সময় কলকাতা ডেস্ক :
উমা আসছেন মর্ত্যলোকে। এবছর দেবীর আগমন গজে। দেবী গজে এলে শাস্ত্রমতে মর্ত্যলোক ভরে ওঠে সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধিতে। পূর্ণ হয় ভক্তদের মনোবাঞ্ছা। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি বা দুর্ভিক্ষ হয় না। গঙ্গারামপুরের দুর্গাবাড়ির দুর্গাপুজোর প্রেক্ষাপট ভিন্ন।এক সাধু পঞ্চমুন্ডির আসন প্রতিষ্ঠা করার পরে শুরু হয়েছিল দুর্গাপুজো। বিপত্তারিণী হিসেবেই যে দুর্গাপুজোর শুরু তা অনুমান করা গেলেও পরবর্তীতে দেশমাতৃকার পুজোয় নিবেদিতপ্রাণ বিপ্লবীরা দূর্গাপুজোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। গঙ্গারামপুরের দুর্গাবাড়ির দুর্গাপুজোয় জড়িয়ে আছে শতাধিক বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
পঞ্চমুন্ডির আসন প্রতিষ্ঠা হয় তন্ত্রমতে সাধনার জন্য। অশুভ থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে পঞ্চমুন্ডির আসন পেতে দেবী পূজা হয় তন্ত্র মতে। আজ থেকে শতাধিক বছর আগে বর্তমানে গঙ্গারামপুরের দুর্গাবাড়ি এলাকায় কোনও এক সাধু অশুভ কে দূর করতে দুর্গতিনাশিনী দুর্গার আরাধনা আয়োজন করেছিলেন। কালক্রমে আচমকাই তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। পুজোর ধারাবাহিকতায় কিন্তু ছেদ পড়েনি। সাধুর শুরু করা পূজোর দায়ভার কাঁধে তুলে নেন অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা। দেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে নিয়োজিত প্রাণ বিপ্লবীদের গুপ্ত সমিতি ছিল অনুশীলন সমিতি । অনুশীলন সমিতি বিংশ শতকের গোড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আর এর সাথে জড়িয়ে পড়েছিলেন তৎকালীন দিনাজপুরেরও একদল যুবক। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন স্বর্ণকমল মিত্র। স্বর্ণকমল মিত্র ও তার সহযোগীদের লক্ষ্য ছিল দেশমাতৃকার পূজা করা। আর হয়তো তাঁরা তাই তাঁদের গ্রহণ করা দেশ স্বাধীন করার গুপ্তমন্ত্র কে মিশিয়েছিলেন অশুভ দূর করার মাধ্যম দুর্গা দুর্গতিনাশিনীর বন্দনায়।পূজা চলতে থাকে পরম্পরা মেনে।
আজ থেকে ১০০ বছর আগে বিপ্লবীদের পুজো অত্যন্ত প্রসিদ্ধি লাভ করে। ইংরেজ শাসক দের চোখে এই পুজো ছিল স্বদেশীদের পুজো। বাধা নিষেধ আরোপিত হলেও পুজোর আয়োজন থেকে বিরত থাকেননি দেশপ্রেমী দামাল ছেলেরা। পরবর্তীতে স্বর্ণকমল মিত্র মারা যাওয়ার পর তাঁর পরিবার সদস্যরা ও এলাকার মানুষ একই রীতিনিয়মে নিষ্ঠার সাথে পুজোর আয়োজন করে আসছেন।দূর্গাবাড়ির পূজোয় আজও নবমীর দিন বলি হয়ে থাকে। পুজোর তিনদিন ঘি-ভাত ফ্রাইডরাইস সহ অন্নভোগ নিবেদন করা হয়। দশমীর দিন পূর্ণভবা নদীতে প্রথম দুর্গাবাড়ির প্রতিমার ভাসান দিয়ে শুরু হয় বিসর্জনের পালা। পুজোর কটা দিন বাসিন্দাদের বাড়িতে রান্না বন্ধ থাকে। সকলে মিলে পূজো প্রাঙ্গনেই তাঁরা এক সাথে খাওয়াদাওয়া করেন। দুর্গাবাড়ির পূজো ও প্রতিমা দেখতে গঙ্গারামপুরের বাইরেরও দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন আসেন।

পঞ্চমুন্ডি এবং অনুশীলন সমিতির মন্ত্র গুপ্তির ঐতিহ্য যে পুজোর মধ্যে ছিল তা কালের সাথে সাথে কার্যত বারোয়ারি পূজোর আকার নিয়েছে। থেমে থাকে নি দুর্গোৎসবের আয়োজন। আজও গঙ্গারামপুরে দুর্গতিনাশিনীর আয়োজন ঘিরে হৃদয়ের টান অনুভব করেন এলাকার প্রতিটি মানুষ। দুর্গা পুজো হয়ে ওঠে সার্থক ও শাশ্বত।
গঙ্গারামপুরে পঞ্চমুন্ডির আসন পেতে যে সাধু দুর্গাপূজো শুরু করেছিলেন সেই নিখোঁজ সাধু আর ফিরে আসেননি। বহুদিন হল অমৃত লোকের যাত্রী অনুশীলন সমিতির স্বর্ণকমল মিত্র বা বিভা মিত্ররা। দুর্গতিনাশিনী দূর্গা আজ দুর্ভিক্ষ দূর করার জন্য বা দেশ স্বাধীন করার জন্য আরাধ্য হন না, মানুষ দুর্গোৎসবে অনাবিল আনন্দের স্বাদ পেতে। দুর্গা বাড়ির দুর্গাপুজোর আয়োজনের মধ্যে আজও রয়েছে সুখ সমৃদ্ধি এবং রোগমুক্তির কামনা ।।


More Stories
হর্ষ-বিষাদে পালিত ঈদ-উল-আযহা
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
চিকিৎসকের বঙ্গসংস্কৃতির উদযাপন নববর্ষে