কালীপুজোয় বারাসাত ( প্রস্তুতি পর্ব)
পুজো সংগঠক : আমরা সবাই
পুরন্দর চক্রবর্তী, সময় কলকাতা :
” দেশে দেশে গ্রামে গ্রামে তব নাম সুধা পানে মাতুক যত নরনারী ” – দুর্গাপুজোর পরে বঙ্গ মেতে ওঠে কালীপুজোর উৎসবে। আর বঙ্গের কালী পুজোর কথা বললে বারাসাতের নাম তো উঠবেই।বারাসাতের প্রধান উৎসব কালীপুজো। বারাসাতের কালী পুজোয় প্রতিবারই নামে দর্শনার্থীদের ঢল। গত দু’বছর করোনার কারণে দর্শনার্থীদের ভিড় অদৃশ্য ছিল। বিগ বাজেটের ক্লাব গুলি এ বছর আবার পূর্ণ উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েছে কালী পুজোর আয়োজনে। বারাসাতের আমরা সবাই শ্রী শ্রী শ্যামা পুজো কমিটির আয়োজন তাঁদের করোনা কালের আগের কয়েক বছর ধরে বারাসাত তথা রাজ্যের নজর কেড়েছে। এ সময় কলকাতা থেকে কালীপূজো উপলক্ষে প্রচুর মানুষ ভিড় জমান বারাসাতে। আমরা সবাই শ্রী শ্রী শ্যামা পূজার মন্ডপে এবার উঠে আসছে কর্নাটকের কোটি লিঙ্গেশ্বরের শিব মন্দিরের অবিকল রূপ।
মহেশ্বর বা শিবের উল্লেখ হিন্দু ধর্মে বারবার গুরুত্ব সহকারে ঘুরে ফিরে আসে। হিন্দু ধর্মে ত্রি-শক্তির উল্লেখ আছে। এই ত্রিশক্তি হলেন ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। এদের মধ্যে শিব প্রধান। কর্ণাটক রাজ্যের কোলার জেলার কমমাসান্দ্রা গ্রামে অবস্থিত কোটি লিঙ্গেশ্বর শিব মন্দির বিশ্বের বৃহত্তম ও অন্যতম শিবমন্দির হিসেবে খ্যাত। কর্নাটকের কোটি লিঙ্গেশ্বর শিব মন্দির এবার দেখতে পাওয়া যাবে নবপল্লি বয়েজ স্কুল আমরা সবাই ক্লাবের কালীপুজোর মণ্ডপসজ্জায় । উল্লেখ্য,তন্ত্র অনুসারে কালী দশমহাবিদ্যার প্রথমা দেবী। কেরালা ব্যতীত সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশে কালীকে ভগবান শিবের স্ত্রী পার্বতীর রূপ হিসাবে বিশ্বাস করা হয়। কেরালার লোকবিশ্বাস অনুসারে— ভগবান শিবের তৃতীয় নয়ন থেকে রাক্ষসদের ধ্বংস করার জন্য তিনি আবির্ভূতা হন, তাই তিনি মহাকালী। কালীর নামকরণের কারণ বলা হয় যে শিবের অপর নাম কাল, যা অনন্ত সময়কাল বোধক। কালী হচ্ছে কাল-এর স্ত্রীলিঙ্গ বোধক। মা কালী মা দুর্গা বা পার্বতী’র সংহারী রূপ। উনবিংশ শতাব্দীর সংস্কৃত ভাষার বিখ্যাত অভিধান শব্দকল্পদ্রুম এ বলা হচ্ছে ‘কাল শিবহ্। তস্য পত্নতি কালী।’ অর্থাৎ শিবই কাল বা কালবোধক। তাঁর পত্নী কালী। কালী হচ্ছেন মা দুর্গার বা পার্বতীর অপর ভয়াল রূপ। তিনি সময়ের, পরিবর্তনের, শক্তির, সংহারের দেবী। তিনি কৃষ্ণবর্ণা বা মেঘবর্ণা এবং ভয়ংকরী। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভয়ংকরেরও পূজা করেন। তিনি অশুভ শক্তির বিনাশ করেন। শিব ও কালীর মধ্যে এরকম যোগসূত্র থাকার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই শিবলিঙ্গ পুজো হওয়ার পরেই কালীর পুজো শুরু হয়। কালীর সঙ্গে শিবের অভিন্ন ভাবনাকে ফুটিয়ে তুলতে আমরা সবাই শ্রী শ্রী শ্যামা পুজো কমিটির এবারের মণ্ডপভাবনা কর্নাটকের কোটি লিঙ্গেশ্বর শিব মন্দির। পুজোর উদ্যোক্তা অরুণ ভৌমিক জানিয়েছেন, কর্ণাটকের কোলার জেলার ভুবনবিখ্যাত মন্দির কে হুবহু ভাবে তাঁরা ফুটিয়ে তুলবেন।

