Home » বসিরহাটের সংগ্রামপুর কালীমন্দিরের ইতিহাস  

বসিরহাটের সংগ্রামপুর কালীমন্দিরের ইতিহাস  

সময় কলকাতা ডেস্কঃ বসিরহাটের সংগ্রামপুরের কালীমন্দির মানেই তার সঙ্গে যুক্ত ছ’শো বছরের পুরনো ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আড়ম্বর। এখানে আজও অটুট পাঁঠা বলির প্রথা। এই মন্দিরের এক মাইলের মধ্যে অন্য কোনও কালীপুজো হয় না। এই মন্দির স্থাপিত হবার পর থেকে এই প্রথাই চলে আসছে। এখানে মা পূজিত হন দক্ষিণা কালী রূপে। দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরের পরই এই কালী মন্দিরের স্থান। জানা গিয়েছে,রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই মন্দির নির্মাণের জন্য জায়গা দান করেন। এরপর কৃষ্ণচন্দ্র এবং গ্রামবাসীদের উদ্যোগে এই কালী মন্দির স্থাপিত হয়। তবে আজ মন্দিরের যে রূপ, তেমনটা আগে ছিল না। শুরুতে একটা খড়ের চাল দেওয়া মন্দির ছিল। তারপর ভক্তদের দানে ও মন্দিরের উন্নয়ন কমিটির সৌজন্যে বর্তমানে অসাধারণ রূপ পেয়েছে মন্দির। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় মন্দির স্থাপিত করার পাশাপাশি এই মন্দিরে পুজো করার জন্য বর্তমান পূজারি চক্রবর্তীদের পূর্বপুরুষদের বঙ্গোপসাগরের কোল থেকে রাজা নিয়ে আসেন এই সংগ্রামপুরে বসবাসের জন্য। কালের নিয়মে এই চক্রবর্তী পরিবারের বিভিন্ন সদস্যই এখানে পুজো করে চলেছেন দশকের পর দশক ধরে।

বর্তমানে এই চক্রবর্তী পরিবারের ৮ জন শরিক। পূজারিরা প্রত্যেকেই একই পরিবারের একই গোত্রের। একেক জন পূজারি ৯দিন করে পুজো করেন এই মন্দিরে। তবে এই চক্রবর্তী পরিবার ছাড়াও এখানে আরও ব্রাহ্মণ পরিবার আছে। কিন্তু তাদেরকে এই মন্দিরে পুজো করতে দেওয়া হয় না। সেই কৃষ্ণচন্দ্রর সময় থেকে এটাই প্রথা। কথিত আছে, এই মন্দিরে মা কালীর সামনে রাখা ঘটটি সংগ্রামপুরের বাসিন্দা বাসব সরদার নামে এক মুসলিম ব্যক্তির হাতে ধরে আসে। আর এই ঘটকে অবলম্বন করেই এই মন্দির গড়ে ওঠে। যদিও মন্দিরে মায়ের যে মূর্তিটা রয়েছে, তা কী দিয়ে তৈরি তা কেউই এখনও পর্যন্ত জানেন না। এমনকী কে মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করেন, তাও এই মন্দিরের প্রবীণ পূজারিদের কাছে অজানা। মন্দিরে নিত্য পুজো তো চলেই,সেইসঙ্গে মায়ের জন্য প্রতিদিন ভোগের আয়োজনও থাকে। মা কালীকে একেক দিন একেক রকম ভোগ নিবেদন করা হয়। যেমন লুচি, চিঁড়ে, ফল, খিচুড়ি,পায়েস ইত্যাদি। শ্যামা পুজো উপলক্ষে আমিষ ভোগও দেওয়া হয় মা কালীকে। যেমন চিংড়ি মাছ ও কচু শাক। এছাড়াও পাঁঠা বলি দিয়ে মাকে বলির কাঁচা মাংস নিবেদন করা হয়।

এখানে শ্যামা পুজোর দিন কিছু বিশেষ রীতি বা প্রথা রয়েছে, যা চলে আসছে প্রায় ৬০০ বছর ধরে। যেমন, এই মন্দিরে প্রত্যেক বছর শ্যামা পুজোর আগে নতুন করে মায়ের মূর্তিতে রং করা হয়। তবে মায়ের মূর্তি বহু পুরনো হওয়া সত্ত্বেও মূর্তির কোনও সংস্কারের প্রয়োজন হয় না। শ্যামা পুজোর দিন সকাল ৮টার মধ্যে মায়ের চক্ষুদান করার প্রথা আছে এখানে। শিল্পী এসে মায়ের চোখ আঁকেন, তারপর পুরোহিতরা দৃষ্টিদান করেন। এরপর এদিন সন্ধ্যাখয় শুরু হয় ঘন্টা-কাঁসর সহযোগে সন্ধ্যা আরতি, যা ভক্তদের কাছে খুব প্রিয়। এরপর রাত ১০টা নাগাদ বিশেষ পুজো শুরু হয়, যা চলে সারারাত ধরে। তৃতীয় প্রহরে পুজোর পর চতুর্থ প্রহরে অর্থাৎ ভোরের দিকে হয় বলি। তারপর আরতি ও পুষ্পাঞ্জলি হয়। কিন্তু এখানে পুজো উপলক্ষে হোম হয় না। কারণ শাস্ত্রমতে হোম করলে ঠাকুরের বিসর্জন দিতে হয়। যেহেতু প্রতিষ্ঠিত মন্দিরের বিসর্জন বলে কিছু হয় না তাই এখানে হোম হয় না। শ্যামা পুজোর দিন দেবীর ভোগে থাকে মটরের ডাল দিয়ে এঁচোড়ের তরকারি, কচুরমুখী ও চিংড়ি মাছের তরকারি, সঙ্গে সাদা ভাত। এছাড়া মায়ের কাছে নিবেদন করা হয় পাঁঠা বলির কাঁচা মাংস। আজ পর্যন্ত এই ভোগের তালিকার কোনও পরিবর্তন হয়নি।

About Post Author