সময় কলকাতা ডেস্ক : ১২৮২ বঙ্গাব্দের অর্থাৎ ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ।সেবছর কার্তিক-অগ্রহায়ণ সংখ্যা বঙ্গদর্শন-এ প্রকাশিত ‘রাধারাণী’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ছিল শ্রীরামপুরের মাহেশের রথযাত্রা। এ প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের ভাইপো শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জানিয়েছিলেন, ১৮৭৫ সালে রথের মেলায় প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে একটি মেয়ে হারিয়ে গিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র সেই সময় নৈহাটি কাঁঠালপাড়ার বাড়িতেই ছিলেন। রাধারানী উপন্যাসেই শুধু নয় বঙ্গ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মাহেশের রথযাত্রা , জড়িয়ে আছে চন্দননগরের মাহেশের জগন্নাথ মন্দির। অবশেষে ডাকটিকিটে এবার স্থান পেল জগন্নাথ মন্দির।ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বরণ করে নিয়ে স্বীকৃতি দিল ডাকবিভাগ।
মাহেশকে বলা হয় নব নীলাচল। এখানের জগন্নাথ মন্দির বহু ইতিহাসের সাক্ষী। পুরীর পরেই এখানে সবচেয়ে বড় রথ যাত্রার উৎসব হয়। প্রতিবছর দু লক্ষের বেশি মানুষের সমাগম হয় এখানে। জগন্নাথ দেবের ভক্ত চৈতন্যদেবকে নিয়ে প্রচলিত আছে জনশ্রুতি । এখানে এসে জগন্নাথ ভক্ত শ্রী নিমাই চৈতন্য সংজ্ঞা হারান। অতঃপর তাঁর দেওয়া নাম ধরে এই জায়গার নাম হয়ে ওঠে নবনীলাচল ।মাহেশের জগন্নাথ মন্দির বাংলা তথা ভারতের অতি প্রাচীন ধর্মস্থানগুলির অন্যতম।যদিও নতুন ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে বর্তমান মন্দিরকে, তবুও চন্দননগরের মন্দিরকে কোথাও যেন স্পর্শ করে আছে ৬২৬ বছরের ইতিহাস। কারণ এই মন্দির নির্মাণকে স্পর্শ করে আছে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক সাধুর ঈশ্বর ভাবনা। কথিত আছে,ধ্রুবানন্দকে একবার পুরীর জগন্নাথকে ভোগ নিবেদন করতে দেওয়া হয়নি। বিমর্ষ হয়ে ওই সাধু আমৃত্যু অনশনে বসেন। ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীকে ধ্যানরত অবস্থায় দর্শন দেন প্রভু জগন্নাথ।কথিত আছে তিন দিন পরে জগন্নাথদেব তাঁকে দেখা দিয়ে বলেন, “ধ্রুবানন্দ, বঙ্গদেশে ফিরে যাও। সেখানে ভাগীরথী নদীর তীরে মাহেশ নামে এক গ্রাম আছে। সেখানে যাও। আমি সেখানে একটি বিরাট দারুব্রহ্ম (নিম গাছের কাণ্ড) পাঠিয়ে দেবো। সেই কাঠে বলরাম, সুভদ্রা আর আমার মূর্তি গড়ে পূজা করো। আমি তোমার হাতে ভোগ খাওয়ার জন্য উদগ্রীব।” এই স্বপ্নদর্শনের ঘটনা ১৩৯৬ সাল বা তার সামান্য আগের।