আমরা সবাই পুজো কমিটির কালীপুজো এবছর ষষ্ঠ বর্ষে পা রেখেছে। জন্ম লগ্ন থেকেই আমরা সবাই কালীপুজো নজর কাড়ছে তার অভিনবত্বে। সুউচ্চ ও জমকালো মন্ডপ, জাঁকজমকপূর্ণ আলোকসজ্জা এবং প্রতিমার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই খ্যাতি লাভ করলেও আমরা সবাই কালীপুজোর প্রধান উদ্যোক্তা ও কর্ণধার অরুণ ভৌমিকের লক্ষ্য বরাবরই ছিল পুজোর মণ্ডপ ভাবনাকে অবিকৃতভাবে তুলে ধরা। মন্দির, স্থাপত্য বা শিল্পকে ক্ষুদ্র পরিসরে যথাযথভাবে তুলে ধরাই তাঁর প্রচেষ্টা।এবারও সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি নেমেছেন। কয়েক বছর ধরেই আমরা সবাই পুজো কমিটির পুজোর আয়োজনের মন্ডপ সজ্জার সার্বিক ভাবনাকে সার্থক করার জন্য দায়িত্ব বর্তেছে শিল্পী অভয় পারিয়ার ওপরে। প্রস্তুতির কাজ অনেকটাই শেষ। বারাসাত কলোনি মোড় থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের নবপল্লী বয়েজ স্কুল মাঠে গেলেই দেখা যাবে বিভিন্ন আকারের শিবলিঙ্গ দিয়ে সজ্জিত করা হচ্ছে মণ্ডপ। অভয় পারিয়া এবারের মণ্ডপের কাজ করে সন্তুষ্ট । তিনি মনে করছেন,শুধু হিন্দু ধর্মের মানুষই নয় , অন্য ধর্মের মানুষরাও মন্ডপসজ্জার রূপে মোহিত হবেন। ফলে ভিড় যে উপচে পড়বেই তা নিয়ে সংশয় নেই উদ্যোক্তাদের মনে । এবছর বারাসাতে শ্যামামায়ের দর্শনে বিশেষ এন্ট্রি পাসের ব্যবস্থা থাকছে না তবে উদ্যোক্তা অরুণ ভৌমিক জানিয়েছেন দর্শনার্থীদের প্রতিমা দর্শনে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার দিকে নজর রাখা হবে।
সবমিলিয়ে,বারাসাতের শ্যামা পুজোর উৎসব উদযাপনের দিন গোনা শুরু হয়ে গিয়েছে । কয়েকটা দিন পরেই আলোয় ঝলমল করবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত, দীপাবলির আলোয় সেজে উঠবে নগর ও গ্রাম। কালীপুজোয় বারাসাত জুড়ে যখন দেখা দেবে উন্মাদনা, তখন দর্শনার্থীদের ঢল নামবে আমরা সবাই শ্রী শ্রী শ্যামা পুজো কমিটির মণ্ডপে যেখানে ফুটে উঠবে কর্নাটকের কোটি লিঙ্গেশ্বর মন্দিরের অপরূপ রূপশোভা। উদ্যোক্তারা তাঁদের মণ্ডপভাবনার সাফল্যের দিকে তাকিয়ে আছেন উন্মুখ হয়ে ।।


More Stories
হর্ষ-বিষাদে পালিত ঈদ-উল-আযহা
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
চিকিৎসকের বঙ্গসংস্কৃতির উদযাপন নববর্ষে