ডুবে যেতে দেখে বণিক ওই কিশোরী কে ঈশ্বরের রূপ হিসাবে জ্ঞান করেন। অতঃপর মা রাজবল্লভী বণিক কে নির্দেশ দেন তাঁর মন্দির প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাজা সদানন্দকে অর্থ সাহায্য করার জন্য।মন্দির প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই পূজিত হয়ে আসছেন মা রাজবল্লভী।
ঐতিহাসিকরা মনে করেন রাজা রুদ্রনারায়ণ বর্তমান মন্দিরটি ষোড়শ শতকে নির্মাণ করার পরবর্তী সময়ে দেবী রাজবল্লভী দুর্গোৎসবের ঋতুতে দুর্গা রূপে পূজিতা হন। এক যুগ পর পর গঙ্গাজল ও গঙ্গা মাটি দিয়ে নির্মাণ করা মূর্তি স্থাপন হয় অক্ষয় তৃতীয়ার দিন। আদি মন্দির ধ্বংস হয়ে গেছে কালের নিয়মে, বিংশ শতকে নতুন করে স্থাপিত হয় মন্দির, ১৯৩৩ সালে প্রভূতভাবে সংস্কার করা হয় এই মন্দিরের।

দুর্গা পূজার চার দিন লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয় রাজবল্লভী মায়ের মন্দিরে।দুর্গা রূপে পূজার সময় পুঞ্জিকার নির্ঘন্ট মেনে পূজা হয়না মায়ের।জল ঘড়ির সময় ধরে মা রাজবল্লভী পূজিত হন দেবী দুর্গা রূপে।মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের কাছেই আছে জল ঘড়ির ঘর।ঘড়িয়াল আসেন পঞ্চমীর দিন।আগে যখন ঘড়ি ছিল না তখন একটি জল ভর্তি পিতলের হাঁড়ির মধ্যে একটি জল ভর্তি বাটি রাখা হত ১২ ঘন্টাব্যাপী সারা দিনে ত্রিশ বার ডুবত বাটি অর্থাৎ এক দিনে ত্রিশ দণ্ড আর সাত দন্ড সমান এক প্রহর। প্রহরের হিসাব ধরে পঞ্চমী থেকে দশমীর পূজা নির্ধারণ করা হত যা বর্তমানেও এই দন্ড বা প্রহরের হিসাব কোষে দুর্গা রূপে পূজিতা হন মা রাজবল্লভী।শুধু রাজবল্লভী মায়ের পূজা নয় জল ঘড়ির সময় ধরে গোটা রাজবলহাট গ্রামের দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয় আজও ।নবমীতে দেওয়া হয় মোষ বলি, এবং এক বিশেষ পদ্ধতি মেনে বলি দেওয়া হয় একটি ছাগ ও একটি ভেড়া,এই বলির প্রথাও চলে আসছে প্রায় আবহমান কাল ধরে।শ্বেত বর্ণের মায়ের মূর্তিকে শ্বেত কালিও বলা হয় ,তবে রাজবল্লভী মাকে দুর্গা রুপা পূজা করার সময় মানা হয়না পুঞ্জিকায় উল্লেখিত নির্ধারিত সময় বা নির্ঘন্ট।পূজা হয় জল ঘড়ির নির্ঘন্ট মেনে। চৈত্র সংক্রান্তি ছাড়া দুর্গাপূজার মধ্যে একমাত্র নবমীর দিন মাকে দেওয়া হয়না কোনও ভোগ।
তিন বংশের পুরোহিত বংশানুক্রমে মন্দিরের পৌরহিত্য করে আসছেন যুগ যুগ ধরে ,মন্দিরে পূজার জন্য তিনটি আসন আছে।মন্দিরের সংলগ্ন অবস্থিত আছে নাট মন্দির,শিব মন্দির,নহবৎ খানা এবং নিত্য ভোগের জন্য আছে রন্ধন শালা।প্রতিদিন মাছ সহ অন্যান্ন শাক সবজি দিয়ে একটি পদ রান্না করে ডাল ভাতের সাথে মাকে ভোগ নিবেদন করা হয় তার সাথে দেওয়া হয় পায়েস।সেই ভোগ প্রতিদিন আগত মায়ের ভক্তদের ও দেওয়া হয়। দুর্গোৎসবের চারদিন ভক্ত সমাগমে রাজবল্লভী মন্দির হয়ে ওঠে তীর্থক্ষেত্র।রাজপুর বা রাজবলহাট, রাজা সদানন্দ বা রাজা রুদ্র নারায়ণ যেনামে বা যার প্রচেষ্টায় রাজবল্লভী মন্দির নির্মিত হোক না কেন, অতীতের মন্দিরের ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে আছে মধ্যযুগীয় বঙ্গের ইতিহাস। বর্তমানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মবিশ্বাস, জাঁক জমক আর জৌলুস। বাঙালি দুর্গোৎসবকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে হুগলির রাজবল্লভী মন্দিরের দুর্গাপুজো।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
চিকিৎসকের বঙ্গসংস্কৃতির উদযাপন নববর্ষে
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