মাহেশে ফিরে আসেন সাধু। গঙ্গার তীরে শুরু করেন সাধনা।তারপর এক বর্ষার দিনে মাহেশ ঘাটে একটি নিমকাঠ ভেসে এল। কথিত আছে এই নিমকাঠ দিয়ে বলরাম, জগন্নাথ ও শুভদ্রার মূর্তি তৈরি করেন ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী । সে সময়ই এই মন্দির স্থাপন করেন তিনি ।আর রথযাত্রা চলছে সেই সময় থেকেই অর্থাৎ চতুর্দশ শতকের একেবারে শেষ দিক থেকেই মন্দির স্থাপন ও রথযাত্রা।১৮৮৫ সাল এখনকার রথটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। মাহেশের মন্দির এবং বিগ্রহ তৈরি করেছিলেন ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী। পিপলাই পরিবারের উত্তরসূরীরাই মানুষের জগন্নাথ মন্দির দেখাশোনা করেন ।কারণ এখানের রথযাত্রা উৎসব শুরু করেন শ্রীচৈতন্যর শিষ্য কমলাকর পিপলাই এবং তিনি-ই পরবর্তীতে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত হন।
মাহেশের ঐতিহাসিক জগন্নাথ মন্দিরের রথযাত্রা বিশ্ব তথা ভারতবর্ষের দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রা।দেখতে দেখতে ৬২৬ বছরের সময়কাল পার করে এসেছে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর স্বপ্ন দর্শনের বাস্তবরূপ জগন্নাথ মন্দির । এই মন্দিরের মুকুটে এবার আরও একটি পালক সংযোজিত হল সম্প্রতি । ভারত সরকারের ডাক বিভাগে শ্রীরামপুর পৌরসভার সহযোগিতায় মহেশ জগন্নাথ মন্দির প্রাঙ্গণ আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়েছে ।
ভারত সরকারের ডাক বিভাগ এবং শ্রীরামপুর পৌরসভার সহযোগিতায় মহেশ জগন্নাথ মন্দির প্রাঙ্গণে, আনুষ্ঠানিকভাবে রথযাত্রার ডাকটিকিট প্রকাশ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ডাকঘরের পোস্টমাস্টার জেনারেল শ্রীমতি শশীশালিনী কুজুর। মন্দিরের প্রধান সেবাইট গোরাচাঁদ অধিকারী, চাপদানির বিধায়ক অরিন্দম গুইন, পৌরসভার পৌর প্রধান গিরিধারী সা, সহ প্রশাসনের একাধিক কর্তা ব্যক্তিরা।জগন্নাথ দেবের মন্দিরকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই এই মন্দিরকে হেরিটেজ ঘোষণা করেছেন । এবার পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের উদ্যোগে এই উদ্বোধনে খুশি মন্দির কর্তৃপক্ষ থেকে সাধারণ মানুষ।
মন্দিরের প্রধান সেবায়েত সৌমেন অধিকারী জানান ডাক বিভাগের এই উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করে তিনি বলেন পুরীর মন্দির যা করতে পারেনি জগন্নাথ দেবের ইচ্ছে মাহেশে সেই কাজ করে দেখিয়েছে ডাক বিভাগ ।
শ্রী চৈতন্য মাহেশের নাম রেখেছিলেন নবনীলাচল অর্থাৎ নতুন পুরী । এখানে মিশেছে আদি আর নতুন।অতীতের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটেছে আধুনিকতার। আর এই ঐতিহ্যের সমাদর নিশ্চিতভাবেই আমাদের সংস্কৃতির পরম্পরা আর যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা ইতিহাসকে তুলে ধরেছে।৬২৬ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী মাহেশের রথযাত্রা। একইসময়কাল ধরে রথযাত্রার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে এখানের জগন্নাথ মন্দির। লোকশ্রুতি ও ইতিহাস মিশে আছে এখানের রথযাত্রা উৎসব ও মন্দিরের সঙ্গে। এই ঐতিহ্যকে সরকারিভাবে দেওয়া হয়েছে স্বীকৃতি।ফলে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারীর স্বপ্নের মন্দিরের গৌরব অক্ষত থাকার মিলেছে পরম নিশ্চয়তা।।


More Stories
বাংলা নববর্ষের ইতিহাস
আরেক অভিনেতা প্রণবের অকালপ্রয়াণ
বেজি কি সাপের বিষে কাবু হয় না?